মাসের পর মাস গোপনে নজরদারি: যেভাবে মাদুরোকে ধরল যুক্তরাষ্ট্র

সোমবার,

০৫ জানুয়ারি ২০২৬,

২২ পৌষ ১৪৩২

সোমবার,

০৫ জানুয়ারি ২০২৬,

২২ পৌষ ১৪৩২

Radio Today News

মাসের পর মাস গোপনে নজরদারি: যেভাবে মাদুরোকে ধরল যুক্তরাষ্ট্র

রেডিওটুডে রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১৩:২৪, ৪ জানুয়ারি ২০২৬

Google News
মাসের পর মাস গোপনে নজরদারি: যেভাবে মাদুরোকে ধরল যুক্তরাষ্ট্র

মাসের পর মাস নজরদারি, গোপন মহড়া, তারপর অন্ধকার রাতে বজ্রপাতের মতো অভিযান— যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর হাতে এভাবেই আটক হলেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। মার্কিন ইতিহাসে স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সবচেয়ে দুঃসাহসী সামরিক অভিযানটি যেমন বিস্ময় ছড়িয়েছে, তেমনি প্রশ্নও তুলেছে— কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে এমন হস্তক্ষেপ, আঞ্চলিক রাজনীতিতে এর প্রভাব এবং পরবর্তী ধাপ কী হতে পারে তা নিয়ে।

সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, গত কয়েক মাস ধরে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর চলাচলের প্রতিটি পদক্ষেপ নজরদারিতে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা। ভেনেজুয়েলা সরকারের ভেতরের একটি সূত্রসহ ছোট একটি দল দেখছিল— ৬৩ বছর বয়সী মাদুরো কোথায় ঘুমান, কী খান, কী পরেন— এমনকি শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষায়, ‘তার পোষা প্রাণীর’ খবরও রাখছিলেন মার্কিন গোয়েন্দারা।

সদ্য সমাপ্ত বছরের ডিসেম্বর মাসের শুরুতে চূড়ান্ত হয় ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ’ নামে একটি মিশন। কয়েক মাসের খুঁটিনাটি পরিকল্পনা ও মহড়ার ফল ছিল এটি। এমনকি মাদুরোর কারাকাসের নিরাপদ বাসভবনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিরূপ বানিয়ে সেখানে ঢোকার অনুশীলনও করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর এলিট ফোর্স। এই পরিকল্পনা ছিল এমন এক ব্যতিক্রমী সামরিক পরিকল্পনা যা স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে লাতিন আমেরিকায় আর দেখা যায়নি। বিষয়টি ছিল একেবারে গোপন। কংগ্রেসকে আগে থেকে জানানোও হয়নি। যখন সব প্রস্তুতি শেষ হয়—তখন ছিল কেবলই সঠিক সময়ের অপেক্ষা।

কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা চেয়েছিল এমনভাবে হামলা চালাতে যাতে চমকের উপাদানটা সবচেয়ে বেশি থাকে। চার দিন আগেই ট্রাম্প অনুমতি দিলেও আবহাওয়া ও মেঘমুক্ত আকাশের জন্য অপেক্ষা করা হয়। মার্কিন বাহিনীর শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল ড্যান কেইন বলেন, ‘ক্রিসমাস ও নববর্ষের মধ্যবর্তী সপ্তাহগুলোতে সবুজ সংকেত মিললেই পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সেনা সদস্যরা তৈরি ছিল’।

শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে প্রেসিডেন্টের আদেশ আসে। ট্রাম্প পরে বলেন, ‘চার দিন আগে করতাম, তিন দিন আগে, দুই দিন আগে— হঠাৎ জানালা খুলে গেল, আর আমরা বললাম— যাও’। জেনারেল কেইন জানান, প্রেসিডেন্ট তাদের বলেছিলেন— ‘গুড লাক অ্যান্ড গডস্পিড’। কারাকাসের সময় অনুযায়ী তখন প্রায় মধ্যরাত—অর্থাৎ অন্ধকারে কাজ করার জন্য ছিল পুরো রাতটাই হাতে ছিল।

এরপর শুরু হয় আকাশ, স্থল ও সমুদ্রপথ মিলে দুই ঘণ্টা কুড়ি মিনিটের এক অভিযান— যা ওয়াশিংটনসহ বিশ্বকে হতবাক করে। আকার ও নির্ভুলতার দিক থেকে প্রায় নজিরবিহীন। অনেক আঞ্চলিক শক্তি তাৎক্ষণিক নিন্দা জানায়। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা বলেন, এক দেশের নেতৃত্বকে সহিংসভাবে গ্রেপ্তার ‘পুরো বিশ্বব্যবস্থার জন্য ভয়ঙ্কর নজির’।

ট্রাম্প হোয়াইট হাউস সিচুয়েশন রুম থেকে অভিযানটি দেখেননি। বরং ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোতে উপদেষ্টাদের সঙ্গে বসে সরাসরি সম্প্রচার দেখেছেন। এসময় সিআইএ পরিচালক জন র‌্যাটক্লিফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ছিলেন পাশে। ট্রাম্প বলেন, ‘যেন টেলিভিশন শো দেখছি। যে গতি, যে সহিংসতা— অবিশ্বাস্য কাজ করেছে তারা।’

এর আগের কয়েক মাসে হাজার হাজার মার্কিন সেনা অঞ্চলটিতে মোতায়েন করা হয়। ছিল বিমানবাহী রণতরী ও বহু যুদ্ধজাহাজ। আর এটি ছিল গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ। ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক চোরাচালান ও নার্কো–টেররিজমের অভিযোগ তোলে এবং মাদকবাহী সন্দেহে বহু ছোট নৌকা ধ্বংস করে।

অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভের প্রথম লক্ষণ দেখা যায় আকাশে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, পুরো রাতজুড়ে বোমারু বিমান, যুদ্ধবিমান ও নজরদারি বিমানসহ ১৫০টির বেশি বিমান ব্যবহার করা হয়। ট্রাম্প বলেন, ‘খুব জটিল অপারেশন। সম্ভাব্য প্রতিটি পরিস্থিতির জন্য আমাদের ছিল একটি করে ফাইটার জেট।’

স্থানীয় সময় রাত ২টার দিকে কারাকাসে বড় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। শহরের ওপর ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। এক সাংবাদিক বিবিসিকে বলেন, ‘জানালা কাঁপিয়ে দেয়া শব্দ, তারপর বিশাল ধোঁয়ার মেঘ’। শহরের ওপর ঘুরতে থাকে বিমান ও হেলিকপ্টার। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বহু ভিডিও, বিস্ফোরণের ধোঁয়া, আগুন, আকাশে উড়োজাহাজের সারি। এক ভিডিওতে দেখা যায়— অনেক নিচু দিয়ে হেলিকপ্টারের বহর উড়ে যাচ্ছে, চারপাশে ধোঁয়া।

একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘রাত ১টা ৫৫ মিনিটে বিস্ফোরণের গর্জনে তার ঘুম ভাঙে, এসময় পুরো শহর ছিল অন্ধকার, শুধু বিস্ফোরণের আলো জ্বলছিল’। মানুষজন বিভিন্ন গ্রুপ চ্যাটে আতঙ্কের বার্তা দিচ্ছিল— আসলে কি ঘটছে বা কি হচ্ছে তা কেউ বুঝতে পারছিল না।

বিবিসির ভেরিফাই টিম বেশ কিছু ভিডিও বিশ্লেষণ করে পাঁচটি টার্গেট নিশ্চিত করেছে— এগুলোর মধ্যে জেনারালিসিমো ফ্রান্সিসকো দে মিরান্ডা এয়ারবেস, লা কার্লোটা এয়ারফিল্ড এবং ক্যারিবীয় সাগরের প্রবেশদ্বার পোর্ট লা গুয়াইরাও ছিল। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক স্থাপনাও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে ছিল।

ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, অভিযানের আগে কারাকাসে বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তবে কীভাবে তা কাটা হয়েছে তা বলেননি তিনি। তার ভাষায়, ‘কারাকাসের আলো নিভে গিয়েছিল আমাদের বিশেষ দক্ষতার কারণে। অন্ধকার— আর প্রাণঘাতী হামলা।’

বিস্ফোরণের মধ্যেই মার্কিন বাহিনী শহরে ঢোকে। বিবিসি–সিবিএস সূত্রে জানা যায়, এতে অংশ নেয় মার্কিন সামরিক বাহিনীর ডেল্টা ফোর্সসহ অভিজাত কমান্ডোরা। তাদের সঙ্গে ছিল ব্লোটর্চ। প্রয়োজনে ভারী ধাতব দরজা কাটার জন্য এটি সঙ্গে রেখেছিলেন তারা। জেনারেল কেইনের মতে, হামলা শুরুর পর রাত ২টা ১ মিনিটেই তারা মাদুরোর অবস্থানে পৌঁছে যায়।

ট্রাম্প বললেন, ‘এটি ছিল কারাকাসের প্রাণক্রেন্দ্রে একটি শক্তিশালী ‘দুর্গ’। ওরা প্রস্তুত ছিল— ওরা জানত আমরা যাচ্ছি। সেখানে পৌঁছানোর পরপরই গুলিবর্ষণের মুখে পড়ে মার্কিন বাহিনী। একটি হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও উড়তে থাকে। জেনারেল কেইন বলেন, ‘দ্রুত গতি ও নিখুঁত শৃঙ্খলায় মাদুরোর কম্পাউন্ডে ঢুকে পড়ে মার্কিন বাহিনী।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘যে স্টিলের দরজা ভাঙা সম্ভব না বলে ভেবেছিল তারা— তার সবই ভেঙে ঢুকেছে আমাদের দল’। অপারেশনের মাঝপথে— যখন মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসও আটক হন, তখন থেকেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও আইনপ্রণেতাদের জানানো শুরু করেন। এতে ক্ষুব্ধ হন কংগ্রেসের কয়েকজন।

ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার বলেন, ‘মাদুরো অবৈধ স্বৈরশাসক— এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছাড়া সামরিক হামলা— এটি বেপরোয়া সিদ্ধান্ত’। রুবিও বলেন, আগেভাগে জানালে অপারেশন ঝুঁকিতে পড়ত। ট্রাম্প বলেন, ‘কংগ্রেস থেকে তথ্য ফাঁস হওয়ার প্রবণতা আছে, এটা ভালো কিছু নয়’।

মাদুরোর কম্পাউন্ডে ঢোকার পর, ট্রাম্পের দাবি— যে মানুষটি কিউবান দেহরক্ষীর ওপর ক্রমেই নির্ভরশীল হয়েছেন তিনি সেফরুমে পালাতে চেয়েছিলেন। দরজা পর্যন্ত গিয়েছিলেন কিন্তু বন্ধ করতে পারেননি, ৪৭ সেকেন্ডেই উড়িয়ে দেয়া যেত।’

মাদুরো যদি মার্কিন বাহিনীকে প্রতিরোধ করতেন, তাহলে তাকে কি হত্যা করা হতো? এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘হতে পারত’। মার্কিন বাহিনীর ‘কয়েকজন আহত’ হলেও কেউ নিহত হয়নি। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলা এখনও হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করেনি।

এর আগে মাদুরোকে গ্রেপ্তারের তথ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ৫ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। কিন্তু শনিবার স্থানীয় সময় ৪টা ২০ মিনিটে তাকে নিয়ে হেলিকপ্টার যুক্তরাষ্ট্রের দিকে উড্ডয়ন করার প্রায় এক ঘণ্টা পর ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ‘মাদুরো ও তার স্ত্রী এখন আমেরিকার আইনের মুখোমুখি।’

রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের