জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত এই বাজেট আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
পুরো বাজেট বক্তৃতার দ্বিতীয় অংশ হুবহু তুলে ধরা হলো
যোগাযোগ অবকাঠামো
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত, যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ এবং নগর পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
একইসঙ্গে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যেমন-
মহাসড়ক উন্নয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোর চার লেনে উন্নীতকরণ এবং সমন্বিত যোগাযোগ কাঠামোর মাধ্যমে একটি মাল্টিমোডাল হাব গড়ে তোলা;
সড়ক নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে ৯৪টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন;
দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ‘সেফটি সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ ভিত্তিক বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়েছে।
অটোমেটেড ফিটনেস সার্টিফিকেট ব্যবস্থা এবং পেশাজীবী চালকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার;
প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার জাতীয় এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড গড়ে তুলতে সম্ভাব্য করিডোর চিহ্নিতকরণ;
রিং রোড ও রেডিয়াল রোড নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকার যানজট নিরসন;
৬টি মেট্রোরেল লাইনের সমন্বয়ে আধুনিক গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযুক্ত মনোরেলভিত্তিক ফিডার নেটওয়ার্ক নির্মাণ;
পুরোনো বাস পর্যায়ক্রমে ইলেকট্রিক বাস দ্বারা প্রতিস্থাপন;
দ্বিতীয় যমুনা সেতু, তৃতীয় মেঘনা সেতু ও ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ;
ইলেকট্রনিক টোল ও স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
রেলপথ উন্নয়ন
নিরাপদ, আধুনিক ও দক্ষ রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার রেলওয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তঃদেশিয় সংযোগ সম্প্রসারণে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। একই সঙ্গে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে রেলপথকে অধিক কার্যকর ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, যেমন-
সকল জেলাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা এবং বন্দরসমূহের সাথে রেল সংযোগ সম্প্রসারণ;
আধুনিক লোকোমোটিভ, ক্যারেজ ও ওয়াগন সংগ্রহ;
সৈয়দপুর ও পাহাড়তলী রেলওয়ে ওয়ার্কশপের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয়ভাবে কোচ ও লোকোমোটিভ সংযোজন (assembling);
ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ ও আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালু; এবং
ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন ও উচ্চগতির রেল সংযোগ চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ঢাকা-কুমিল্লা অংশে কর্ডলাইন নির্মাণ করা হবে, যার ফলে এ পথের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার কমে আসবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে করিডোর প্রতিষ্ঠা এবং চট্টগ্রামকে লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা।
নৌ-পরিবহন
ব্যয়-সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও দক্ষ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার নৌপরিবহন খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর আধুনিকায়ন এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে, যেমন-
নৌপরিবহন খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ নৌপথের উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার;
ড্রেজিং কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং দক্ষতা উন্নয়ন;
নদীবন্দর ও লঞ্চঘাট আধুনিকায়ন;
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বাস্তবায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ট্রান্সশিপমেন্ট সক্ষমতা বৃদ্ধি;
মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন, জেটি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং কার্গো হ্যান্ডলিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে;
চট্টগ্রাম বে-টার্মিনাল, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল ও লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ;
নৌপথ সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে ড্রেজিং ও খনন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে; এবং
আধুনিক নৌবন্দর অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সমন্বিত নৌপরিবহন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ।
বেসামরিক বিমান পরিবহন
বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে সমন্বিত উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যেমন-
২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান এভিয়েশন হাবে উন্নীত করার উদ্যোগ;
জাতীয় এয়ার কানেকটিভিটি গ্রিড গড়ে তোলা;
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিকস ও যাত্রী হাবে উন্নীতকরণ;
কক্সবাজার, যশোর, রাজশাহী ও সৈয়দপুরকে আন্তর্জাতিক গেটওয়ে হিসেবে গড়ে তোলা;
বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি আধুনিক উড়োজাহাজ ক্রয়ের লক্ষ্যে চুক্তি স্বাক্ষর;
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল শিগগিরই চালুর প্রস্তুতি;
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রায় ৯৪ হাজার বর্গমিটার জায়গাজুড়ে ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করা হয়েছে;
জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ৬-৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা;
বৃহৎ পর্যটন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ খাতে পর্যটক আকর্ষণ ও বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিনিয়োগ রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হচ্ছে; এবং
বাংলাদেশ বিমানের আন্তর্জাতিক সংযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি যাত্রীসেবা ও কার্গো ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন।
দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা ইত্যাদির গুরুত্ব বিবেচনায় যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন বাবদ আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব পেশ করছি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট বরাদ্দ ছিল ৪৮ হাজার ২৯২ কোটি টাকা।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, বন্যাসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত অভিঘাতে জর্জরিত। আমাদের লক্ষ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা। এ উদ্দেশ্য পূরণে আমাদের সরকার ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, যেমন-
আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। এর ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩.৫ লাখ সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৫,৯৬০ হেক্টর ব্লক বাগানে ৪ কোটি ২৮ লাখ ৯৭ হাজার চারা রোপণ। ৩,৭২৭ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগানে ৩৭ লাখ ২৭ হাজার চারা রোপণ। ৪,০০০ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বাগানে ১ কোটি ৭৭ লাখ ৭৬ হাজার চারা রোপণ। বসতবাড়ি বনায়নে ৫৬ লাখ চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি কর্মসূচি’-এর আওতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে নিজ বাসায় বা আঙিনায় ১ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনের ৫০ শতাংশকে কার্বন ট্রেডিং কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ‘Circular Future Model’ বাস্তবায়ন করা হবে।
পরিবেশ দূষণ রোধে আগামী অর্থবছরে নিম্নরূপ কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে, যেমন-
বায়ু দূষণ কমাতে ১৫টি CAMS এবং ১৬টি C-CAMS এর মাধ্যমে নিয়মিত বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করা।
যানবাহনের দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিআরটিএ-এর মাধ্যমে ১০টি আধুনিক Vehicle Inspection Centre স্থাপন করা হবে। ইলেকট্রিক বাস সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন গাইডলাইন ও হালনাগাদ বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে।
Reduce, Reuse, Recycle (3R) নীতির আওতায় আগামী পাঁচ বছরে প্লাস্টিক বর্জ্য ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের গভীরতা ও ব্যাপ্তি বিবেচনায় বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অধীনে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।
পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা
সমন্বিত ও সার্বিক পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। সেচ, বন্যা ব্যবস্থাপনা, নদীভাঙন রোধ, ভূমি পুনরুদ্ধার, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, লবণাক্ততা প্রতিরোধ ইত্যাদি বিষয়ে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যেমন-
সরকার দেশজুড়ে জলাবদ্ধতা নিরসন, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার লক্ষ্যে ব্যাপক খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
আগামী ৫ বছরে ২০,০০০ কি.মি ‘নদী-খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে, যার মধ্যে ইতোমধ্যে ৬,৫৯৮ কি.মি. খাল খননের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩০৯ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ, পুনঃনির্মাণ ও মেরামত এবং ফ্লাড ওয়াল নির্মাণ করা হবে;
৪৮৪ কিলোমিটার নদ-নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি ও ডুবোচর অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে;
নদী পুনরুদ্ধার কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি নদী বা জলাশয় দখলমুক্ত ও পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ধলেশ্বরী, লৌহজং, আলাইকুড়ি, মগড়া, সালতা, সুতাং, বাঁকখালী, বারনই নদী পুনরুদ্ধার এবং পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
হাওড়-বাওড় অঞ্চলের সমন্বিত উন্নয়ন এবং উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ততা নিরসন করার কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে।
‘পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প’ একনেক কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে আগামী ৭ বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। উক্ত প্রকল্পে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে; চারটি বিভাগের ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলা সুবিধা ভোগ করবে। এছাড়াও, আমাদের সরকার দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যবদল ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১০ হাজার ৫ শত ৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
আমাদের সরকার টেকসই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রশমনের লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে, যেমন-
অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি EGPP কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২০ লাখ গ্রামীণ শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে, যার এক-তৃতীয়াংশ নারী।
চলতি অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিখা) খাতে ১ হাজার ৫১০ কোটি টাকা এবং গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) খাতে ১ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দিয়ে গ্রামীণ অবকাঠামো সচল রাখা হয়েছে।
ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবিলায় ৫২১ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম ও ১১টি এরিয়াল প্ল্যাটফর্ম ল্যাডার ক্রয় করা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (CPP) জন্য ১০০ ভাগ বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১০ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি। যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ছিল ৯ হাজার ৬৯ কোটি টাকা।
নারী ও শিশু উন্নয়ন
নারীর ক্ষমতায়নই উন্নয়নের নির্দেশক। তাই, নারীর ক্ষমতায়ন ও শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। আধুনিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নারীদের স্বনির্ভরতা এবং শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। এক্ষেত্রে আমরা নিম্নরূপ কার্যক্রম গ্রহণ করেছি, যেমন-
কর্মজীবী নারীদের জন্য প্রথম ধাপে ২০টি এবং পরবর্তী ধাপে আরও ৬০টি আধুনিক দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
বিদেশ ফেরত নারী শ্রমিকদের পুনর্বাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
ভিডব্লিউবি (Vulnerable Women Benefit) কর্মসূচির আওতায় ১০.৪ লাখ নারীকে মাসিক ৩০ কেজি চাল দেয়া হচ্ছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ‘কুইক রেসপন্স টিম’ অধিকতর শক্তিশালী করা হচ্ছে।
পথশিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন করা হচ্ছে।
ঝুঁকিতে থাকা সুবিধাবঞ্চিত ও বিপন্ন শিশুদের সুরক্ষায় বর্তমানে দেশের ১৭টি জেলায় ৩৩টি ‘সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র’ পরিচালিত হচ্ছে।
নারী ও শিশু উন্নয়ন খাতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৫ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করছি।
ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি
আমরা ধর্মীয় বিভাজনের বিপরীতে সংহতি ও সাম্যে বিশ্বাস করি। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি নিশ্চিতকরণ, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সৃষ্টি, সকল ধর্মীয় প্রধানের সামাজিক মর্যাদা ও জীবনমান উন্নয়ন, সুষ্ঠুভাবে হজ কার্যক্রম সম্পাদন, ইসলামী গবেষণা কার্যক্রম, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
মসজিদের ক্ষেত্রে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমকে মোট ১০ হাজার টাকা এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পুরোহিত ও সেবায়েতকে মোট ৮ হাজার টাকা মাসিক ভিত্তিতে প্রদান করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত মোট ৬,৪৩৮টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৯,৫২০ জনকে মাসিক সম্মানী ও উৎসব ভাতা প্রদান করা হয়েছে;
পর্যায়ক্রমে এ সুবিধা সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে আগামী বাজেটে এ বাবদ ১,০৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করছি।
ওয়াকফ সম্পত্তির অবৈধ উচ্ছেদ ও উদ্ধার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ১১টি ওয়াকফ এস্টেটের ২৮.২০ একর সম্পত্তি উদ্ধার করা হয়েছে;
হজ ব্যবস্থাপনা অধিকতর সাশ্রয়ী, সহজ ও সাবলীল করতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে;
আগামীতে ইমাম ও মুয়াজ্জিনকে প্রশিক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধির কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে।
সপ্তম অধ্যায়: রাজস্ব খাত সংক্রান্ত প্রস্তাবনা
বাজেটের আকার ও জিডিপির প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়, যার সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৮৬ শতাংশ আহরণ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। বিভিন্ন বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার মধ্যেও আমাদের রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। রাজস্ব আহরণ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রধান উদ্দেশ্য হলেও দেশে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসার ক্ষেত্র বৃদ্ধি, দেশীয় শিল্পের বিকাশ ও প্রতিরক্ষণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্টকরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভূমিকা অগ্রগণ্য।
সরকারের লক্ষ্য মধ্যমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ করা এবং দীর্ঘমেয়াদে ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ১৫ শতাংশে উন্নীত করা। এজন্য প্রয়োজন একটি ন্যায্য, প্রযুক্তিনির্ভর, সর্বজনীন ও পূর্বানুমানযোগ্য (Predictable) রাজস্ব কাঠামো, যা ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করবে এবং বিনিয়োগ-উৎপাদন-কর্মসংস্থান-ভোগ-কর চক্রকে (Investment-Production-Employment-Consumption-Tax Cycle) আরও গতিশীল করবে।
আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থার মূল চ্যালেঞ্জসমূহ হলো; নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত, কর অব্যাহতির বিস্তৃত সংস্কৃতি, ক্ষুদ্র করভিত্তি, কর ফাঁকি ও ডিজিটালাইজেশনের ঘাটতি। এই চ্যালেঞ্জসমূহ বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, কর অব্যাহতি ধীরে ধীরে হ্রাস করা এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় End-to-End Automation এর মাধ্যমে কর প্রদান পদ্ধতি সহজীকরণসহ ব্যবসাবান্ধব নীতি সংস্কারের রূপরেখা গ্রহণ করেছি। এই বাজেট সেই দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের ভিত্তি স্থাপন করবে, যা আমাদের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিযোগিতাসক্ষম করে তুলবে।
আয়কর সংক্রান্ত বাজেট প্রস্তাবনা
ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য আগামী ৫ বছরের জন্য প্রগতিশীল করকাঠামোর প্রস্তাব
করদাতাগণ যাতে, ভবিষ্যতে মধ্যমেয়াদে তাদের কী হারে কর পরিশোধ করতে হবে তা সঠিকভাবে পূর্বানুমান (predict) করতে পারে, সে লক্ষ্যে ব্যক্তিকরদাতাদের জন্য আগামী ৫ বছরের আয়কর হার প্রস্তাব করছি।
কর্পোরেট কর
এবারের বাজেটে কর্পোরেট কর পরিপালন ব্যবস্থা সহজ ও ব্যবসাবান্ধব করা, অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল ও কর পরিশোধের ব্যবস্থা করা, অতিরিক্ত নিয়মের বেড়াজাল থেকে করদাতাদের রেহাই দেয়া, ব্যবসার অনুমোদনযোগ্য খরচ বাড়িয়ে এবং উৎসে কর কর্তন না করার কারণে খরচ অগ্রাহ্য করার বিদ্যমান বিধান বিলোপ করার মাধ্যমে করদাতার করযোগ্য আয় কমানো এবং করদায় কমানোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সেই সাথে, অডিটের জন্য কর মামলা নির্বাচন এবং উৎসে কর যাচাই এর জন্য নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও অটোমেটেড করার ওপর জোর দিচ্ছি। নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং বিনিয়োগকারীগণকে মধ্যমেয়াদে একটি নির্দিষ্ট হারে করারোপের নিশ্চয়তা প্রদানের লক্ষ্যে বিদ্যমান কর্পোরেট কর হার আগামী কর বছরে অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করছি। তবে, আগামী দিনগুলোতে করের আওতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ কর আদায় করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে সচেষ্ট থাকব।
আয়করে ছাড় প্রদান
মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও কৃষিপণ্যে কর ছাড়:
সরকার, দেশের প্রতিটি ব্যক্তি ও পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নতির লক্ষ্যে, নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর হ্রাসের একটি বড় জনমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মৌলিক কৃষি ও ভোগ্যপণ্য, যেমন-ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ, ১ শতাংশ হতে হ্রাস করে মাত্র ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করছি। বিগত বছরগুলোতে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবনে যে নাভিশ্বাস উঠেছিল, তার বিপরীতে গণতান্ত্রিক সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই পদক্ষেপ জনজীবনে স্বস্তি আনবে।
সাধারণ জনগণকে স্বস্তি প্রদানের জন্য অন্যান্য যে সকল গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে উৎসে কর হ্রাস করার প্রস্তাব করা হয়েছে তা এ মহান সংসদের নিকট উপস্থাপন করছি-
স্বাস্থ্য খাতে কর ছাড়ের অংশ হিসেবে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর সম্পূর্ণ মওকুফ;
শারীরিকভাবে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের ব্যবহারের জন্য আমদানিকৃত ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয়করের হার ২ শতাংশ হতে ১ শতাংশে হ্রাস;
উৎসে করের উচ্চ হারের কারণে স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের সরবরাহ এখনো অনানুষ্ঠানিক রয়ে গেছে বিধায় সরকার রাজস্ব পাচ্ছে না। এই ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক খাতে এনে সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্যে স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার সরবরাহে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে মাত্র ০.৫ শতাংশে হ্রাস;
পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিতকল্পে ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক এবং ইলেকট্রিক চার্জিং স্টেশন আমদানির ক্ষেত্রে উৎসে কর হার ৫ শতাংশ হতে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার;
কম্পিউটার প্রিন্টার, পোর্টেবল অটোমেটিক ডাটা প্রসেসিং মেশিন, ফ্ল্যাশ মেমোরি এবং কম্পিউটার মনিটর আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর কমিয়ে ২ শতাংশে হ্রাস;
স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ২২টি কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম করের হার ৫ শতাংশ ও ২ শতাংশ হতে ১ শতাংশে হ্রাস;
বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীর কাছে থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ওপর উৎসে কর কর্তনের হার ৪ শতাংশ হতে ৩ শতাংশে হ্রাস;
রিফাইনারি কর্তৃক জ্বালানি তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের হার ১.৫ শতাংশ হতে ১ শতাংশে হ্রাস;
রিসাইকেল্ড পণ্য ও রিসাইক্লিং কাঁচামাল-এ করহার ৩ শতাংশ হতে ১ শতাংশে হ্রাস;
বিটিআরসি কর্তৃক প্রাপ্ত রেভিনিউ শেয়ার, লাইসেন্স ফি বা চার্জ এর ওপর প্রযোজ্য ২০ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহার;
মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা-খাতে উৎসে কর কর্তনের হার ১২ শতাংশ হতে ১০ শতাংশে হ্রাস;
শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে উৎসে অগ্রিম করের সাধারণ হার ৫ শতাংশ হতে ৪ শতাংশে হ্রাস;
বিদেশি বিনিয়োগের স্বার্থে যন্ত্রপাতি ভাড়া বাবদ অনিবাসি (non-resident) করদাতাকে পরিশোধ খাতে উৎসে কর কর্তনের হার ১৫ শতাংশ হতে ৭.৫ শতাংশে হ্রাস;
বিমা খাতে রি-ইন্সুরেন্স প্রিমিয়াম বাবদ খরচ কমানোর স্বার্থে অনিবাসী করদাতাকে পরিশোধিত বীমা প্রিমিয়াম হতে উৎসে কর কর্তনের হার ১০ শতাংশ হতে ৫ শতাংশে হ্রাস;
শিল্পস্থাপনে বিনিয়োগের ব্যয় (Cost of Fund) কমানোর স্বার্থে বিদেশি ঋণের সুদের উপর উৎসে করের হার ২০ শতাংশ হতে ১০ শতাংশে হ্রাস করার প্রস্তাব করছি;
এই পদক্ষেপগুলো ব্যবসার নগদ প্রবাহ বাড়াবে, ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাবে, উৎপাদন ব্যয় কমাবে ফলস্বরূপ শিল্প ও ব্যবসায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে;
উৎসে করকে ন্যূনতম করের পরিবর্তে অগ্রিম কর হিসাবে বিবেচনা করা
এতদিন করযোগ্য আয় কম থাকা সত্ত্বেও উৎসে কর্তিত কর বাধ্যতামূলক ন্যূনতম কর হিসেবে বিবেচনা করা হত যা ব্যবসায় পুঁজির সংকট তৈরি করত। সরকার এই বিধান বাতিল করে উৎসে করকে, অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করার আন্তর্জাতিক বিধান চালু করছে। এছাড়াও, অতিরিক্ত পরিশোধিত উৎসে কর ফেরত প্রদান করা হবে। এর মাধ্যমে কর ব্যবস্থার ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে।
একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের করনীতি শুধু রাজস্ব সংগ্রহের হাতিয়ার হিসেবে নয়; খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সুরক্ষার জন্যও ব্যবহৃত হতে হবে।
খাদ্য নিরাপত্তা
দেশে ভোজ্যতেলের সরবরাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে, দেশিয় তৈলবীজ ব্যবহার করে ভোজ্য তেল উৎপাদন ব্যবসার করহার প্রথম ৫ বছরের জন্য সম্পূর্ণ অব্যাহতি এবং পরবর্তী ৩ বছর ৫০% এবং পরবর্তী ২ বছর ২৫% অব্যাহতি দিয়ে ১০ বছরের জন্য সুবিধা প্রদান করার প্রস্তাব করছি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি:
পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী ও টেকসই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে উৎসাহ প্রদানের জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ খাতে শূন্য শতাংশ কর হার প্রস্তাব করছি। একই সাথে সৌরবিদ্যুৎ বিলের উপর ব্যবহারকারীদের (Consumer) সৌরবিদ্যুৎ বিল পরিশোধের বিপরীতে ৫ শতাংশ কর রেয়াত সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করছি।
সকল ধরনের ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ইভি) বিআরটিএ তে রেজিস্ট্রেশন ও নবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অগ্রিম আয়করের পরিমাণ ২ লাখ টাকা হতে কমিয়ে ইলেকট্রিক গাড়ির ২০০, ৩০০, ৪০০ এবং ৪০০ KW এর বেশি ক্যাপাসিটির ভিত্তিতে যথাক্রমে ২৫ হাজার, ৫০ হাজার, ৭৫ হাজার এবং ১ লাখ টাকা নির্ধারণ করার প্রস্তাব করছি;
এই বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কর্মসংস্থান। আমরা করনীতিকে এমনভাবে সাজাতে চাই, যাতে নতুন ব্যবসা, নতুন ধারণা এবং নতুন প্রজন্ম এগিয়ে আসতে পারে।
তরুণ, নারী, প্রতিবন্ধী ও উদ্ভাবনী উদ্যোক্তাদের বিশেষ সহায়তা প্রদানের জন্য-
বর্তমানে শুধু IT ফ্রিল্যান্সিং এর ওপর কর অব্যাহতি আছে। এই কর অব্যাহতি সুবিধা অন্যান্য সকল প্রকার ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ক্ষেত্রে সম্প্রসারণ করার প্রস্তাব করছি। এর ফলে ফ্রিল্যান্সাররা তাদের আয় বৈধপথে ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনতে উৎসাহিত হবেন।
তরুণদের উদ্ভাবনী কাজে উৎসাহ যোগাতে সকল ধরনের কন্টেন্ট ক্রিয়েশন হতে আয়কে করমুক্ত করার প্রস্তাব করছি;
তারুণ্যকে প্রাধান্য দিয়ে স্টার্টআপ, উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার ক্ষেত্রে টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করছি;
এসএমই উদ্যোক্তাদের ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার এবং নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার হতে অর্জিত আয় করমুক্ত করার প্রস্তাব করছি;
ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাইরে যেকোনো উৎপাদনমুখী শিল্প, পর্যটন বা ক্রীড়াক্ষেত্রের স্থাপনা ও যন্ত্রপাতির বিনিয়োগের ওপর প্রথম বছরে ৬০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় বছরে ৪০ শতাংশ হারে ত্বরান্বিত অবচয় (accelerated depreciation) সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করছি;
করদাতাদের দাতব্য ও জনকল্যাণমূলক কাজে দান করাকে উৎসাহ প্রদান করতে কর রেয়াত প্রদানের অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য, প্রতিবন্ধী সেবা, ক্যান্সার, অটিজম, ডায়াবেটিস, থ্যালাসেমিয়া ও সামাজিক কল্যাণে নিয়োজিত ১১টি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের তালিকা অনুমোদনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
আমাদের লক্ষ্য করের হার বৃদ্ধি নয় বরং করের ভিত্তি সম্প্রসারণ। এই উদ্দেশ্যে কয়েকটি বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
করভিত্তি সম্প্রসারণের জন্য খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের ওপর ০.২০ শতাংশ অগ্রিম কর সংগ্রহের প্রস্তাব করছি। খুচরা বিক্রেতাদের নিকট থেকে সংগৃহীত এ অগ্রিম করের পরিমাণ হবে অতি নগণ্য, প্রতি ১ হাজার টাকায় মাত্র ২ টাকা। তাছাড়া, অগ্রিম সংগৃহীত এ আয়কর করদাতার প্রদেয় করের সাথে সমন্বয় হবে;
স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট, নো-ফ্রিলস অ্যাকাউন্ট (No- Frills Account) ও বোর্ড কর্তৃক গেজেট দ্বারা টিআইএন গ্রহণের বাধ্যবাধকতা হতে অব্যাহতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি ব্যতীত, অন্য যেকোনো ব্যক্তি, ব্যাংক হিসাব খোলার সময় টিআইএন সনদ দাখিল করার বিধানের প্রস্তাব করছি;
সেন্ট্রাল ডাটা ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে এনবিআর এর তথ্যভান্ডারকে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক, ইউটিলিটি সেবা, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত করে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।
সেরা করদাতা সম্মাননা পুরস্কার প্রদান
করদাতাদের যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে সামাজিকভাবে সম্মানিত করা এবং সকলকে কর প্রদানে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ‘সেরা করদাতা পুরস্কার নীতিমালা, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই নীতিমালার ভিত্তিতে খাতভিত্তিক সর্বোচ্চ ২২টি সহ মোট ৬৭ জন করদাতাকে সেরা করদাতার পুরস্কার প্রদান করা হবে।
আমদানি-রপ্তানি শুল্ক-কর
টেকসই প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনসাধারণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আমদানি-রপ্তানি শুল্ক-কর বিষয়ে প্রণীত প্রস্তাবসমূহ আমি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করছি।
খাতভিত্তিক প্রস্তাবনা
(ক) বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি খাত
১) বাণিজ্য প্রসার ও বিনিয়োগ আকর্ষণে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠা
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রসারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ন্যায় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (Free Trade Zone) স্থাপনের সুবিধার্থে কাস্টমস আইনে একটি নতুন অধ্যায়সহ কতিপয় বিধান সংযোজনের প্রস্তাব করছি।
মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের অভ্যন্তরে রপ্তানির উদ্দেশ্যে পণ্য শুল্ককর ব্যতিরেকে আমদানি করে তা সংরক্ষণ, গ্রেডিং, প্যাকিং, উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করা সম্ভব হবে।
২) অফডক ও আইসিডি খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিমালা সংশোধন
বাণিজ্য সহজীকরণের লক্ষ্যে বেসরকারি অফডক ও আইসিডি পরিচালনার জন্য বিদ্যমান নীতিমালায় বিদেশি মালিকানাধীন শেয়ারের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ থাকার বিধান বিলোপ করার প্রস্তাব করছি।
৩) লজিস্টিকস সেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে এয়ারকার্গো অপারেটর স্টেশন স্থাপন সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়ন
বিশ্বের স্বনামধন্য লজিস্টিকস কোম্পানি এবং দেশিয় বেসরকারি খাতকে এয়ারকার্গো ক্লিয়ারেন্স সংক্রান্ত কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে এয়ারকার্গো অপারেটরস স্টেশন স্থাপন সংক্রান্ত নতুন একটি বিধিমালা জারির প্রস্তাব করছি। এটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যায়ক্রমে পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিক হাবে উন্নীত হবে এবং ই-কমার্স খাতের ব্যাপক প্রসার ঘটবে।
৪) বেসরকারি বন্দর এবং টার্মিনাল অপারেটর বিষয়ক বিধিমালা প্রণয়ন
দেশের বন্দর সেবার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা এবং এক্ষেত্রে Greenfield Investment আকর্ষণের লক্ষ্যে বেসরকারি বন্দর এবং টার্মিনাল অপারেটর সংক্রান্ত একটি বিধিমালা জারির প্রস্তাব করছি।
৫) দেশে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী শিল্পের বিকাশে রেয়াতি সুবিধা প্রদান
নবায়নযোগ্য ও টেকসই জ্বালানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নিরাপদ উৎস সৌর বিদ্যুৎখাতের প্রসারে এই খাত সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ উপকরণসমূহ আমদানিতে প্রযোজ্য
আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং আগাম কর শূন্য শতাংশ করে একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করার প্রস্তাব করছি।
এই খাতের ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের স্বার্থে এই প্রজ্ঞাপনটি ৩০ জুন, ২০৩১ পর্যন্ত বলবৎ রাখার প্রস্তাব করছি।
তবে দেশে এই খাত সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদনকে উৎসাহ দিতে এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশে মাউন্টিং স্ট্রাকচার, লিথিয়াম সেল, ব্যাটারি প্যাক, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম ইত্যাদি পণ্যসমূহের রেয়াতি সুবিধা ৩০ জুন, ২০২৮ খ্রিস্টাব্দের পর প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করছি।
৬) দেশে ইলেকট্রিক গাড়ি (EV) উৎপাদনকারী শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে শুল্ক-কর অব্যাহতি প্রদান
জীবাশ্ম জ্বালানি (Fossil Fuel) নির্ভর পরিবহনের বিকল্প হিসেবে দেশে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ি (EV) উৎপাদনে এবং ইলেকট্রিক গাড়ির যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের লক্ষ্যে শুল্ককর রেয়াতি সুবিধা প্রদান করে একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করছি।
যেসকল প্রতিষ্ঠান চার চাকা (Four-wheeler) ও তিন চাকার (Three-wheeler) বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের বডি তৈরি, ওয়েল্ডিং, পেইন্টিং এবং অ্যাসেম্বলিং সম্পন্ন করার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে উচ্চ মূল্য সংযোজন করবে, তাদের ক্ষেত্রে উপকরণ ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে ৩ শতাংশ আমদানি শুল্ক ব্যতীত সকল প্রকার শুল্ক-কর মওকুফের প্রস্তাব করছি।
অন্যদিকে, যেসকল প্রতিষ্ঠান পার্টস সংযোজন ও পেইন্টিং কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে কিছুটা কম মূল্য সংযোজন করবে, তাদের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক ব্যতীত অন্যান্য সকল প্রকার শুল্ক-কর মওকুফের প্রস্তাব করছি।
একইসাথে, স্থানীয় ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক উৎপাদনকারী শিল্পের উপকরণ ও কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশের অতিরিক্ত ভ্যাট এবং অন্য সকল প্রকার শুল্ক-করাদি হতে সম্পূর্ণ অব্যাহতি প্রদানপূর্বক একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করছি।
উপরোক্ত সকল রেয়াতি সুবিধা আগামী ৩০ জুন, ২০৩১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব করছি।
৭) ই-বাইক উৎপাদনকারী শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণে রেয়াতি সুবিধা বৃদ্ধি
দেশিয় ই-বাইক (Electric-Bike) উৎপাদনকারী ও সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে পার্টস ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনে নিয়োজিত ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানকেও উপকরণ আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করছি।
৮) কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদনে শুল্ককর রেয়াতি সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে বহাল রাখা
আমদানি-নির্ভর প্রযুক্তি পণ্য যেমন- মোবাইল ফোন, রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার, এয়ার কন্ডিশনার (এসি), ওয়াশিং মেশিন, এটিএম (ATM) ও সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরা স্থানীয়ভাবে উৎপাদনপূর্বক সাশ্রয়ী মূল্যে সাধারণ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা এবং এখাতে রপ্তানি উৎসাহিতকরণের লক্ষ্যে এ সকল পণ্য উৎপাদনের
কাঁচামাল ও উপকরণ আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক ও কর অব্যাহতি সুবিধা আগামী ৩০ জুন ২০৩০ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব করছি।
৯) কম্পিউটার ও ডিজিটাল পণ্য উৎপাদন শিল্পে রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত নতুন প্রজ্ঞাপন জারি
কম্পিউটার ও ডিজিটাল ডিভাইস খাতের দেশীয় বিকাশকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে কম্পিউটার (Computer), কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদনের জন্য উপকরণ আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক ও কর অব্যাহতি সুবিধা আগামী ৩০ জুন ২০৩০ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব করছি।
১০) দেশে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি রেয়াতি সুবিধা প্রবর্তন
স্থানীয়ভাবে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ ডিজাইন, টেস্টিং ও প্যাকেজিং খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এই শিল্পে ব্যবহৃত উপকরণ আমদানিতে ১ শতাংশের অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক, সমুদয় রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর ও আগাম কর আগামী ৩০ জুন, ২০৩১ পর্যন্ত অব্যাহতি প্রদান করে একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করার প্রস্তাব করছি।
১১) স্মার্টকার্ড ও ব্যাংক কার্ড উৎপাদন শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ১০টি কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান
সরকারের কল্যাণমুখী নাগরিক সুবিধাসমূহ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ডের মতো ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হচ্ছে।
এই বিশাল চাহিদাকে সামনে রেখে সব ধরনের স্মার্ট কার্ড ও ব্যাংকিং ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড উৎপাদনে অত্যাবশ্যক ১০টি কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশের অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব করছি।
১২) জাহাজ ও ড্রেজার শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে এই খাতের রেয়াতি সুবিধা অব্যাহত রাখা
জাহাজ ও ড্রেজার শিল্পের বিকাশ ও বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে জাহাজ ও ড্রেজার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি শুল্ক সুবিধা আগামী ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব করছি।
১৩) পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি উৎপাদনকারী শিল্পে রেয়াতি সুবিধা প্রদান করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি
দেশে পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম-আয়ন (Lithium-ion) ব্যাটারির পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব সোডিয়াম আয়ন ব্যাটারি (Sodium-ion Battery) এবং লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি প্যাক (Battery Pack) উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে আগামী ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত এসকল পণ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ও কর অব্যাহতির সুবিধা প্রদান করে একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করছি।
(খ) ভোগ্য পণ্য
১) শিশুখাদ্য প্রস্তুতের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাস
আমদানিকৃত শিশু খাদ্য প্রস্তুতমূলক সামগ্রীর (Preparation for Infant or young children) ওপর শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ হতে হ্রাস করে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করছি। ফলে দেশের বাজারে শিশুখাদ্যের দাম হ্রাস পেয়ে সাধারণ মানুষের নিকট আরও সুলভ ও সহজলভ্য হবে।
২) সকল মসলা আমদানিতে রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার
জনসাধারণের প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকায় এবং দৈনন্দিন রান্নায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের মসলা ব্যবহার করা হয়। এ বিবেচনায় সকল প্রকার মসলার ওপর ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করছি।
৩) খেজুর আমদানিতে রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার
খেজুর আমদানিতে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করছি।
(গ) কৃষিখাত
১) কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনের ৩৬টি কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট প্রত্যাহার
দেশে স্থানীয়ভাবে কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনকে উৎসাহ দিতে কীটনাশক উৎপাদনে রেয়াতি সুবিধা প্রদান সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে ৩৬টি কাঁচামাল আমদানিতে মূল্য সংযোজন কর পুরোপুরি মওকুফ করে শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
২) সার উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান
স্থানীয়ভাবে জিংক সালফেট সার উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং দেশীয় শিল্পকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে এর মূল কাঁচামাল জিংক অ্যাশ (Zinc Ash) আমদানিতে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ মওকুফ করে শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
৩) ভেটেরিনারি মেডিসিন আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা বিস্তৃতকরণ
বিভিন্ন ভেটেরিনারি মেডিসিন (Veterinary Medicine) আমদানির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পণ্যের পরিবর্তে তার জেনেরিক ক্যাটেগরির পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শূন্য শতাংশ হারে রেয়াতি সুবিধা প্রদান করার প্রস্তাব করছি।
৪) কাজুবাদাম চাষকে উৎসাহ দিতে আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধি ও সংশ্লিষ্ট শিল্পকে প্রতিরক্ষণ প্রদান
দেশিয় চাষ ও উৎপাদনকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে অপ্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম (Cashew Nuts in Shell) এবং প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের (Cashew Nuts Shelled) আমদানি শুল্ক যথাক্রমে ১ শতাংশ ও ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করছি। তবে দেশে উৎপাদকগণ কর্তৃক অপ্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
৫) দেশিয় শিল্পের প্রসারে পাঙ্গাস মাছের ফিলেট আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক আরোপ
দেশিয় মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের উপযুক্ত বাজার প্রতিরক্ষণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমদানিকৃত পাঙাশ মাছের ফিলেটের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করছি।
৬) পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাদ্য উৎপাদনকারী শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান
পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাদ্য (Poultry, Dairy and Fish Feed) উৎপাদনকারী শিল্পের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ও সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনে তিনটি কাঁচামাল নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করে শূন্য শতাংশ হারে রেয়াতি সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করছি।
৭) পোল্ট্রি খাতের যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান
পোল্ট্রি ও ডেইরি শিল্পের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী দেশীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ কর্তৃক এই খাতের কতিপয় উপকরণ আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করে আমদানি শুল্ক শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
(ঘ) স্বাস্থ্যখাত
১) চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান
দেশে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ (Medical equipments) উৎপাদনকারী শিল্পের বিকাশের স্বার্থে এই শিল্পের অতি প্রয়োজনীয় কতিপয় কাঁচামাল আমদানিতে ১৫ শতাংশ এবং অন্যকিছু কাঁচামাল আমদানিতে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক নির্ধারণ করার এবং এই সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনের মেয়াদ আগামী ৩০ জুন, ২০৩০ পর্যন্ত বলবৎ রাখার প্রস্তাব করছি।
২) কিডনি রোগীদের ব্যবহার্য ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে শুল্ককর অব্যাহতি
দেশের বিপুল সংখ্যক কিডনি রোগে আক্রান্ত মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং ডায়ালাইসিস প্রক্রিয়া সচল রাখতে ডায়ালাইসিস ফিল্টার (Dialysis Filter) একটি সংবেদনশীল ও অপরিহার্য চিকিৎসা সামগ্রী।
বর্তমানে এই চিকিৎসা উপকরণটি আমদানির ক্ষেত্রে উচ্চ করভার থাকায় গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসাক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। তাই, ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে আরোপিত বিদ্যমান ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করছি।
এর ফলে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক সুবিধার কারণে কিডনি রোগীর প্রতিটি ডায়ালাইসিস বাবদ ব্যয় প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত হ্রাস পাবে।
৩) মৃতদেহ সংরক্ষণে ব্যবহৃত মর্চুয়ারির আমদানি শুল্ক হ্রাস
মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য মর্চুয়ারি (Mortuary) আমদানিতে বিদ্যমান ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক হ্রাস করে ১ শতাংশ নির্ধারণ করার প্রস্তাব করছি।
(ঙ) ওষুধ খাত
১) ক্যান্সারের ওষুধ তৈরির নতুন ৯টি কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান
দেশিয় ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পকে স্থানীয়ভাবে আন্তর্জাতিক মানের ও সাশ্রয়ী মূল্যের ক্যান্সার প্রতিরোধী ওষুধ উৎপাদনে সক্ষম ও স্বাবলম্বী করে তুলতে বিদ্যমান
রেয়াতি শুল্ক সুবিধার প্রজ্ঞাপনে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে নতুন করে আরও ৯টি উপকরণ যুক্ত করে আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
২) Active Pharmaceutical Ingredient (API) তৈরির নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার
ওষুধ শিল্পের অধিকতর প্রসারকল্পে স্থানীয়ভাবে এপিআই উৎপাদনের লক্ষ্যে এপিআই তৈরির নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
৩) ওষুধ শিল্পের নতুন ১৭টি কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ওষুধের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে নতুন করে আরও ১৭টি মৌলিক কাঁচামাল অন্তর্ভুক্ত করে আমদানি শুল্ক শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
(চ) জনস্বাস্থ্য খাত
১) সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান
ঢাকা ও বিভাগীয় শহরসমূহসহ শিল্প-কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং ‘সার্কুলার ফিউচার মডেল’ বাস্তবায়নে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট আমদানিতে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ হতে হ্রাস করে ১ শতাংশ নির্ধারণ করার প্রস্তাব করছি।
২) তামাকজাত পণ্যের আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক আরোপ
জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর নিকোটিন গ্র্যানুলস (Nicotine granules) এবং নিকোটিন পাউচ (Nicotine Pouches) আমদানি নিরুৎসাহিত করার জন্য নতুন কোড সৃজনপূর্বক ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করছি।
(ঝ) বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন জনগোষ্ঠীর সহায়ক উপকরণ আমদানিতে শুল্ক রেয়াত সংক্রান্ত প্রস্তাবনা
বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের স্বাধীন চলাচলের জন্য সহায়ক ২১ ধরনের Special Assistive Device আমদানিতে সমুদয় আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং আগাম কর সম্পূর্ণ অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব করছি। এই কর রেয়াত সুবিধা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের Mobility বাড়বে, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হবে এবং পরিবার ও সমাজের ওপর করের বোঝা লাঘব করবে।
(ছ) পরিবহন খাত
১) ইলেকট্রিক গাড়ি (EV) জনপ্রিয় করতে শুল্ক ছাড়
পরিবেশ দূষণ রোধ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক ইতোমধ্যে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় অথবা অনুরূপ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে বিদ্যমান সমুদয় শুল্ক-কর এবং অন্যান্য ইলেকট্রিক বাস-ট্রাকের ক্ষেত্রে ভ্যাট ব্যতীত সমুদয় শুল্ক-কর অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। এই সুবিধা আগামী ৩০ জুন, ২০৩০ পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব করছি।
পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ি (EV) আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান মোট করভার ৯৩ শতাংশ থেকে হ্রাস করে ২৫,০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইলেকট্রিক গাড়ি ক্ষেত্রে ৬৪ শতাংশ এবং ৫০০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত গাড়ির ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।
২) প্লাগ-ইন হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (PHEV) আমদানিতে শুল্ক হ্রাস
একই ভাবে, নতুন প্লাগ-ইন হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (PHEV)-এর ক্ষেত্রে ২০০০ সিসি পর্যন্ত ইঞ্জিন ক্ষমতা সম্পন্ন গাড়ি আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক গাড়ির ধরণভেদে হ্রাস করার এবং ১৮০০ সিসি পর্যন্ত নতুন গাড়ি আমদানিতে রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করছি।
এর ফলে ১৮০০ সিসি পর্যন্ত ব্র্যান্ড নিউ প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি আমদানিতে মোট করভার ৯৩.১৬ শতাংশ হতে হ্রাস হয়ে ৭৩.৪৩৭ শতাংশ হবে এবং ২০০০ সিসি পর্যন্ত ব্র্যান্ড নিউ প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি আমদানিতে মোট করভার ১৩২.৩৬ শতাংশ হতে হ্রাস পেয়ে ৯৬.১০ শতাংশ হবে।
৩) ইলেকট্রিক গাড়ির চার্জার ও চার্জিং স্টেশন আমদানিতে সকল প্রকার শুল্ককর প্রত্যাহার
ইলেকট্রিক গাড়ির (EV) নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে সবচেয়ে জরুরি দেশব্যাপী বিস্তৃত চার্জিং নেটওয়ার্ক। এ লক্ষ্যে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ির চার্জার এবং চার্জিং স্টেশন (Electric Vehicle Charger or Charging Station) এর জন্য আমদানি পর্যায়ে মোট করভার ৩৯.৭৫ শতাংশ হতে হ্রাস করে শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
৪) জীবাশ্ম জ্বালানি (Fossil Fuel) চালিত গাড়ি আমদানি নিরুৎসাহিত করতে শুল্ককর বৃদ্ধি
পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ডিজেল, অকটেন বা পেট্রোল চালিত গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতা কমিয়ে আনতে এবং পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক যান (EV) ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহিত করতে মধ্যম সারির ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসি ক্ষমতার ইন্টারনাল কম্বাশন (IC) ইঞ্জিনবিশিষ্ট আমদানিকৃত গাড়ির ওপর বিদ্যমান সামগ্রিক করভার ১৩২.৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৫.৮৮ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।
তবে অন্যান্য গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান করভার অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করছি।
(জ) তথ্য-প্রযুক্তি খাত
১) তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশে কম্পিউটার সামগ্রীর আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ককর বিশেষভাবে হ্রাস করা
প্রযুক্তি খাতে উন্নত বাংলাদেশ এবং আইটি খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ল্যাপটপ, ডেক্সটপ কম্পিউটার, সার্ভার, কম্পিউটার প্রিন্টার ও কম্পিউটার মনিটর আমদানির ক্ষেত্রে সমুদয় আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করছি এবং এসএসডি (SSD) আমদানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক ব্যতীত সমুদয় রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করছি।
২) পয়েন্ট অব সেলস মেশিন
সরকারের ক্যাশলেস লেনদেন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার উদ্যোগ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে আধুনিক ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অনুষঙ্গ পয়েন্ট অব সেলস (Point of Sales) মেশিন আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ এবং ৭.৫ শতাংশ আগাম কর শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
(ঝ) ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি
দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের মেধা ও মননকে কাজে লাগিয়ে একটি বৈশ্বিক মানের 'ক্রিয়েটিভ ইকোনমি' গড়ে তোলার লক্ষ্যে এবং উচ্চমানের কন্টেন্ট ও চলচ্চিত্র নির্মাণ সামগ্রী যেন তরুণদের নাগালের মধ্যে থাকে, সেজন্য বাজেটে কতিপয় পণ্যে শুল্ক করাডি কমানোর প্রস্তাব করছি।
ডিজিটাল মিডিয়ায় ব্যবহৃত সঙ্গীতের মানোন্নয়ন ও ক্রিয়েটিভ মিউজিক তৈরিতে সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট—যেমন গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিন ইত্যাদি এবং এদের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করছি।
এছাড়াও, চলচ্চিত্র ও ক্রিয়েটিভ মিডিয়ার কারিগরি দিক আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করার উদ্দেশ্যে উচ্চপ্রযুক্তির সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা (Cinematographic Camera) এবং সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা ও প্রজেক্টরের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ হতে হ্রাস করে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
(ঞ) শিল্পখাত
স্থানীয় শিল্পের বিকাশ ও প্রতিরক্ষণের লক্ষ্যে নিম্নরূপ প্রস্তাব করছি:
ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক ওভেন ও মাইক্রোওয়েভ ওভেন প্রস্তুতকারী শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ফ্লোট গ্লাস (Float Glass) আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৪৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করছি।
এলপিজি সিলিন্ডার, অটো ট্যাংক, এবং ভাল্ব ও বাঙ্ক (Valve & Bung) উৎপাদনকারী শিল্পের উপকরণ ও কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি ও শুল্ক অব্যাহতি সুবিধা আগামী ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব করছি।
দেশে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধকল্পে সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিক্স (Synthetic Woven Fabrics) আমদানিতে বিদ্যমান ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।
স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা জিপসাম বোর্ড ও শিট উৎপাদনকারী শিল্পকে প্রতিরক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যে জিপসাম বোর্ড ও শিট আমদানির ওপর ২০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাব করছি।
পিভিসি রেজিন (PVC Resin) এবং পেট রেজিন (PET Resin) উৎপাদনকারী শিল্পকে যথাযথ প্রতিরক্ষণ প্রদানে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ হতে বৃদ্ধি করে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করার প্রস্তাব করছি।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশ ফ্রি হুইল (Free Wheel) আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার এবং একই সাথে নতুন করে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাব করছি।
স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা ১ কেভিএ পর্যন্ত ক্ষমতা সম্পন্ন ট্রান্সফরমার শিল্পকে শক্তিশালী শুল্ক প্রতিরক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যে উক্ত ক্ষমতার ট্রান্সফরমার আমদানিতে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার এবং একই সাথে নতুন করে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাব করছি।
স্থানীয় ওয়াশিং মেশিন উৎপাদনকারী শিল্পের উপযুক্ত প্রতিরক্ষণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সকল প্রকার হাউসহোল্ড টাইপ ওয়াশিং মেশিন আমদানিতে নতুন করে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাব করছি।
কাগজ শিল্পের স্থানীয় উৎপাদকদের প্রতিরক্ষণের লক্ষ্যে গ্রিজ প্রুফ পেপার (Greaseproof Paper) ও গ্লাসিন পেপার (Glassine Paper) আমদানির ওপর বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার এবং একই সাথে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করছি।
রি-ফ্র্যাক্টরি সিমেন্ট (Refractory Cement) শিল্পের সুরক্ষায় এর প্রধান কাঁচামাল বল ক্লে (Ball Clay)-সহ ৫টি কাঁচামাল আমদানিতে আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশে কমিয়ে আনার প্রস্তাব করছি।
স্থানীয় মেইজ স্টার্চ (Maize Starch) শিল্পের উপযুক্ত বাজার প্রতিরক্ষণ নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনা করে এই পণ্যটির আমদানি শুল্ক বিদ্যমান ১৫ শতাংশ হতে বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।
দেশিয় ডিটারজেন্ট উৎপাদনকারী শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল লিনিয়ার অ্যালকাইল বেনজিন (Linear Alkyl Benzene) আমদানির ক্ষেত্রে মাত্র ১ শতাংশ আমদানি শুল্ক ধার্য করার প্রস্তাব করছি।
স্থানীয় কোল্ড-রোল্ড এবং কোটেড কয়েল ও শিট (Cold-Rolled and Coated Coil and Sheet) উৎপাদনকারী শিল্পের প্রতিরক্ষণে কোল্ড-রোল্ড কয়েল ও শিট আমদানিতে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করছি।
কপার তার ও টিউব উৎপাদনকারী শিল্পের প্রতিরক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যে কপারের তার আমদানিতে ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করছি এবং কপার টিউব আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।
দেশিয় ফ্লোট গ্লাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় ৫টি কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণপূর্বক রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করছি।
দেশিয় মোটর উৎপাদনকারী শিল্পকে প্রতিরক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যে ১২০০ ওয়াটের নিম্ন ক্ষমতাসম্পন্ন ডিসি মোটর আমদানিতে ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাব করছি।
স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা টায়ার-টিউব উৎপাদনকারী শিল্প খাতকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে উক্ত শিল্পের ২টি কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করছি।
স্থানীয় স্কিন কেয়ার ও বিউটি প্রোডাক্টস উৎপাদনকারীদের উৎসাহ প্রদানের জন্য এই শিল্পের ২টি কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক হ্রাস করে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করার প্রস্তাব করছি।
স্থানীয় কফি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশের লক্ষ্যে কাঁচামাল হিসেবে কফি এক্সট্র্যাক্ট, এসেন্স ও প্রিপারেশন বাল্কে আমদানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করছি।
আমদানি বিকল্প পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার উৎপাদন শিল্পকে প্রতিরক্ষণ প্রদানের উদ্দেশ্যে পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার (Polyester Staple Fibre) পণ্যটিতে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করছি।
প্রজ্ঞাপন সংশ্লিষ্ট কতিপয় প্রস্তাবনা
১) শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ককর রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত নতুন প্রজ্ঞাপন জারি
দেশের সামগ্রিক শিল্প খাতের বহুমুখী সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে স্থানীয় শিল্পের বিকাশের লক্ষ্যে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত নতুন প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করছি।
২) সেবা খাতকে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে আগাম কর অব্যাহতি সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে অন্তর্ভুক্তকরণ
জনকল্যাণমূলক সেবা খাত যেমন হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জনগুরুত্ব বিবেচনায় উৎপাদনকারী শিল্পের ন্যায় সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও মূলধনী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে আগাম কর অব্যাহতি সুবিধা প্রদান করার প্রস্তাব করছি। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার খরচ কমবে।
৩) ইটিপি পরিচালনার জন্য উপকরণ আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের মেয়াদ বৃদ্ধি
ইটিপি (Effluent Treatment Plant) পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক অব্যাহতি সুবিধা আগামী ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব করছি।
৪) বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃক কয়লা আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের মেয়াদ বৃদ্ধি
দেশের বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুতের দাম সহনশীল রাখার লক্ষ্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃক কয়লা আমদানিতে শুল্ককর রেয়াতি সুবিধা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের মেয়াদ ৩০ জুন, ২০৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব করছি।
মূল্য সংযোজন কর সংক্রান্ত প্রস্তাবনা
বিনিয়োগ-বান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থা গঠনের লক্ষ্যে মূল্য সংযোজন কর খাতে নিম্নরূপ প্রস্তাবসমূহ মহান জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করছি:
ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীদের টার্নওভার কর প্রদানের সহজ বিধান:
ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে সমগ্র দেশে এলাকা ও মার্কেটভিত্তিক ব্যবসার ধরণ ও আর্থিক সক্ষমতাকে বিবেচনায় রেখে Flat Rate এ সীমিত পরিমাণে সুনির্দিষ্ট টার্নওভার কর প্রদানের বিধান করার প্রস্তাব করছি। এর ফলে হয়রানিমুক্ত ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে কর পরিশোধ সহজ হবে এবং জনগণ স্বপ্রণোদিত হয়ে গর্বিত করদাতা হিসেবে কর প্রদানে এগিয়ে আসবে।
জুয়েলারি খাতে সুনির্দিষ্ট ভ্যাটের বিধান প্রণয়ন
জুয়েলারি সেবার বিপরীতে ৫ শতাংশ ভ্যাটের পরিবর্তে প্রতি ভরি হিসাবে ২,৫০০ টাকা সুনির্দিষ্ট ভ্যাট নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।
ব্যাংক স্থিতির ওপর প্রযোজ্য আবগারি শুল্ক হ্রাস:
বর্তমানে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক স্থিতির ওপর আবগারি শুল্ক (Excise Duty) অব্যাহতি রয়েছে। ক্ষুদ্র আমানতকারীদের স্বস্তি প্রদানের স্বার্থে অব্যাহতির সীমা ৩ (তিন) লক্ষ্য টাকা হতে বৃদ্ধিপূর্বক ৪ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করছি। এছাড়াও, একটি Loan Account এর বিপরীতে শুধুমাত্র একবারই আবগারি শুল্ক কর্তন করার বিধান প্রণয়নের প্রস্তাব করছি।
প্রযুক্তি নির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যকে অব্যাহতি প্রদান
দেশের লাখ লাখ তরুণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সৃজনশীল কন্টেন্ট তৈরি করে আয় করছেন, তারা দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তরুণ প্রজন্মের উদ্যম ও সৃজনশীলতাকে উৎসাহ প্রদান এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের সম্পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি প্রদানের জন্য নিম্নোক্ত প্রস্তাব পেশ করছি:
স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান
স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব করছি। স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সেবা আমদানির ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের স্থান ও স্থাপনা ভাড়া গ্রহণের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণরূপে অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব করছি। উক্ত অব্যাহতির মেয়াদ ৩০ জুন, ২০৩৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।
কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সার
কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সার কর্তৃক প্রদত্ত সেবার উপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণরূপে অব্যাহতি প্রদান করার প্রস্তাব করছি।
SIM এর উপর সুনির্দিষ্ট কর প্রত্যাহার
আইসিটি can কে থ্রাস্ট সেক্টর হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার এ খাতে ট্যাক্স, ভ্যাট ও লাইসেন্সিং নীতিমালা সংস্কারের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে টেলিকম সেক্টরে করের হার প্রায় ৫০% এবং তথ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রে তা প্রায় ২৫%। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এ হার অনেক বেশি। তাই এ খাতের বিকাশে সরকার এ ধরণের ট্যাক্স ক্রমান্বয়ে যৌক্তিক হারে কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশের সাধারণ মানুষের নিকট মোবাইল সেবা আরো সহজলভ্য করার লক্ষ্যে প্রতিটি মোবাইল সিমের উপর আরোপিত ৩০০/-টাকা হারে কর সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহারের প্রস্তাব করছি। ফলশ্রুতিতে আগামী অর্থবছরে মোট ১২০০ কোটি টাকা রাজস্ব হ্রাস হবে।
কৃষি খাতে অব্যাহতি প্রদান
(ক) কৃষি কাজে ব্যবহার্য সকল সারের ব্যবসায়ী পর্যায়ে প্রযোজ্য ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব করছি। এ কার্যে ব্যবহার্য সকল ধরনের কীটনাশকের আমদানি পর্যায়ে প্রযোজ্য ৭.৫ শতাংশ আগাম কর সম্পূর্ণরূপে অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব করছি।
স্বাস্থ্য খাতে অব্যাহতি প্রদান
(ক) বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় Out of Pocket Expenditure বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। জনসাধারণের চিকিৎসা খরচ কমানোর লক্ষ্যে আমদানিকৃত হার্টের রিং বা স্টেন্ট এবং চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্স এর সরবরাহের ক্ষেত্রে জোগানদার পর্যায়ের ১০ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণরূপে অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব করছি। এর ফলে প্রতিটি হার্টের রিং বা স্টেন্ট এর মূল্য প্রায় ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত হ্রাস পাবে। চোখের প্রতিটি ইন্ট্রাওকুলার লেন্স এর মূল্য প্রায় ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত হ্রাস পাবে;
(খ) কিডনি রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার্য Blood Tubing Set for Hemodialysis এর আমদানি পর্যায়ে প্রযোজ্য ৭.৫ শতাংশ আগাম কর সম্পূর্ণরূপে অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব করছি। এর ফলে কিডনী ডায়ালাইসিস এর খরচ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পাবে।
দেশিয় শিল্প বিকাশের গতিশীলতা আনার স্বার্থে নিম্নোক্ত প্রস্তাবনা পেশ করছি:
(ক) মোবাইল ফোন উৎপাদন ও সংযোজনের ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে মূসক অব্যাহতি সুবিধা ৩০ জুন, ২০৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বর্ধিতকরণের প্রস্তাব করছি।
(খ) কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, টোনার, ইত্যাদি, প্রযুক্তি নির্ভর পণ্যের স্থানীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা ৩০ জুন, ২০৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বর্ধিতকরণের প্রস্তাব করছি।
(গ) IC (পেট্রোল) ইঞ্জিনের পাশাপাশি হাইব্রিড গাড়ি, প্লাগইন হাইব্রিড গাড়ি, থ্রি হুইলার ও ফোর হুইলার ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল, ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাকের স্থানীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে ২০৩০ সাল পর্যন্ত মূসক অব্যাহতি সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করছি।
(ঘ) মেট্রোরেল সেবার উপর মূসক অব্যাহতির মেয়াদ ৩০ জুন, ২০২৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বর্ধিতকরণের প্রস্তাব করছি।
ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি
BIN বাধ্যতামূলক: ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যবসায়িক কোন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে মূসক নিবন্ধন গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার জন্য আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনয়নের প্রস্তাব করছি;
রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর তফসিলসমূহে নিম্নোক্ত সংশোধনের প্রস্তাব পেশ করছি:
(ক) বিভিন্ন ধরনের উচ্চ মূল্যের হিমায়িত মাছের আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ মূসক আরোপের প্রস্তাব করছি।
(খ) বৃক্ষ অথবা বৃক্ষের অংশ এবং সুগন্ধ বৃক্ষ নির্যাস এর আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ মূসক আরোপের প্রস্তাব করছি।
(গ) বিভিন্ন ধরনের এম.এস প্রোডাক্ট (রড) এর উৎপাদন পর্যায়ে বিদ্যমান ‘সুনির্দিষ্ট ভ্যাট’ কিছুটা বৃদ্ধির প্রস্তাব করছি।
তামাক করঃ রাজস্ব সম্ভাবনা ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির সর্বোচ্চ সমন্বয়
তামাক ও তামাকজাত পণ্যের ক্ষেত্রে নিম্নরূপ প্রস্তাব করছি:
(ক) সিগারেটের ন্যূনতম খুচরা মূল্য নিম্নস্তরের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ শলাকা ৬২ টাকা, মধ্যম স্তর ৯২ টাকা, উচ্চ স্তর ১৬০ টাকা এবং অতি উচ্চ স্তর ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করছি;
(খ) Nicotine Pouch এবং Heated Tobacco এর উপর নিম্নবর্ণিত হারে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ও সম্পূরক শুল্ক নির্ধারণের প্রস্তাব করছি:
(গ) অবৈধ তামাক পণ্যের বাণিজ্য প্রতিরোধের লক্ষ্যে তামাক পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ নিবিড় মনিটরিং করার জন্যে ‘Track and Trace’ পদ্ধতি প্রণয়নের প্রস্তাব করছি।
অষ্টম অধ্যায়
বিনিয়ন্ত্রণকরণ (Deregulation)-এর মাধ্যমে ব্যবসা সহজীকরণ
আমাদের নির্বাচনি অঙ্গীকারে ব্যবসায় সহায়ক পরিবেশ উন্নয়নে বিনিয়ন্ত্রণকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারি সেবাকে সহজ, দ্রুত, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করা। আমরা বিনিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন খাতভিত্তিক পরিকল্পনা ও কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। সেগুলো আমি এখানে একে একে উপস্থাপন করছি।
বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসা শুরু সহজীকরণের উদ্যোগ
বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসা শুরু সহজ করতে আমরা কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছি, যেমন-
ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার সময়, ব্যয় ও অনিশ্চয়তা কমাতে অনুমোদন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে অনলাইনভিত্তিক Single Window ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আবেদন দাখিল হতে শুরু করে লাইসেন্স প্রদানের সকল প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ৭ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে।
প্রতিটি অনুমোদনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থা মতামত, নাদাবি, অনাপত্তি বা ছাড়পত্র না দিলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সম্মতি আছে ধরে নিয়ে আবেদন নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কোম্পানি নিবন্ধন সেবার ক্ষেত্রে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিবন্ধন সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ জনবলের ওয়ার্ক পারমিট ৭ দিনের মধ্যে এবং বিনিয়োগকারী ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভিসা ১০ দিনের মধ্যে প্রদানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
বিনিয়োগকারীর আইনি সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক আস্থা বাড়াতে দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি সম্প্রসারণ এবং দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি হালনাগাদ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে।
নির্বাচিত শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে Plug and Play শিল্প-সুবিধা প্যাকেজ চালু করা হবে, যাতে দ্রুত কারখানা স্থাপন ও উৎপাদন শুরু করা যায়।
বিদেশি কর্মীর নিরাপত্তা ছাড়পত্রের আবেদন ও যাচাই প্রক্রিয়া পৃথকভাবে অনলাইনভিত্তিক ও নির্দিষ্ট সময়সীমার আওতায় আনা হবে।
ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্যে আমরা আয়কর, কাস্টমস ও ভ্যাট ব্যবস্থা সংস্কারে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করছি, যেমন-
আয়কর সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়ন্ত্রণ
ব্যক্তি করদাতাদের পাশাপাশি আগামী অর্থবছরে কোম্পানি করদাতাদের কর্পোরেট রিটার্ন অনলাইনে দাখিলের ব্যবস্থা করা হবে;
করদাতারা সারা বছরব্যাপী রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন, বছরের শুরুর দিকে রিটার্ন দাখিল করলে কর প্রণোদনা পাবেন।
করদাতার উৎসে কর নিরূপিত করের চেয়ে বেশি হলে অতিরিক্ত পরিশোধিত কর ফেরত পাবেন; এ রিফান্ড হবে Automated ও Faceless;
আয়কর এবং ভ্যাট অডিটের ক্ষেত্রে Risk Based Selection Criterion এর ভিত্তিতে ব্যক্তি হস্তক্ষেপ ছাড়াই (Without Human Intervention) সম্পূর্ণ অটোমেটেড পদ্ধতিতে নির্বাচন করা হচ্ছে।
দ্বৈত কর পরিহার চুক্তির প্রয়োজনীয় দলিলের ভিত্তিতে National Single Window সিস্টেমের মাধ্যমে অটোমেটেড পদ্ধতিতে অনলাইনে বিদেশী বিনিয়োগকারীগণের Tax Residency সার্টিফিকেট প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।
Asycuda World এবং eReturn সিস্টেমের মধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপন করা হয়েছে।
উৎসে কর কর্তন না করার কারণে করদাতার দাবিকৃত খরচ অনুমোদন না করার বিদ্যমান বিধান বাতিল করার প্রস্তাব করছি;
ব্যবসা খাতের আয় পরিগণনায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে Accrual ভিত্তিতে সুদ ব্যয় অনুমোদনের বিধান করার প্রস্তাব করছি;
করদাতাগণের কর দায় হ্রাসকল্পে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের কতিপয় আবশ্যিক খরচ যেমন, পারকুইজিট, আপ্যায়ন ব্যয়, ফ্রি স্যাম্পল বাবদ খরচ এবং প্রচারণামূলক খরচ অনুমোদনের সীমা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করছি।
কাস্টমস সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়ন্ত্রণ
শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে প্রথম তৈরি পোশাক খাতে কাস্টমস বন্ড প্রথা এবং ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি’র ভিত্তিতে শুল্ক মুক্তভাবে কাঁচামাল আমদানি ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। এ খাতের পাশাপাশি অন্যান্য সকল রপ্তানিমুখী খাতের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে তাদের জন্যও কাস্টমস বন্ড সুবিধা চালুর প্রস্তাব করছি।
ব্যবসা সহজীকরণের উদ্দেশ্যে শতকরা একশত ভাগ রপ্তানিমুখী Compliant পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রতিবছর বন্ডের অডিটের বাধ্যবাধকতা রহিত করার প্রস্তাব করছি।
তৈরি পোশাক শিল্পের ন্যায় শতভাগ রপ্তানিমুখী লেদারগুডস ও ফুটওয়্যার শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং টাওয়েল, লিনেন ও হোমটেক্সটাইল শিল্প প্রতিষ্ঠানের জেনারেল বন্ডের মেয়াদ এক বছরের স্থলে তিন বছর করার প্রস্তাব করছি।
বন্ডেড ওয়্যারহাউসে এককালীন কাঁচামাল মজুদের সীমা তুলে দেয়ার প্রস্তাব করছি। বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পণ্য জাহাজীকরণের মেয়াদোত্তীর্ণের অন্যুন ৪৮ ঘণ্টা পূর্বে ইউটিলাইজেশন পারমিশন বা ইউপি (UP) গ্রহণের পরিবর্তে ২৪ ঘণ্টা পূর্বে করার প্রস্তাব করছি।
জুয়েলারি শিল্পের আধুনিকায়ন ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে শুল্কমুক্তভাবে কাঁচামাল আমদানি এবং তা হতে প্রস্তুতকৃত জুয়েলারি রপ্তানি কার্যক্রম সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে বন্ডেড ওয়্যারহাউস পদ্ধতির আওতায় একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করছি।
রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রসার ও রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্রায়নের জন্য নতুন ১০টি খাতে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে শুল্ক মুক্তভাবে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ প্রদান করার প্রস্তাব করছি।
কেবলমাত্র ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩০% মূল্য সংযোজন (Value Addition) করার আইনি বাধ্যবাধকতা বিলোপ করার প্রস্তাব করছি।
Authorized Economic Operator (AEO) প্রতিষ্ঠানসমূহ কর্তৃক System Based Self-Assessment পদ্ধতিতে পণ্য খালাসের হার বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করছি।
আমদানি পণ্য ছাড়করণের ক্ষেত্রে আমদানিকৃত পণ্যের সঠিকতা ও গুণগত মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সরকারি ল্যাবের পাশাপাশি বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড ও আইএসও (ISO) স্বীকৃত বেসরকারি ল্যাবরেটরিতেও পণ্য পরীক্ষার সুযোগ রেখে নতুন বিধান করার প্রস্তাব করছি।
মূল্য সংযোজন কর সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়ন্ত্রণ (Deregulation)
মূসক রিফান্ড আবেদন গ্রহণ, যাচাই, অনুমোদন এবং মূসক ফেরতের অর্থ iBAS++ এর মাধ্যমে করদাতা ব্যাংক হিসাবে জমা ইত্যাদি অটোমেটেড প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হবে।
আগামী অর্থবছরের শুরু থেকে আয়করের eReturn এর ন্যায় eVAT সিস্টেম হতে অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হবে।
ক্ষুদ্র ভ্যাটদাতাদের জন্য সহজে মূসক দাখিলপত্র দাখিলের সুবিধার্থে আলাদা ভ্যাট রিটার্ন ফরম প্রবর্তন করা হবে যাতে তারা অতি সহজে অল্প কিছু তথ্য পূরণ করে অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করতে পারেন।
eVAT সিস্টেমে আবেদন করার সাথে সাথেই, তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবসায় শনাক্তকরণ সংখ্যা (বিআইএন) প্রদান করার লক্ষ্যে আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনয়নের প্রস্তাব করছি।
প্রতিমাসে রিটার্ন দাখিলে বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহারপূর্বক প্রতি তিন মাসে একবার অর্থাৎ ত্রৈমাসিকভাব রিটার্ন দাখিলের বিধান প্রণয়নের প্রস্তাব করছি।
যে সকল করদাতা নিজস্ব ERP software ব্যবহার করেন, তারা যাতে নিজস্ব সফটওয়্যার হতে এক ক্লিকেই ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে পারেন তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
আপিল, ট্রাইব্যুনাল এবং হাইকোর্টে আপীল দায়েরের ক্ষেত্রে জমাকৃত কর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস করা এবং এ ক্ষেত্রে কর কর্মকর্তাগণের Discretionary Power বিলোপ করার প্রস্তাব করছি।
অর্থ প্রত্যাবাসন, বৈদেশিক লেনদেন ও আর্থিক লেনদেন সহজীকরণে উদ্যোগ
বিদেশি বিনিয়োগকারীর আস্থা বৃদ্ধি, বৈদেশিক লেনদেন সহজীকরণ, ব্যাংকিং সেবা দ্রুততর করা এবং ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে আমরা নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করছি:
অতালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার হস্তান্তর ও মূলধন প্রত্যাবাসন সহজ করা হয়েছে। এক কোটি টাকা পর্যন্ত valuation report লাগবে না এবং ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত deal value বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ছাড়াই repatriation করা যাবে।
বড় অঙ্কের লেনদেনে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণকে আরও নিরপেক্ষ করতে licensed valuation firms ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হবে।
বৈদেশিক বাণিজ্যে সময় ও ব্যয় কমাতে নির্ভরযোগ্য আমদানিকারক ও কম-ঝুঁকির পণ্যের ক্ষেত্রে ঋণপত্রের বাধ্যতামূলক ব্যবহার ধাপে ধাপে শিথিল করার বিষয় বিবেচনা করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক-এর Real Time Gross Settlement-এর সঙ্গে সমন্বয় সাধন করে ব্যাংক, মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবা, পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সেবামাধ্যমের মধ্যে লেনদেন দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
e-Loan চালুর মাধ্যমে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ ১২ মাস মেয়াদে দেয়া যাবে। এতে ক্ষুদ্র ঋণপ্রাপ্তি সহজ হবে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে।
খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তিতে মামলা দায়েরের আগে Pre-Suit Mediation বা মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা ব্যবহারে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। এতে ঋণসংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হবে।
পুঁজিবাজারে মূলধন সংগ্রহ সহজীকরণে পদক্ষেপ
পুঁজিবাজারকে আরও গভীর, স্বচ্ছ, বহুমাত্রিক ও আস্থাভিত্তিক করতে আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছি:
ভালো ও সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলোর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া সহজ করতে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা, দীর্ঘসূত্রিতা, অতিরিক্ত ব্যয় এবং অনুমোদন ও পরিপালন-সংক্রান্ত অস্পষ্টতা কমানো হচ্ছে।
আইপিও প্রক্রিয়া সময়নির্ধারিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করা হবে। আবেদন দাখিল, আনুষঙ্গিক দলিলাদি, যাচাই-বাছাই, ফি পরিশোধ, সংশোধন ও অনুমোদনের ধাপ অনলাইনে সম্পন্ন করা হবে।
ইস্যুকারী কোম্পানি, ইস্যু ম্যানেজার, স্টক এক্সচেঞ্জ, সিডিবিএল ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে করা হবে।
পেনশন তহবিল, বীমা প্রতিষ্ঠান, Asset Management Company (AMC), মিউচুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো হবে।
কর্পোরেট বন্ড বাজার সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় সরকার ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে পৌর বন্ড ইস্যুর ব্যবস্থা করা হবে।
সরকারি ও বেসরকারি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প অর্থায়নে বন্ড, সুকুক, অবকাঠামো তহবিলসহ বিভিন্ন financing instruments-এর ব্যবহার বাড়ানো হবে।
নির্মাণ, পরিবেশ, স্থানীয় অনুমোদন ও প্রতিপালন সহজীকরণে উদ্যোগ
শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সরকারি সেবাসমূহ সহজ ও সমন্বিত করতে আমরা নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করছি: শিল্পকারখানার স্থান নির্বাচনসংক্রান্ত ছাড়পত্র এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের আবেদন অনলাইনে গ্রহণ ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
নবম অধ্যায়: উপসংহার
আমি মহান জাতীয় সংসদের সম্মানিত সদস্যবৃন্দ, দেশের কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, নারী, তরুণ, উদ্যোক্তা, পেশাজীবী, প্রবাসী এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণের সহযোগিতা কামনা করছি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ধারাবাহিক পদক্ষেপ, অর্থনৈতিক সংস্কারের সাহসী উদ্যোগ এবং জাতীয় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হবে।
আমাদের প্রত্যয় এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে সুযোগের দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, উদ্যোগ ও উদ্ভাবন উৎসাহিত হবে, পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হবে এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছে যাবে। অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণ, বিনিয়ন্ত্রণকরণ এবং জনগণের ক্ষমতায়নের ভিত্তিতেই আমরা একটি সমৃদ্ধ ও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ নির্মাণ করব ইনশাআল্লাহ।
আমরা বিশ্বাস করি, জনগণের শক্তি, সৃজনশীলতা ও উদ্যোগই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেই শক্তিকে বিকশিত করার মধ্য দিয়েই আমরা গণমানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে চাই, সমস্যার সমাধান করতে চাই, এবং সম্মিলিত প্রয়াসে গড়ে তুলতে চাই গণআকাঙ্ক্ষার এক স্বনির্ভর ও মর্যাদাবান বাংলাদেশ।
আমরা চাই, আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের গৌরব হোক সকলের।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

