মার্কিন হামলার জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে ফের হামলা ইরানের

বৃহস্পতিবার,

০৯ জুলাই ২০২৬,

২৫ আষাঢ় ১৪৩৩

বৃহস্পতিবার,

০৯ জুলাই ২০২৬,

২৫ আষাঢ় ১৪৩৩

Radio Today News

মার্কিন হামলার জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে ফের হামলা ইরানের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯:৩৮, ৯ জুলাই ২০২৬

Google News
মার্কিন হামলার জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে ফের হামলা ইরানের

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী এ তথ্য জানায়। এর জবাবে ইরান কুয়েত ও বাহরাইনে হামলা চালায়। চলমান যুদ্ধ থামাতে যে কূটনৈতিক উদ্যোগ চলছিল, নতুন এই পাল্টাপাল্টি হামলায় তা আরো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র জানায়, গত মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া তিনটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করেন তিনি।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ড সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানায়, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের জন্য ইরান যে হুমকি তৈরি করছে, তা আরো কমিয়ে আনতেই নতুন হামলা শুরু হয়েছে। সেন্টকমের দাবি, আন্তর্জাতিক এই জলপথ দিয়ে চলাচল করা বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের ওপর সাম্প্রতিক হামলার জন্য ইরান দায়ী। মার্কিন হামলার পর ইরানের দক্ষিণ উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়।

এর জবাবে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো কুয়েত ও বাহরাইনে হামলা চালায় ইরান। দেশ দুটিতে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তারা ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করছে। অন্যদিকে কাতার কিছু সময়ের জন্য উচ্চ নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, বুধবার ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরিমাণ মঙ্গলবারের তুলনায় আরো বেশি হবে।

এদিকে ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, আগের দিন জাহাজে ইরানের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এই অভিযান চালানো হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটলে আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে।

বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হতো। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর ইরানের প্রভাব থাকায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও দেশটির বড় ধরনের কৌশলগত অবস্থান রয়েছে। যদিও জাহাজে হামলার দায় ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি, তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, আলোচনায় বাড়তি সুবিধা পেতেই তেহরান এমন পদক্ষেপ নিয়েছে। ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, হুমকি দিয়ে এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে যুক্তরাষ্ট্র কোনো মূল্য না দিয়েই পার পেয়ে যাবে- এমন ধারণা ভুল। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ইরানও পাল্টা হামলা চালাবে। তিনি আরো বলেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে শুধু ইরানের নির্ধারিত ব্যবস্থার অধীনে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বা হুমকির মাধ্যমে নয়।

সাম্প্রতিক এই হামলা-পাল্টা হামলার পর ১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারককে স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপ দেওয়ার সম্ভাবনা আরো কমে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বুধবার তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনে যাওয়ার আগে সাংবাদিকরা ট্রাম্পকে সমঝোতা স্মারকটি শেষ হয়ে গেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার কাছে এটি 'শেষ' বলেই মনে হচ্ছে এবং তিনি আর ইরানের সঙ্গে আলোচনা করতে চান না। পরে ট্রাম্প বলেন, ভবিষ্যতে কোনো চুক্তি হলেও তা টিকবে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তার ভাষায়, ইরানের ওপর তার আস্থা নেই। তবে একই দিনে তিনি আবারও বলেন, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ আবার শুরু হবে বলে তিনি মনে করেন না। তার দাবি, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, খুব দ্রুত এর সমাপ্তি হবে এবং এতে তেলসহ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা আরো নিরাপদ হবে। নতুন সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। গ্রিনিচ সময় বুধবার রাত ১২টা ৫৪ মিনিট পর্যন্ত ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ দশমিক ৮০ ডলারে ওঠে। তবে এপ্রিলের শেষ দিকে যে দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের বেশি ছিল, তার তুলনায় বর্তমান দাম এখনো অনেক কম।

ইরানের সংবাদমাধ্যম জানায়, নতুন হামলাগুলো মূলত দেশের দক্ষিণ উপকূলজুড়ে চালানো হয়েছে। হামলার আওতায় ছিল হরমুজ প্রণালি থেকে ওমান উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা। হামলার শিকার হওয়া এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের সবচেয়ে বড় বন্দর বন্দর আব্বাস। এই শহরে হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি এবং বিপ্লবী গার্ডের স্থাপনা রয়েছে। এছাড়া পাকিস্তান সীমান্তের কাছের উপকূলীয় শহর কোনারাক ও চাবাহারেও হামলা হয়েছে। মেহের সংবাদ সংস্থা জানায়, হামলায় চাবাহারের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলেও পরে অধিকাংশ এলাকায় তা স্বাভাবিক করা হয়েছে। একই সঙ্গে সমুদ্রপথের যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ইরানশাহর শহরের বিমানবন্দরে হামলায় এক দমকলকর্মী নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলের আক্কালা শহরের কাছে একটি রেলসেতুতেও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে প্রেস টিভি।
 
মার্কিন হামলার আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযান দুই দেশের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করেছে। তার দাবি, ওই সমঝোতা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ইরানের। ইরানের সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের এক মুখপাত্র বলেন, পরিস্থিতির জবাবে দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে সরে আসার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। পাশাপাশি পারমাণবিক নীতিতেও পরিবর্তন আনা হতে পারে। তিনি আরো বলেন, লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে থাকা বাব আল-মানদেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার বিকল্পও বিবেচনায় রয়েছে। এই জলপথও বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে বুধবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো এক চিঠিতে জাতিসংঘে ইরানের স্থায়ী মিশন অভিযোগ করে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা জাতিসংঘ সনদ, আন্তর্জাতিক আইন এবং দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের প্রকাশ্য লঙ্ঘন।

রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের