সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে খুন, ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের মতো অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। এছাড়াও প্রতিবেদনে অপরাধ প্রতিরোধে কিছু উদ্যোগ বা পদক্ষেপের কথাও উঠে এসেছে।
আজ (রোববার, ৭ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটি এ তথ্য তুলে ধরে। এ সময় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে সরকারের ১০০ দিনে অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন চিত্র তুলে ধরা হয়। সেখানে, মার্চ ও এপ্রিল মাসে দেশে মোট ৬০৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ১৯৬টি অপহরণ, ২৯৪টি ছিনতাই ও ৯০টি ডাকাতির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ের মধ্যে পুলিশের ওপর ১২৯টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া, চুরির সংখ্যা ছিল ২ হাজার ২১৪টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ৩ হাজার ৪৯৬টি। আলোচিত দুই মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৮ থেকে ১০২ জন, গণধর্ষণের শিকার ৩০ থেকে ৩৬ জন এবং ধর্ষণের শিকার শিশুর সংখ্যা ৪৯ থেকে ৭১ জন।
এছাড়াও গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৬৯ থেকে ৮০টি, গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৩১ থেকে ৪২ জন, গণপিটুনিতে আহত হয়েছেন ৭০ থেকে ১২৫ জন, কারা হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ১৪ থেকে ১৮ জন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নির্যাতনে আহত হয়েছে ৫ জন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ১ জন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও অবমাননা অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে ৭ জন এবং দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে তিনটি।
সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য প্রতিবেদন তুলে ধরেন সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ গবেষক জুলকারনাইন। প্রতিবেদনের আইন-শৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষণের অংশে বলা হয়েছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু, সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় ক্রমবর্ধমান ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
এ ছাড়া, কিশোর গ্যাংয়ের অব্যাহত তৎপরতার ক্ষেত্রে ঢাকায় সংঘটিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই কিশোর। বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের কিছু উদ্বেগজনক ঘটনা লক্ষণীয়। গণপিটুনি ও মব সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হলেও কার্যকরভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি।
বিভিন্ন স্থানে মাজার এবং ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা, কুষ্টিয়া ও সিলেটে মাজার ও বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর এবং একজন পীরকে পিটিয়ে হত্যা, কারা হেফাজতে মৃত্যু এবং ক্ষমতাসীন দলের এক নেতাকে নিয়ে ফেসবুকে সমালোচনামূলক পোস্ট দেওয়ার জেরে একজনকে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে।
সরকারের ১০০ দিনে অপরাধ প্রতিরোধে কিছু উদ্যোগ বা পদক্ষেপের কথাও উঠে এসেছে। তার মধ্যে সরকার গঠনের পর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ঘোষণা করা হয়েছে। কিশোর গ্যাং, অনলাইন জুয়া, সংঘবদ্ধ অপরাধ, মাদক, সন্ত্রাস ও সাইবার অপরাধ দমনে অভিযান পরিচালনা।
পর্যায়ক্রমে মাঠ থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার শুরু, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুরোপুরি পুলিশ বাহিনীর ওপর ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত এবং মব ভায়োলেন্স প্রতিরোধে সরকারের কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা এসেছে।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই নাজুক ছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, খুন, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, লুটপাট ও অরাজকতার ঘটনা অব্যাহত ছিল। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব অপরাধের ঘটনা সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভবিষ্যতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে টিআইবি। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

