বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখতে আর্জেন্টিনা সর্বস্ব উজাড় করে দিচ্ছে এবং তাদের তা করতেই হচ্ছে। নকআউট পর্বের প্রথম দুই রাউন্ডে কেপ ভার্দে ও মিশরের বিপক্ষে সহজ জয় পাওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও ৩-২ গোলের ব্যবধানে জয় পেতে কঠোর লড়াই করতে হয়েছে লা আলবিসেলেস্তেকে।
মিশরের বিপক্ষে জয়টি বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে, কারণ শেষ ষোলোর ম্যাচে হারের পর আফ্রিকান দেশটি টুর্নামেন্ট থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়ার জন্য ফিফার কাছে আবেদন করেছে।
আর্জেন্টিনার পক্ষে পক্ষপাতিত্ব করা হয়েছে এবং তাদের তারকা খেলোয়াড় লিওনেল মেসিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে মিশর।
ম্যাচের পর কোচ হোসাম হাসান বলেন, মিসরের সঙ্গে "অন্যায় আচরণ" করা হয়েছে এবং তারা "অবিচারের শিকার" হয়েছেন।
হাসান আরও অভিযোগ করেন, ফিফার পক্ষ থেকে এক ধরনের পক্ষপাত ছিল।
তিনি বলেন, "সম্ভবত তারা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে প্রতিযোগিতায় রাখতে চেয়েছিল। সম্ভবত তারা চেয়েছিল মেসি যেন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকেন।"
বিবিসি স্পোর্টস খতিয়ে দেখেছে, আর্জেন্টিনাকে সফল করতে সবকিছু সাজানো হচ্ছে - এমন ষড়যন্ত্র তত্ত্বে আদৌ কোনো সত্যতা আছে কি না।
মিসরের অভিযোগের কি কোনো ভিত্তি আছে?
মঙ্গলবারের ৩-২ ব্যবধানে হারের পর মিশর কেন এতটা হতাশ, তা বোঝা কঠিন নয়।
খেলা শেষ হওয়ার ১১ মিনিট বাকি থাকতে আফ্রিকান দলটি ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল এবং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার-ফাইনালে ওঠার দ্বারপ্রান্তে ছিল।
কিন্তু এরপর সবকিছু বদলে যায়। আর্জেন্টিনা দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং যোগ করা সময়ে জয়সূচক গোল করে।
মিশরের দাবি, এর পেছনে আরও সন্দেহজনক কিছু ছিল। তাদের মতে, "গুরুতর রেফারিং ভুল" এবং ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে ও তার দলের "দ্বৈত মানদণ্ড" তাদের বিদায়ের কারণ।
ফারাওরা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর- এর হস্তক্ষেপে একটি গোল হারায়।
তাদের দাবি, আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলটিও বাতিল হওয়া উচিত ছিল এবং এর বদলে তাদের পক্ষে একটি পেনাল্টি দেওয়া উচিত ছিল।
দারুণ এক আক্রমণ থেকে করা মোস্তাফা জিকোর গোলটি বাতিল করা হয়, কারণ সেই আক্রমণের শুরুতে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ের ওপর মারওয়ান আতিয়া পা রেখেছিলেন বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।
বিষয়টি বিতর্কিত ছিল, তবে তখন তারা ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল এবং নয় মিনিট পরে দ্বিতীয় গোলও করেছিল। জিকোর গোল বহাল থাকলে ম্যাচের গতিপথ ভিন্ন হতো- এটি প্রমাণ করা সম্ভব নয়।
এনজো ফার্নান্দেজের হেডে আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে মিসর নিজেদের পক্ষে দুটি সম্ভাব্য পেনাল্টির দাবি তোলে।
হামদি ফাতি দাবি করেন যে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার তাকে ধরে রেখেছিলেন, যদিও রিপ্লেতে বিষয়টি স্পষ্ট ছিল না। অন্যদিকে মোহাম্মদ সালাহ মনে করেন, জুলিয়ান আলভারেজ তাকে ফাউল করেছিলেন।
মার্তিনেজ ও সালাহর ঘটনার মধ্যে কিছু মিল ছিল, কারণ উভয় ক্ষেত্রেই পায়ের ওপর পা পড়েছিল, তবে পেনাল্টি দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত কারণ ছিল না।
সালাহ যদি বক্সের বাইরে থাকতেন, তাহলে মিসরের ওই গোল বাতিল করানোর সম্ভাবনা বেশি ছিল। কারণ তখন ভিএআর কেবল ফাউল হয়েছে কি না তা দেখত, পেনাল্টির বিষয় নয়—যেমনটি মার্টিনেজের ক্ষেত্রে হয়েছিল।
বিতর্কিত? অবশ্যই।
কিন্তু এটিকে মেসির পক্ষে কোনো ষড়যন্ত্রের প্রমাণ বলা কঠিন।
ফ্রান্সের ম্যাচে থাকবে আর্জেন্টিনার রেফারিদের দল
বৃহস্পতিবার দিনগত রাতে কোয়ার্টার-ফাইনালে ফ্রান্স ও মরক্কোর ম্যাচের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তালিকার দিকে তাকান।
এই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো মাঠের সব কর্মকর্তা-রেফারি, দুই সহকারী রেফারি, চতুর্থ কর্মকর্তা এবং রিজার্ভ কর্মকর্তা– সবাই একই দেশের।
আর সেই দেশটি হলো আর্জেন্টিনা।
ফাকুন্দো টেলোর আগের দুই ম্যাচে চতুর্থ ও রিজার্ভ কর্মকর্তা ছিলেন প্রথমে সৌদি আরব এবং পরে কলম্বিয়ার।
যুক্তি হলো, আর্জেন্টিনা চাইবে ফ্রান্স টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিক। কারণ তারাই টুর্নামেন্টের অন্যতম প্রধান ফেবারিট।
এটি টেলোর ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় ম্যাচ এবং টানা দুটি টুর্নামেন্টে তার দ্বিতীয় বিশ্বকাপ কোয়ার্টার-ফাইনাল। এমন উচ্চপ্রোফাইলের একজন রেফারি সর্বোচ্চ সততা বজায় না রেখে দায়িত্ব পালন করবেন– এমনটি ভাবা কঠিন।
তবে অনেক সময় ধারণাও বাস্তবতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। আর কোয়ার্টার-ফাইনালে ফ্রান্সের ম্যাচে আর্জেন্টাইন কর্মকর্তাদের নিয়োগ খুব একটা ইতিবাচক বার্তা দেয় না।
মেসি লাল কার্ড এড়িয়ে গিয়ে পাঁচ গোল করেছেন
টুর্নামেন্টের শুরুতে মেসির যখন লাল কার্ড পাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল সেই ঘটনাটি মনে করুন।
আলজেরিয়ার অধিনায়ক আইসা মান্দির ওপর চ্যালেঞ্জের জন্য মেসি কোনো হলুদ কার্ডও দেখেননি।
এরপর গত সপ্তাহে এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে। একই ধরনের ঘটনায় বসনিয়ার বিপক্ষে ভিএআর পর্যালোচনার মাধ্যমে ফোলারিন বালোগানকে লাল কার্ড দেখানো হয়। দুই ক্ষেত্রেই প্রতিপক্ষের পায়ের ওপরের অংশে আঘাত লাগে।
ধারণা করা হয়, বালোগানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চেষ্টা করার সময় যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়টিও উল্লেখ করেছিল।
যদি মেসিকে লাল কার্ড দেখানো হতো, তাহলে তিনি আলজেরিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় ও তৃতীয় গোল করতে পারতেন না। একইভাবে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও জোড়া গোল করতে পারতেন না, কারণ তখন তিনি নিষিদ্ধ থাকতেন—যদি ফিফা বালোগানের ক্ষেত্রে যেমন করেছিল, তেমনি ২৭ নম্বর ধারা তার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করত।
মেসি তখন জর্ডানের বিপক্ষে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচেও খেলতে পারতেন না, যে ম্যাচেও তিনি গোল করেছিলেন।
সে ক্ষেত্রে টুর্নামেন্টে তার করা আট গোলের পাঁচটিই বাদ পড়ে যেত।
তাহলে কি এটি মেসির প্রতি বিশেষ সুবিধা ছিল?
রেফারিরা কি আর্জেন্টিনাকে কম হলুদ কার্ড দেখাচ্ছেন?
কোয়ার্টার-ফাইনাল অতিরিক্ত ঝুঁকি নিয়ে এসেছে।
হলুদ কার্ড পাওয়া ১৭ জন খেলোয়াড় আছেন যারা এরকম আরেকটি কার্ড পেলেই সম্ভাব্য সেমি-ফাইনালে খেলার সুযোগ থেকে বাদ পড়তে পারেন।
আর্জেন্টিনার জন্য এই ঝুঁকি তুলনামূলক কম। কেবল গনসালো মন্টিয়েল হলুদ কার্ডের ঝুঁকিতে আছেন, ফলে তিনি ইংল্যান্ড অথবা নরওয়ের বিপক্ষে সম্ভাব্য সেমি-ফাইনাল মিস করতে পারেন।
ইংল্যান্ড কোচ থমাস টুখেলের দলে চারজন খেলোয়াড় হলুদ কার্ডের ঝুঁকিতে আছেন, যার মধ্যে আছেন গুরুত্বপূর্ণ দুই খেলোয়াড় জুড বেলিংহ্যাম ও ডেকলান রাইস।
সবচেয়ে কম হলুদ কার্ড পাওয়া নরওয়ের ক্ষেত্রে কেবল আন্তোনিও নুসা সতর্ক অবস্থায় আছেন।
এই বিষয়টি মূল্যায়নের জন্য দেখতে হবে কোনো দল কতটা 'অপরিচ্ছন্ন' খেলেছে। হলুদ কার্ডের সংখ্যা কি ফাউলের সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
আর্জেন্টিনা গড়ে প্রতি ১৯.৭টি ফাউলের বিপরীতে একটি হলুদ কার্ড পেয়েছে।
শুধু তিনটি দল– চেক প্রজাতন্ত্র (৩৭.০), নরওয়ে (২৪.০) এবং তিউনিসিয়া (২৭.০)– এ ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনার চেয়ে বেশি অনুপাতে হলুদ কার্ড পেয়েছে।
এখনো প্রতিযোগিতায় থাকা দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কঠোর আচরণের শিকার হয়েছে ইংল্যান্ড, যারা প্রতি ৭.৭টি ফাউলের বিপরীতে একটি হলুদ কার্ড পেয়েছে।
আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডের চেয়ে বেশি ফাউল করেছে, অথচ হলুদ কার্ড পেয়েছে অর্ধেক।
এটি ইঙ্গিত করতে পারে যে ফাউলের সংখ্যার তুলনায় আর্জেন্টিনা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাচ্ছে।
অতীতে ইনফান্তিনো যেভাবে মেসির খেলা নিশ্চিত করেছেন
ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো যেন তার টুর্নামেন্টগুলোতে মেসিকে দেখতে পছন্দ করেন।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত প্রথম ক্লাব বিশ্বকাপের কথাই ধরা যাক।
আয়োজক দেশের কোন দল অংশ নেবে, তা নিশ্চিত করতে কিছুটা দেরি হয়েছিল।
স্বাভাবিকভাবেই ধারণা ছিল, ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন দলটিই সুযোগ পাবে। কারণ নির্ধারিত কৃতিত্বের ভিত্তিতে সেরা দলগুলোকে নিয়েই তো এই টুর্নামেন্ট।
ধারণাটি খুব একটা ভুল ছিল না, তবে পুরোপুরি ঠিকও ছিল না।
ইন্টার মায়ামি ২০২৪ সালের এমএলএস সাপোর্টার্স শিল্ড জিতেছিল, যা সর্বোচ্চ পয়েন্ট পাওয়া দলকে দেওয়া হয়।
কিন্তু প্লে-অফ জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল এলএ গ্যালাক্সি।
তারপরও ক্লাব বিশ্বকাপের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল ইন্টার মায়ামিকে।
ফলে মেসি উদ্বোধনী ম্যাচে খেলতে পেরেছিলেন, যেখানে ইন্টার মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল আল আহলি।
বিশ্বকাপের নকআউট বিন্যাস আর্জেন্টিনার পক্ষে
ডিসেম্বরে বিশ্বকাপের ড্র পদ্ধতিতে ফিফা ছোট হলেও গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন আনে।
ফিফা বিশ্ব র্যাংকিংয়ের শীর্ষ চার দেশ—ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, স্পেন ও ইংল্যান্ডকে আলাদা চারটি কোয়ার্টারে রাখা হয়েছিল।
এই দেশগুলো নিজেদের গ্রুপে শীর্ষস্থান অর্জন করলে, যা তারা করেছে, সেমি-ফাইনালের আগে তাদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ থাকত না।
ফ্রান্স ও স্পেন আছে এক পাশে এবং সেমি-ফাইনালে নিজেদের মধ্যে মুখোমুখি হওয়ার পথে রয়েছে। অন্য পাশে রয়েছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড।
এর উদ্দেশ্য ছিল টুর্নামেন্টের শুরুর দিকেই বড় আকর্ষণের ম্যাচ হওয়ার সম্ভাবনা কমানো।
তবে গ্রুপপর্বের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে এটি ওই দেশগুলোকে তুলনামূলক সহজ পথও করে দিয়ে থাকতে পারে।
নকআউট পর্বের প্রথম দুই রাউন্ডে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দলের মধ্যে মাত্র দুটি ম্যাচ হয়েছে—নেদারল্যান্ডস বনাম মরক্কো এবং স্পেন বনাম পর্তুগাল।
আর্জেন্টিনা সবচেয়ে সহজ পথ পেয়েছে বলেই মনে হয়, যদিও তারা কেপ ভার্দে (বিশ্ব র্যাংকিংয়ে ৬৭) এবং মিসরকে (২৯) মাত্র ৩-২ ব্যবধানে হারাতে পেরেছে।
কোয়ার্টার-ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড (১৯)।
ইংল্যান্ড সম্ভাব্য সেমি-ফাইনালে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি না হলে শীর্ষ ১০-এর কোনো দলের বিপক্ষে খেলবে না। যদিও তাদের অ্যাজটেকায় মেক্সিকোকে (১৪) হারাতে হয়েছে।
স্পেন পর্তুগালকে (৫) হারিয়েছে এবং এখন বেলজিয়ামের (৯) মুখোমুখি হবে। অন্যদিকে ফ্রান্স কোয়ার্টার-ফাইনালে খেলবে মরক্কোর (৭) বিপক্ষে।
এই বিবেচনায় আর্জেন্টিনাই সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে।
পেনাল্টিগুলোও আর্জেন্টিনার দিকে যাচ্ছে
২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের সময় আর্জেন্টিনা একটি নতুন রেকর্ড গড়েছিল।
তাদের পাওয়া পাঁচটি পেনাল্টি ছিল একক কোনো টুর্নামেন্টে কোনো দলের সর্বোচ্চ।
২০২৬ সালেও তারা তিনটি পেনাল্টি নিয়ে সবার ওপরে আছে - যদিও মেসি এর মধ্যে দুটি মিস করেছেন, অস্ট্রিয়া ও মিশরের বিপক্ষে।
ইংল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ড দুটি করে পেনাল্টি পেয়েছে, আর বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও নরওয়ে পেয়েছে একটি করে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

