ব্যবসায়িক ও ভ্রমণ ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে ৩৮টি দেশকে বন্ড বা জামানত নীতিমালার আওতায় এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে বাংলাদেশও আছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, এসব ভিসা পাওয়ার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিকে পাঁচ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত জামানত দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ভিসা বন্ডের আওতাধীন কয়েকটি দেশের তালিকা প্রথম প্রকাশ করে গত বছরের আগস্টে। গত মঙ্গলবার সেই তালিকা সম্প্রসারণ করে বাংলাদেশকেও যুক্ত করা হয়। বলা হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী কঠোর অবস্থান ও ভিসার মেয়াদ শেষেও বাড়তি সময় থাকার (ওভারস্টে) প্রবণতা কমাতে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, যেসব দেশের শিক্ষার্থী ও অভিবাসীরা অতিরিক্ত সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেন, তাদের মধ্যে বাংলাদেশিদের হার উল্লেখযোগ্য।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, সাময়িকভাবে ব্যবসার উদ্দেশ্যে, শিক্ষামূলক, পেশাগত বা বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ, চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চাইলে ভিসার ধরন হয় বি১। আর যাদের উদ্দেশ্য থাকে ভ্রমণ, বিনোদন কিংবা চিকিৎসা– তাদের দেওয়া হয় বি২ ভিসা। এই ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে একটানা ৯০ দিনের বেশি থাকা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার জন্য গেলে ভিসার ধরন হয় ‘এফ’ বা ‘এম’। ফলে শিক্ষার্থীরা এই বন্ড নীতির আওতায় পড়বেন না।
কাদের জামানত দিতে হবে
বাংলাদেশি কেউ যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য বি১, বি২ ধরনের ভিসার আবেদন করলে আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে বন্ড নীতির আওতায় পড়বেন। যখন কেউ এ দুই ধরনের ভিসা পাওয়ার উপযুক্ত বিবেচিত হবেন, তখন তাদের জামানত হিসেবে পাঁচ হাজার, ১০ হাজার কিংবা ১৫ হাজার ডলার জমা দিতে হবে। কাকে কত ডলার জামানত দিতে হবে, তা নির্ধারিত হবে ভিসা সাক্ষাৎকারের সময়।
গতকাল বুধবার দুপুর পর্যন্ত প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ১২২ টাকা ৩১ পয়সা। সে হিসাবে কারও ১৫ হাজার ডলার জামানত ধার্য হলে জমা দিতে হবে প্রায় ১৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।
কেন জামানতের বাধ্যবাধকতা
গত বছরের ১৬ জুলাই মার্কিন কংগ্রেসে অভিবাসীদের ওভারস্টে-সংক্রান্ত একটি বার্ষিক প্রতিবেদন তুলে ধরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পরের মাসে কয়েকটি দেশের একটি তালিকা প্রকাশ করে পররাষ্ট্র দপ্তর। তখন বলা হয়, তালিকাভুক্ত দেশের পাসপোর্টধারীরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর ভিসার মেয়াদ শেষেও দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান (ওভারস্টে) করেন। এই উচ্চ হার কমানোর লক্ষ্যে ভিসা বন্ড বা জামানত আদায় করা হবে। প্রাথমিকভাবে তখন বি১ ও বি২ ধরনের ভিসাকে এই নিয়মের আওতায় আনা হয়।
গত মঙ্গলবার নতুন করে যেসব দেশ এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে, সেগুলোর পাসপোর্টধারীদেরও যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত সময় বসবাসের হার বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও আছে ভুটান ও নেপাল। বাকিগুলো আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের।
বাংলাদেশ কেন তালিকায়
বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ওভারস্টের হার সবচেয়ে বেশি ব্যবসা ও ভ্রমণ ভিসাধারীদের। ধারণা করা হচ্ছে, এই দিকটি বিবেচনায় বাংলাদেশকে ভিসা বন্ড নীতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
মার্কিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চ হারের ওভারস্টে-সংক্রান্ত প্রতিবেদন (২০২৪ অর্থবছর) অনুযায়ী, ওই বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৮ হাজার ৫৯০ বাংলাদেশি বি১, বি২ ভিসাধারীর প্রস্থানের কথা ছিল। তাদের মধ্যে দুই হাজার ১৬২ জনের প্রস্থানের কোনো তথ্য নেই। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া ৫১ জন অন্য দেশে চলে গেছেন। মোট ওভারস্টে ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ২০২৩ অর্থবছরে এ ধরনের ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া ২৯ হাজার ৪১ বাংলাদেশির প্রস্থানের কথা থাকলেও মোট ওভারস্টের সংখ্যা ছিল এক হাজার ৯৯৩।
ব্যবসা বা ভ্রমণ ভিসায় সবচেয়ে বেশি ওভারস্টের হার মিয়ানমারের ৩৮ দশমিক ১৫। কিন্তু তাদের প্রত্যাশিত প্রস্থানকারীর সংখ্যা কম– পাঁচ হাজার ৪৫৫। ওভারস্টে করেন দুই হাজার ৮১ জন। ভিসা বন্ড তালিকাভুক্ত দেশে তাদের নাম নেই।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া অস্থায়ী অভিবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও এক্সচেঞ্জ ভিজিটরদের (এফ, এম, জে ভিসাধারী) ওভারস্টের মোট হার ছিল ৯ দশমিক ০৯। সাত হাজার ৪১৩ জনের প্রস্থানের কথা থাকলেও সন্দেহভাজন বসবাসকারী ছিল ৬১১ জন। অন্যান্য ধরনের ভিসাধারীর মধ্যে সন্দেহভাজন বসবাসকারী ছিল ৮৭ জন।
জামানত দিলেই কি ভিসা মিলবে
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলছে, জামানত দিলেই ভিসা মিলবে– এমন নিশ্চয়তা নেই। যদি কোনো কারণে কারও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আবেদন প্রত্যাখ্যান হয়, তাহলে জামানত স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে এবং ওই ব্যক্তি অর্থ ফেরত পাবেন। ভিসা পাওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ না করলে কিংবা নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে দেশটি থেকে চলে এলেও জামানত ফেরত দেওয়া হবে। তবে কেউ কনস্যুলার অফিসারের নির্দেশ ছাড়া জামানত জমা দিলে তা ফেরত পাওয়া যাবে না।
ভিসা আবেদনকারীকে মার্কিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফরম আই-৩৫২ জমা দিতে হবে। শর্ত মেনে বন্ডের অর্থ জমা দিতে হবে ডিপার্টমেন্ট অব দ্য ট্রেজারির অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম পে ডট জিওভি (Pay.gov) ব্যবহার করে। তৃতীয় পক্ষের কোনো ওয়েবসাইট ব্যবহার করা যাবে না।
বন্ডের মাধ্যমে ভিসা পাওয়া ব্যক্তিরা কেবল তিনটি বিমানবন্দর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ও প্রস্থান করতে পারবেন। সেগুলো হলো– ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের বোস্টন লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি এবং ওয়াশিংটনের ডালাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এগুলোর বাইরে অন্য কোনো বিমানবন্দর ব্যবহারের চেষ্টা করলে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

