শুক্রবার,

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১,

২ আশ্বিন ১৪২৮

পরীক্ষামূলক প্রকাশ

শুক্রবার,

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১,

২ আশ্বিন ১৪২৮

Radio Today News

খুলনায় বাঁধ মেরামতে ঠিকাদারের গড়িমসি-অনিয়ম

শুভ্র শচীন, খুলনা

প্রকাশিত: ০২:৪৯, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১

আপডেট: ০২:৫১, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১

খুলনায় বাঁধ মেরামতে ঠিকাদারের গড়িমসি-অনিয়ম

ছবি: রেডিও টুডে

খুলনার কয়রায় ঘূর্ণিঝড় ইয়াসে ভেঙে যাওয়া গাতিরঘেরি ও দশহালিয়া গ্রামের বাঁধ মেরামতে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে বালু ফেলে বাঁধ মেরামতের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে এখন নানা অজুহাতে বরাদ্দ বাড়াতে কালক্ষেপণের অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় দীর্ঘায়িত হচ্ছে মানুষের দুর্ভোগ। টানা তিন মাস জোয়ার-ভাটায় সীমাহীন দুর্দশায় দিন কাটছে সেখানকার দেড়শ পরিবারের। 

দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী মাটি দিয়ে বাঁধ মেরামতের কথা। সেখানে সরেজমিনে দেখা যায়, ভাঙা বাঁধের দুইদিকে লোকালয়ের পাশে বালু ফেলা হয়েছে। বালু ব্যবহার করায় বিব্রত কাজতদারকির দায়িত্বে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারাও। এ বিষয়ে সংস্থাটি কয়েক দফায় ঠিকাদারকে চিঠি দিলেও কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি। ভাঙা বাঁধ মেরামতে বালু ব্যবহার করায় বাঁধটির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। 

চলতি বছরের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে ভেঙে গিয়েছিল কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের গাতিরঘেরি এলাকার শাকবাড়িয়া নদীর বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ। ভাঙা বাঁধটুকুর দূরত্ব প্রায় ৪৫ মিটার। তিন মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেটি এখনো মেরামত করা হয়নি। ফলে প্রতিদিনই জোয়ারে সাগরের নোনা পানি ঢুকছে গ্রামে। পুরো গ্রামটিই দিনে দুবার জোয়ারের পানিতে ডুবছে। মানুষ এলাকা ছেড়ে রাস্তার ওপর আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানেই পলিথিন ও গোলপাতা দিয়ে তৈরি ছাপরা ঘরে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। 

গাতিরঘেরি গ্রামের সাধন সরকার বলেন, ক্লোজার থেকে ৫০০ গজের মধ্যেই ছিল আমার বাড়ি। বাড়ির কিছু অংশ এখনো টিকে আছে। কিন্তু সেখানে বসবাস করার সুযোগ নেই। ইয়াসে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে নদীর বাঁধ ভেঙে সেখান দিয়ে হু-হু করে পানি প্রবেশ করে হাজার বিঘা জমি ডুবে যায়। পানির তোড়ে ভেসে যায় আমার পাঁচ বিঘা জমির চিংড়িঘের। ওইদিন থেকেই বাঁধের একটি অংশে বসবাস করছি।

একই গ্রামের মজিদা খাতুন আক্ষেপ করে বলেন, "গত তিনমাস ধইরে ভাসি বেড়াতিছি, কেউ খবর নিতিও আসে না। আমরা একেনে থাকপো না চলি যাব তা-ও কেউ বলে না। শুনতি পাই সবজাগার বান বানধা হইয়ে গেছে। খালি আমাগের বেলায় যত অজুহাত। ছাওয়াল-মাইয়ে নিয়া যে কী কষ্টে আছি তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না।"

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে ওই কাজটি বাস্তবায়ন করছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। তদারকির দায়িত্বে আছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ৩ কোটি ৩০ লাখ ৫৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ২০০ মিটার বাঁধ মেরামতের কাজ পেয়েছে ঢাকার মেসার্স আরাধনা এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

দরপত্র অনুযায়ী ভাঙা বাঁধের স্থান মাটি দিয়ে মেরামত করতে হবে। বাঁধ মেরামত হয়ে গেলে তা টেকসই করতে নদীর কিনারে বালিভর্তি জিওব্যাগ ফেলতে হবে। এছাড়া কিছু ডাম্পিং বস্তাও ফেলা হবে ভাঙন স্থানে। গত ৩ জুন ঠিকাদারকে কাজের দায়িত্ব বুঝে দেওয়া হয়। ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা। কিন্তু তিন মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এসবের কিছুই করা হয়নি।

কয়রা উপজেলার ওই অংশটি পড়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড সাতক্ষীরা পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ-২ এর আওতায়। কাজের মান ও ধীরগতির জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কয়েক দফা চিঠি দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ওই বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশিদুর রহমান বলেন, বালু দিয়ে কাজ না করে দরপত্র অনুযায়ী কাজ করা, দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করাসহ বিভিন্ন কারণে দফায় দফায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে ও হচ্ছে। এরপরও কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। ব্যাপারটি সবাইকে হতাশ করছে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন সাতক্ষীরার মো. আবদুস সবুর নামের এক ঠিকাদার। জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, বালু ফেলা হচ্ছে বস্তায় বালু ভরার জন্য। আর বাঁধের কাজ বালু-মাটি দিয়েই করতে হবে, তা না হলে ওই পরিমাণ মাটি পাওয়া যাবে না। এতে বাঁধ টিকবে কি না, জানতে চাইলে তিনি ব্যাপারটি এড়িয়ে যান। 

প্রকল্পটির পরিচালক হিসেবে আছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের যুগ্ম সচিব সুব্রত পাল চৌধুরী। মুঠোফোনে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকল্পের কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কালক্ষেপণের অভিযোগ পেয়েছি। প্রাথমিকভাবে এ বিষয়ে তাকে সতর্ক করে দিয়েছি। এ ধরনের আর কোনো অভিযোগ পেলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার বারোআড়িয়া নদীভাঙন এলাকায় জিওব্যাগের বালুর বস্তার সেলাই ঠিকঠাক না করে নদীতে বস্তা ডাম্পিং করায় সেলাই ফেটে বালু নদীতে পড়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা জহুর খাঁ, লাইলি, সালমা খাতুন, আকবর গাজীসহ একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, নৌকায় করে বালু ভর্তি বস্তা ফেলার সময় দেখা যায়, বস্তা ফেটে পানিতে বালু পড়ছে আর খালি বস্তা নদীতে ভেসে যাচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা দেবপ্রতিম হাওলাদার বলেন, বারোআড়িয়া বাজারের স’মিল এলাকায় বস্তা নদীতে ফেলার সময় আমি ঘটনার সত্যতা পাই এবং তাৎক্ষণিক দুটি নৌকায় থাকা ২২০ বস্তা জিওব্যাগ বাজেয়াপ্ত করি। বস্তাগুলোর সেলাই টেম্পারের গুণগত মান নষ্ট ছিল।

কী কারণে সেলাই টেম্পার নষ্ট হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বস্তায় বালু ভরে সেলাই দেওয়ার ১০ থেকে ১৫ দিন রোদে থাকলে তার মান ভালো থাকে না। তাই বাকি সব বস্তা দ্বিতীয়বার সেলাই করার জন্য বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, "জাইকার অর্থায়নে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ২ কোটি ২৪৮ লাখ টাকার এ কাজটি করছে খুলনার রহমান ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।"

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. হাসনাত হোসেন বলেন, কাজে কোনো অনিয়ম হলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


 

রেডিওটুডে নিউজ/ইকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের