বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকায় উন্নয়ন কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ৫০ মিটার ও ৫০০ মিটারের বিভিন্ন বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করে পর্যটন, বাণিজ্য ও সেবাখাতভিত্তিক আধুনিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে কক্সবাজারকে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সচিবালয়ে কক্সবাজারের সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজারের পর্যটন সম্ভাবনাকে পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগাতে হলে বিদ্যমান বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় ৫০ মিটার ও ৫০০ মিটারের বিধিনিষেধ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কতটা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে, তা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, যেখানে পর্যটন উন্নয়ন হবে, সেখানে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে উঠতে হবে। পরিবেশ রক্ষা নিশ্চিত করেই উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
তিনি বলেন, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তবে এমন কোনো বিধিনিষেধ থাকা উচিত নয়, যাতে সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উপকূলীয় অঞ্চলে পরিকল্পিত উন্নয়ন হয়েছে, বাংলাদেশকেও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক আয়তন সীমিত হওয়ায় পরিকল্পিত নগরায়ণের বিকল্প নেই। শিল্পাঞ্চল, কৃষিজমি ও জলাধার সংরক্ষণের স্বার্থে উল্লম্ব বা ভার্টিক্যাল উন্নয়নকে উৎসাহিত করতে হবে। বিশ্বের অনেক সফল পর্যটন নগরী বহুতল ভবন ও আধুনিক নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। কক্সবাজারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিকল্পিত উন্নয়ন প্রয়োজন।
তিনি জানান, কক্সবাজারকে ঘিরে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে, রেল যোগাযোগ চালু হয়েছে এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব অবকাঠামোর সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে কক্সবাজারকে আধুনিক ডিজিটাল পর্যটন নগরীতে রূপান্তর করা হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে কক্সবাজার অন্যতম প্রবৃদ্ধি কেন্দ্র বা গ্রোথ হাব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। পর্যটন, বাণিজ্য, সেবাখাত এবং সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সৃষ্টি করবে।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কক্সবাজারের সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব অর্থমন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হবে, যা ভবিষ্যৎ উন্নয়নের রূপরেখা নির্ধারণ করবে।
তিনি বলেন, মাস্টারপ্ল্যানের মূল লক্ষ্য হবে কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যটন হাব এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব পর্যটন এলাকা নির্ধারণ, মেরিন ড্রাইভ ও উপকূলীয় এলাকার বিদ্যমান বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, কক্সবাজারে বিশ্ববিদ্যালয়, আধুনিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ সুবিধা, নিরাপদ পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং পানি শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করে কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন ও বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজার শুধু দেশের প্রধান পর্যটন গন্তব্য হিসেবেই নয়, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক পর্যটন ও বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

