খুলনায় ১৬ বছর বয়সী মেয়ে নির্জনা হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বাবা আকাশ। রোববার (১৯ জুলাই) বিকেলে খুলনা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১ এর বিচারক মো. আসাদুর জামানের কাছে তিনি এই জবানবন্দি দেন। পারিবারিক কলহের জেরে নিজ সন্তানকে হত্যার পর মরদেহ বস্তাবন্দি করে মোটরসাইকেলে শহর ঘুরে নির্জন স্থানে ফেলে দেওয়ার লোমহর্ষক বর্ণনা উঠে এসেছে তাদের জবানবন্দিতে।
এর আগে গত ১০ জুলাই নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন সীমাও মেয়ে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছিলেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও খুলনা থানার এসআই আমিনুল ইসলাম জানান, শনিবার (১৮ জুলাই) দুপুরে ডুমুরিয়া উপজেলার একটি দোকান থেকে আকাশকে গ্রেপ্তার করে র্যাব ও পুলিশ। এরপর ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন এবং স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিতে রাজি হন। আদালত জবানবন্দি রেকর্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
পুলিশি তদন্ত ও জবানবন্দি সূত্রে জানা যায়, গত ৮ জুলাই সকালে মেয়ে নির্জনা তার স্বামীর সঙ্গে চলে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হলে পরিবারের সদস্যরা তাকে ফিরিয়ে আনেন।
ওইদিন বিকেলে মা সীমার সাথে নির্জনার কথা কাটাকাটি হয়। এ সময় নির্জনা তার মায়ের গায়ে হাত তোলে। এরপর মা সীমার গলা টিপে ধরে নির্জনা। বাবা আকাশ কাঠের চলা দিয়ে শাসন করতে গেলে দুর্ঘটনাবশত সেটি গিয়ে মাথায় লাগে। পরে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তারা।
মেয়ের মরদেহ গুম করার জন্য আকাশ কালো রঙের লুঙ্গি দিয়ে মেয়েকে বেঁধে ফেলেন। পরে ছাদ থেকে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে দোতলা থেকে নিচে নিয়ে আসেন। মোটরসাইকেলে মরদেহ নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে থাকেন আকাশ। কোথায় ফেলবেন মেয়ের মরদেহটি তা চিন্তা করে পারছিলেন না। সর্বশেষ শহরতলির প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার নির্জন একটি রোডে ফেলে দেওয়া হয় মরদেহটি। বাড়ি ফিরে রক্ত মুছে ফেলেন তারা দুইজনই। রাতে উভয়ে কান্নাকাটি করেন। সকালে পালিয়ে যান তারা।
এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বস্তাবন্দি ও রক্তাক্ত মরদেহটি উদ্ধার করার পর প্রাথমিক অবস্থায় হত্যাকাণ্ডের কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ বা সূত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এমনকি পিবিআই ও সিআইডি-এর মতো বিশেষায়িত সংস্থাও প্রথমে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি। লাশটির পরিচয় উদ্ধার করা নিয়ে পুলিশ প্রশাসন চরম দুশ্চিন্তায় ছিল। পরবর্তীতে ঘটনার দিন রাতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিহত কিশোরীর ছবি প্রকাশ করা হলে, তার পরের দিন বিকেলে লাশের আসল পরিচয় শনাক্ত সম্ভব হয়।
গ্রেপ্তার আলিম হোসেন ওরফে আকাশক
ওসি আরও জানান, তদন্তের সময় সবচেয়ে আশ্চর্যের ও সন্দেহজনক বিষয়টি ছিল যে, নিহত মেয়ের মা-বাবাকে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরবর্তীতে বিভিন্ন কৌশল ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় প্রথমে নির্জনার মা সীমাকে থানায় আনা হয়। প্রথমদিকে মেয়ে হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণ নীরব থাকেন এবং কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখে একপর্যায়ে তিনি পুরো হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ও সত্য স্বীকার করেন। ঘটনার ৬ দিন পর হত্যাকাণ্ডে ও লাশ বহনে ব্যবহৃত আকাশের মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয় এবং ঘটনার ১০ দিন পর আকাশকে ডুমুরিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।
উল্লেখ্য, খুলনা মহানগরীর বুকে এই কিশোরী নির্জনার রক্তাক্ত ও বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার হওয়ার পর পুরো এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ঘটনার পর থেকেই অপরাধীদের শনাক্ত করতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর ছিল।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

