সিছুয়ান প্রদেশের ইয়া’আনের সিমিয়ান কাউন্টির এক স্মৃতিসৌধে একটি কাঠের নৌকার দেখা মেলে। ওটা ১০.৫ মিটার দীর্ঘ। সময়ের সঙ্গে ক্ষয়ে গেছে। জীর্ণ আর গুলির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত নৌকাটি লংমার্চের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক মুহূর্তের সাক্ষ্য বহন করছে। ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত রেড আর্মির সেই বিপ্লবী লংমার্চের কঠিন সময়ের ইতিহাস বহন করে চলেছে নৌকাটি।
১৯৩৫ সালের মে মাসে মাত্র একটি নৌকা নিয়ে ১৭ জন রেড আর্মি সৈন্য প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যে ৩০০ মিটার প্রশস্ত তাতু নদী পার হন। এর মাধ্যমে তারা মূল বাহিনীর জন্য পথ খুলে দেন। আজ সেখান থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উজানে তাকাংশান হাইড্রোপাওয়ার স্টেশন পাহারা দেওয়া পিপলস আর্মড পুলিশ ফোর্সের সিছুয়ান কর্পসের সদস্যরা এখনো সেই ভয়াবহ নদী পারাপারের কথা বলেন। সেই চেতনা নিয়ে অঙ্গহানির শঙ্কা আর জীবন বাজি রেখে পাহাড়া দিয়ে যাচ্ছেন এক গুরুত্বপূর্ণ জলবিদ্যুৎকেন্দ্র।
ইয়া’আন ডিটাচমেন্টের ৪র্থ ডিউটি স্কোয়াড্রনের রাজনৈতিক প্রশিক্ষক ছেন সিনইয়ু জানান, তাতু নদীর ওপর এই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রটির ২১০ মিটার উঁচু বাঁধ রয়েছে। এটি সিছুয়ান এবং পূর্ব চীনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। এলাকাটি ভূমিকম্প, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। দেশমাতৃকার সেবায় তাদের জীবন বাজি রাখা গল্পগুলো ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ছেন বলেন, ‘তাতু নদী কয়েকটি এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বাঁধের নিরাপত্তা লাখো মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। আমাদের এখানে থাকার অন্যতম কারণ এটি।‘
সেখানে মোতায়েন ইউনিটটির প্রধান দায়িত্বগুলোর একটি হলো বাঁধ ও আশপাশের পাহাড়ের ঢালগুলোতে টহল দিয়ে নিরাপত্তার ঝুঁকি শনাক্ত করা। বাঁধের পাদদেশ থেকে একটি পাহাড়চূড়ার পর্যবেক্ষণ পয়েন্ট পর্যন্ত যেতে ৪৩০ মিটার উচ্চতা অতিক্রম করতে হয়। সবচেয়ে দুর্গম অংশে পাহাড়ের খাড়া ঢালে তৈরি ১,০০০-এর বেশি সিঁড়ি রয়েছে।
এই পাহাড়াদার দলের নেতা ওয়াং লোং। টহল দলের নিরাপত্তার বিষয়টিও দেখতে হয় তাকে। হঠাৎ তিনি চিৎকার দিয়ে বলেন, ‘পা রাখার আগে পায়ের অবস্থান ঠিক করো। নিচে তাকিয়ো না।‘ পেছনে থাকা এক নতুন সদস্যকে স্থির হতে সাহায্য করতে তিনি ঘুরে দাঁড়ান।
ঘন ঘন বৃষ্টির কারণে সিঁড়িগুলো পিচ্ছিল থাকে। ফলে প্রতিটি ধাপে সৈন্যদের হাতল শক্ত করে ধরে উঠতে হয়। কিছু অংশ এতটাই সরু যে তাদের পাহাড়ের ঢালের সঙ্গে শরীর ঠেসে চলতে হয়।
ওয়াং বলেন, ‘প্রতিবার এই পথ শেষ করার পর ঘামে আমাদের ইউনিফর্ম ভিজে যায়।‘ তিনি সাত বছর ধরে বাঁধটি পাহারা দিচ্ছেন। তিনি জানান, সারা বছর ধরে থাকা আর্দ্রতার কারণে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। আর কিছু প্রবীণ সদস্য বাত ও জয়েন্টের ব্যথায় ভোগেন।
সৈনিক লি ওয়েনমিন বলেন, ‘মশা ও ক্ষুদ্র পোকামাকড়ের কামড়ে চুলকানি হয়। আগাছায় ভরা এলাকায় সৈন্যদের সাপের ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হয়।‘
‘তাছাড়া শহর থেকে অনেক দূরে থাকায় একাকিত্বও বড় একটি পরীক্ষা। কিন্তু যখন ভাবি, এক পালার পাহারায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে এক বছর ধরে ৩০০ থেকে ৪০০টি পরিবারের চাহিদা মেটানো যায়, তখন মনে হয় আমাদের কাজটি সার্থক’, বলেন ওয়াং।
চূড়ায় পর্যবেক্ষণের কাজ শেষ করার পর সৈন্যরা সাধারণত কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন। এ সময় তারা প্রায়ই রেড আর্মির কথা বলেন।
সৈনিক পাই মেংছি বলেন, ‘দায়িত্বটি সত্যিই কঠিন। কিন্তু রেড আর্মির চেতনা আমাদের এই নতুন যুগে নিজেদের লং মার্চের পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।‘
২০২২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ইউনিটটির দায়িত্ববোধের আরও বড় পরীক্ষা হয়ে যায়। ওই দিন সিছুয়ানের কার্জে তিব্বতীয় স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রিফেকচারের পার্শ্ববর্তী লুতিং কাউন্টিতে ৬.৮ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূমিকম্পের মাত্র ১০ মিনিটের কিছু বেশি সময় পর স্কোয়াড্রনটি একটি উদ্ধারকারী দল পাঠায় শিমিয়ানের ছাওখ্য টাউনশিপে। এলাকাটি ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোর একটি ছিল। সেখানকার সড়কগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।
সৈন্যরা ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ধরে রাতভর এগিয়ে যান। ভূমিধসের ধ্বংসাবশেষ জমে বিপজ্জনক ঢাল তৈরি হয়েছিল। এক পাশে ছিল প্রবল স্রোতে বয়ে চলা তাতু নদী। প্লাটুন নেতা ইয়ু লিয়াংপিনের পেছনে থাকা করপোরাল ইয়াও ইয়ুচিয়ে আর প্রশ্ন না করে পারলেন না, ‘প্লাটুন নেতা, রাস্তা কোথায়?’ পেছনে না ফিরে ইয়ু বাতাসের মধ্যে চিৎকার করে বলেন, ‘রেড আর্মি যখন তাতু নদী পার হয়েছিল, তখন কি রাস্তা ছিল? আমার পায়ের ছাপ অনুসরণ করো!’
দলটি ধ্বংসাবশেষের স্তূপ বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে। সেখানে বিশাল পাথর এলোমেলোভাবে পড়ে ছিল। ইয়াও পা পিছলে পড়ে যান এবং তার শরীরের অর্ধেকটা শূন্যে ঝুলে যায়। ঠিক পেছনে থাকা স্কোয়াড নেতা মেং হোংলেই তার ব্যাকপ্যাক ধরে চিৎকার করে বলেন, ‘আমাকে ধরো! ছেড়ে দিয়ো না!’ নিরাপদে টেনে তোলার পর ইয়াও কাঁপছিলেন। কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমি ঠিক আছি, চলুন এগিয়ে যাই।‘
টানা ১৭ ঘণ্টা হাঁটার পর দলটি ছাওখ্যয় পৌঁছানো প্রথম দিকের উদ্ধারকারী দলগুলোর একটি হয়ে ওঠে। পরবর্তী কয়েক দিনে তারা ১৫ জনের বেশি আহত মানুষকে উদ্ধার করেন এবং ২০০ জনের বেশি বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন।
তাকাংশানের আশপাশের ভূমি অনুর্বর। তবে সেখানে স্থানীয় এক ধরনের কমলা হুয়াংকুওকান ভালোভাবে জন্মে। সৈন্যদের সুরক্ষার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতি ফসল মৌসুমে শিবিরের ফটকে এই ফল রেখে নীরবে চলে যান।
স্কোয়াড্রন নেতা হু চিংপো বলেন, ‘হুয়াংকুওকান যেন আমাদের দীর্ঘস্থায়ী লংমার্চের চেতনার মতো। বাতাস ও ঝড়ের মধ্য দিয়ে এটি যত এগোয়, ততই শক্তিশালী হয়ে ওঠে।‘সূত্র: সিএমজি
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

