বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজের কিছু মডেলে সফটওয়্যার ত্রুটি শনাক্ত করেছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং। নির্দিষ্ট একটি অবতরণ পরিস্থিতিতে এ ত্রুটির কারণে উড়োজাহাজের স্বয়ংক্রিয় ফ্লাইট গাইডেন্স ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।
ভারতের এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস ও আকাসা এয়ারের বহরে থাকা প্রায় ৯৬টি ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজ এই সমস্যার আওতায় পড়তে পারে। খবর ওয়ায়ান
এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের বহরে প্রায় ৫৩টি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স রয়েছে। আকাসা এয়ার পরিচালনা করছে ৪৩টি এ ধরনের উড়োজাহাজ।
বোয়িংয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, গত মাসেই বিশ্বের সব ৭৩৭ উড়োজাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থাকে সফটওয়্যার সমস্যাটির বিষয়ে জানানো হয়েছে।
সমস্যাটি স্থায়ীভাবে সমাধানের জন্য সফটওয়্যার আপডেট তৈরির কাজ চলছে।
বোয়িং জানিয়েছে, নির্দিষ্ট একটি অবতরণ পরিস্থিতিতে পাইলটদের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে যাওয়ার অভিজ্ঞতা হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি নিরাপদে সামাল দেওয়ার জন্য বিদ্যমান পাইলট পদ্ধতি অনুসরণ করতে অপারেটরদের প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হয়েছে।
কীভাবে দেখা দিতে পারে ত্রুটি
বোয়িংয়ের নথির বরাত দিয়ে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো উড়োজাহাজের অবতরণের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর (মিসড অ্যাপ্রোচ) পাইলটরা নির্ধারিত ফ্লাইটপথ পরিবর্তন করলে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
নতুন অবতরণপথটি আগে থেকে নির্ধারিত পথের তুলনায় ভিন্ন হলে স্বয়ংক্রিয় ফ্লাইট গাইডেন্স ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এতে পাইলটদের ম্যানুয়ালি উড়োজাহাজ চালানোর সক্ষমতা নষ্ট হয় না। পিটিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিসড অ্যাপ্রোচের পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সিস্টেমটি রিসেট করার পরামর্শ দিয়েছে বোয়িং।
স্থায়ী সফটওয়্যার আপডেট না আসা পর্যন্ত এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিতে অপারেটরদের বিদ্যমান পদ্ধতি অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তায় প্রভাব নেই : আকাসা এয়ার
আকাসা এয়ার জানিয়েছে, তারা সফটওয়্যার সমস্যাটি নিয়ে বোয়িংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।
তবে এর কারণে তাদের উড়োজাহাজ পরিচালনার নিরাপত্তায় কোনো প্রভাব পড়েনি।পিটিআইকে দেওয়া এক বিবৃতিতে আকাসা এয়ারের মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা বোয়িংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করছি এবং নিশ্চিত করতে পারি যে, আকাসা এয়ারের কার্যক্রমের নিরাপত্তায় এর কোনো প্রভাব নেই।’
আকাসা এয়ারের কোনো ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজে ইতিমধ্যে এই সমস্যা দেখা দিয়েছে কি না, তা অবশ্য জানায়নি সংস্থাটি।
এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের তাৎক্ষণিক জবাব দেয়নি। ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিজিসিএও বিষয়টি পর্যালোচনা করছে কি না কিংবা ভারতীয় এয়ারলাইনসগুলোর জন্য কোনো নির্দেশনা জারি করবে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানায়নি।
আহমেদাবাদ দুর্ঘটনার পর বাড়তি নজরদারি
ভারতে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ নিয়ে বাড়তি নজরদারির মধ্যে ৭৩৭ ম্যাক্সের সফটওয়্যার সমস্যার খবরটি সামনে এল। ২০২৫ সালের জুনে আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার পর দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ উড়োজাহাজের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়।
ওই দুর্ঘটনায় ২৬০ জন নিহত হন। এরপর ভারতীয় এয়ারলাইনসের পরিচালিত বোয়িং ৭৮৭-৮ ও ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজের নিরাপত্তা ও উড্ডয়নের আগে রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে ডিজিসিএ।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে লন্ডন থেকে বেঙ্গালুরুর পথে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বোয়িং ৭৮৭-৮ উড়োজাহাজও একটি সম্ভাব্য ত্রুটির কারণে গ্রাউন্ডেড করা হয়েছিল। উড়োজাহাজটির পাইলট ইঞ্জিনের জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সুইচের লকিং ব্যবস্থা নিয়ে সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন।
পরে বোয়িংয়ের পরীক্ষায় ওই ব্যবস্থায় কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়নি বলে ভারত সরকার জানায়। তবে ওই ঘটনা এবং সর্বশেষ ৭৩৭ ম্যাক্সের সফটওয়্যার ত্রুটি—দুটি আলাদা বিষয়।
৭৩৭ ম্যাক্স নিয়ে আগের বিতর্ক
বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজ ২০১৮ ও ২০১৯ সালের দুটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের নিরাপত্তা পর্যালোচনার মুখে পড়ে।
২০১৮ সালের অক্টোবরে ইন্দোনেশিয়ায় লায়ন এয়ারের একটি ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ বিধ্বস্ত হয়ে ১৮৯ জন নিহত হন। পরের বছর মার্চে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের একটি ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ দুর্ঘটনায় ১৫৭ জন নিহত হন। এরপর উড়োজাহাজটির চলাচল বিশ্বজুড়ে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা এয়ারলাইনসের একটি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৯ উড়োজাহাজের দরজার একটি প্লাগ উড্ডয়নের সময় খুলে যাওয়ার ঘটনাও নতুন করে বোয়িংয়ের উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
বোয়িং জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৪০০টির বেশি ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজ সরবরাহ করা হয়েছে।
স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষা
বোয়িং এখন সফটওয়্যার সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানে আপডেট তৈরির কাজ করছে। আপডেটটি কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত মিসড অ্যাপ্রোচের পর ফ্লাইট গাইডেন্স ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে পাইলটদের করণীয় সম্পর্কে অপারেটরদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ভারতীয় এয়ারলাইনসগুলোর জন্য বিষয়টি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশটিতে উড়োজাহাজের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং যাত্রীদের নজরদারি বেড়েছে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

