চলমান শিক্ষকসংকট নিরসনে আগামী মাস (জুলাই) থেকে দেশজুড়ে বড় পরিসরে শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, বর্তমানে শুধু বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই প্রায় ৭৭ হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এর পাশাপাশি সরকারি স্কুল-কলেজেও বিপুলসংখ্যক শূন্যপদ রয়েছে, যা পূরণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার।
রোববার সিলেটের জালালাবাদ গ্যাস ভবন অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা উপলক্ষে সিলেট শিক্ষা বোর্ড এবং সিলেট অঞ্চলের মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কেন্দ্রপ্রধানদের (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) নিয়ে এই সভার আয়োজন করা হয়।
দেশের বিভিন্ন স্থানে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইংরেজি, আইসিটি ও বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছে না উল্লেখ করে ড. মিলন বলেন, দীর্ঘদিন শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও একজন বা দুজন শিক্ষক দিয়ে পুরো বিদ্যালয় চলছে। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকলে ছাত্ররা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়বে। আর শিক্ষক পর্যাপ্ত না থাকার দোষটা মূলত শিক্ষামন্ত্রীর। কারণ শিক্ষাব্যবস্থাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা আমারই দায়িত্ব।
তিনি জানান, এবার বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মামলা ও প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে থাকা প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের দীর্ঘদিনের শূন্যপদ ও পদোন্নতির সমস্যা নিরসনেও কাজ করছে সরকার।
শিক্ষক নিয়োগে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব চলবে না ঘোষণা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ আরও স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক করতে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগের সুযোগ কমিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা হবে। যোগ্যতার ভিত্তিতেই শিক্ষকরা নিয়োগ পাবেন।
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস কিংবা এর গুজব—কোনোটিই বরদাশত করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, বিগত কয়েকটি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়িয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছে। অথচ বাস্তবে প্রশ্নফাঁস হয়নি। শিক্ষা নিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে কেউ ভাইরাল হবে, আর সরকার চুপ থাকবে—তা হবে না।
পরীক্ষা কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবার বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের কাছে ‘বডি ক্যামেরা’ থাকবে। একই সঙ্গে সিসিটিভি ক্যামেরাসহ ডিজিটাল মনিটরিংয়ের মাধ্যমে কেন্দ্রগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোনো কেন্দ্রে নকল ধরা পড়লে কেন্দ্রসচিবসহ সংশ্লিষ্টদের কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
২০০১ সালের সফল নকলবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করে মন্ত্রী বলেন, আমরা তো বিদেশ থেকে শিক্ষক আমদানি করিনি। আপনাদের (শিক্ষকদের) দ্বারাই তখন নকল প্রতিরোধ করেছিলাম।
এ সময় সভায় উপস্থিত একজন শিক্ষক পরীক্ষা পরিচালনা নিয়ে একটি যৌক্তিক প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পরীক্ষায় ১,০০০ শিক্ষার্থীকে ভোগান্তিতে ফেলে অন্য দূরবর্তী কেন্দ্রে পাঠানোর চেয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ১০ জন শিক্ষককে কেন্দ্রে স্থানান্তর করাই অধিক কার্যকর ও মানবিক সমাধান। শিক্ষামন্ত্রী এই প্রস্তাবটির ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তা ইতিবাচকভাবে গ্রহণের আশ্বাস দেন।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, শুধু পরীক্ষা নয়, দেশের প্রতিটি জেলার শিক্ষা পরিস্থিতি সরাসরি পর্যালোচনা এবং শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি চালু করা হবে। শিক্ষক উপস্থিতি ও পাঠদানের নিয়মিততা প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
সভায় শিক্ষকসংকট, এমপিও, সরকারিকরণ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কেন্দ্রপ্রধান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন সমস্যা ও মতামত তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্য শোনার পর শিক্ষামন্ত্রী ধাপে ধাপে সব সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

