প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে মোংলা বন্দর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ নিয়ে ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে চুক্তি হয়েছে। তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে বেইজিংয়ের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম ও মোংলায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নেও কাজ করবে বেইজিং।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে গত শুক্রবার শীর্ষ বৈঠক শেষে ওই দিনই দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রায় এক দশক পর কোনো বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন কৌশলগত অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গতকাল শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সফর-পরবর্তী ব্রিফিং করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ডের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সফরটি ছিল অত্যন্ত সফল এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকে রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, আঞ্চলিক সংযোগ, প্রযুক্তি, কৃষি, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। তিনি জানান, দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের এই সমঝোতা আগামী দিনের সহযোগিতার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করেছে। রাজনৈতিকবিশ্লেষণ
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের জন্য গতকাল জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে অভূতপূর্ব সাফল্য বলে উল্লেখ করেন তিনি। প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এর পর সংসদে আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তখন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদ নেতাকে ধন্যবাদ প্রস্তাবের বিষয়ে জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে তাদের স্বার্থ দেখার। মালয়েশিয়া ও চীন সফরে দেশের ও দেশের মানুষের স্বার্থ নিয়ে কথা বলেছি। সেই স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছি। এখানে ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নেই। সফরে যদি ভালো কিছু অর্জিত হয়ে থাকে, তা বাংলাদেশের অর্জন। দেশের মানুষের অর্জন।’
দুই দেশের সম্পর্কের নতুন উচ্চতা
সফরের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে বাংলাদেশ ও চীন তাদের সম্পর্ককে ‘সার্বিক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব’ থেকে ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ নির্মাণের অংশীদারিত্বে’ উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে। ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানান, দুই দেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ আরও জোরদার, কৌশলগত সংলাপ সম্প্রসারণ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতা গভীর করার বিষয়ে অঙ্গীকার করা হয়েছে।
ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ ঘোষণা শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন কৌশলগত ভিত্তি পেয়েছে, যা আগামী বছরগুলোতে দুই দেশের সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকর করবে।
ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ সনদ, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং পারস্পরিক সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান– এই নীতিগুলোর ভিত্তিতে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়া হবে। বাংলাদেশ পুনরায় ‘এক চীন’ নীতির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিজস্ব উন্নয়ন পথ বেছে নেওয়ার অধিকারে সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে বেইজিং।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও), আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (আরসিইপি) এবং অন্যান্য আঞ্চলিক উদ্যোগে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির প্রচেষ্টার প্রতিও ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে চীন। তাঁর মতে, এসব প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ভবিষ্যতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
১৭ চুক্তি-এমওইউ
চীন সফরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মোট ১৭টি সমঝোতা, চুক্তি, কর্মপরিকল্পনা ও সহযোগিতা দলিল সই হয়েছে। এর মধ্যে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে আটটি সমঝোতা স্মারক, তিনটি চুক্তি, একটি প্রটোকল এবং একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা স্বাক্ষরিত হয়। মানবসম্পদ উন্নয়ন, চীনের প্রস্তাবিত বৈশ্বিক উন্নয়ন রূপকল্প এগিয়ে নেওয়া, কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ ও সবুজ জ্বালানিতে বিনিয়োগ বিষয়ে পৃথক চারটি এবং গণমাধ্যম খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং যৌথ গবেষণার বিষয়ে আরও চারটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।
উন্নয়ন সহযোগিতা, চীনা ভাষা শিক্ষা এবং মোংলা বন্দর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে পৃথক তিনটি চুক্তি হয়। কাঁঠাল রপ্তানি সংক্রান্ত একটি প্রটোকল এবং বংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে যৌথ কর্মপরিকল্পনা স্বাক্ষরিত হয়।
এ ছাড়া বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও চীনের দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটি বিনিয়োগ চুক্তি ও একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এর মধ্য বিডা ও চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক শিল্পাঞ্চলের (সিইআইজেড) মধ্যে ভূমি উন্নয়ন ও ইজারা সংক্রান্ত এবং বিডা ও সিসিপিআইটির মধ্য সহযোগিতা সংক্রান্ত চুক্তি সই হয়। আর চীন-বাংলাদেশ মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চলের (সিবিএমপিইজেড) উন্নয়নে চীনা প্রতিষ্ঠান সিসিইসিসির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করে বিডা। বাংলাদেশেরঅর্থনীতি
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব সমঝোতা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করবে। এর মধ্যে মোংলা বন্দর, চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল, সবুজ উন্নয়ন, কৃষিপণ্য রপ্তানি, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন-সংক্রান্ত সমঝোতাগুলো বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে জানান, চট্টগ্রামের আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চলে দ্রুত শিল্পকারখানা স্থাপন বিষয়ে চীনা উদ্যোক্তারা ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে তারা দ্রুত বিনিয়োগ কার্যক্রম শুরুর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সরকারের প্রত্যাশা, এসব বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানিতে নতুন গতি আসবে।
পররাষ্ট্র-প্রতিরক্ষায় নতুন বার্তা
অর্থনীতি ও অবকাঠামোর গণ্ডি ছাড়িয়ে এবারের সফরের সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘টু প্লাস টু (২+২)’ সংলাপ চালু করা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এই কাঠামোর আওতায় দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা নিয়মিত বৈঠক করবেন। পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে পৃথক কৌশলগত সংলাপও চালু হবে।
ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছে, কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে দুই দেশ ‘২+২’ সংলাপ কাঠামো গড়ে তুলবে। একই সঙ্গে সামরিক প্রতিনিধি বিনিময়, প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানো হবে।
তিস্তা প্রকল্পে নতুন গতি
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পটির (টিআরসিএমআরপি) সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করতে এবং বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে সম্মত হয়েছে চীন। তাঁর মতে, তিস্তা নিয়ে আলোচনা আর নীতিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; এখন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে দুই দেশ একমত।
মন্ত্রী জানান, তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত শেষ করতে এবং পরবর্তী বাস্তবায়ন পর্যায়ে চীন তার সক্ষমতা অনুযায়ী সহযোগিতা করবে। একই সঙ্গে নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি সংরক্ষণ, নদী খনন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়েও সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মোংলা বন্দর
সফরে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের আলোচনায় নতুন গতি এসেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন বিষয়ে দুই দেশ একমত। মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতার বিষয়টি ত্বরান্বিত হবে।
বিআরআই ও শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগে জোর
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, চট্টগ্রামের চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়ে দুই দেশ একমত। পাশাপাশি বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় অবকাঠামো, যোগাযোগ ও শিল্প খাতে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় রেখে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি ছোট কিন্তু জনকল্যাণমূলক প্রকল্পেও সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কুনমিং থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত মাল্টিমোডাল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোরের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। GeographicReference
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে নতুন আশা
চীন সফরের আগে মালয়েশিয়া সফর বিষয়েও ব্রিফিংয়ে কথা বলেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি জানান, বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ পুনরায় শুরু, আট হাজার কর্মীর কাজে যোগদান, দক্ষ কর্মী পাঠানো, অনিয়মিত কর্মীদের বৈধকরণ এবং নিয়োগ ব্যয় কমানোর বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) আলোচনা এগিয়ে নেওয়া, যৌথ বিজনেস কাউন্সিল গঠন এবং রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান তিনি। সূত্র: সমকাল
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

