গ্যাস সংকটের মধ্যেই দেশজুড়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে লোডশেডিং। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় নাজেহাল অবস্থা সাধারণ মানুষের।
"সকাল, দুপুর কিংবা রাত নেই, সবসময়ই বিদ্যুৎ যাচ্ছে- এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরের দেড় ঘণ্টা থাকে না," বিবিসি বাংলাকে এভাবেই বলছিলেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ফয়সাল আহমেদ।
তীব্র গরমে ধারাবাহিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বিপাকে পড়েছেন মাগুরা জেলার বাসিন্দা দেবাশিষ বিশ্বাস।
তিনি জানান, "গভীর রাতে ঘুমের মধ্যে বিদ্যুৎ গিয়ে আর আসার খবর থাকে না, বাচ্চাকাচ্চা মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে বসে থাকে।"
বেশ কয়েকটি জেলায় খোঁজ নিয়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অনেকটা একই রকম তথ্য পাওয়া গেছে। সাধারণ গ্রাহকদের দাবি, দিনে রাতে সবসময়ই যাওয়া-আসা করছে বিদ্যুৎ।
এদিকে, তীব্র গ্যাস সংকটের পর এবার বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতির বিরূপ প্রভাব পড়েছে দেশের শিল্প খাতেও।
ধারাবাহিক লোডশেডিং নিয়ে সামাজিক মাধ্যমেও অনেককে প্রতিবাদ জানাতে দেখা গেছে।
এদিকে, দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে দেশের কিছু জায়গায় বিদ্যুৎ অফিসে গ্রাহকরা হামলা-ভাঙচুর চালিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
বিশেষ করে দেশের গ্রামাঞ্চলে দশ থেকে বারো ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে গ্রিড, উপকেন্দ্র ও অফিসগুলোতে নিরাপত্তা চেয়ে বুধবার পুলিশ প্রধানের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন। এছাড়া, নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ কিংবা প্রশাসনের কাছে পৃথক আবেদন করেছে গোপালগঞ্জ, নীলফামারীসহ বিভিন্ন জেলার বিদ্যুৎ অফিস।
সব মিলিয়ে তীব্র গ্যাস সংকট এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে দেশজুড়ে সংকট বাড়ছে। যদিও বুধবার সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে জানান বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
তবে এই পরিস্থিতি কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে সেটি নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন বলেও জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
তবে বুধবার সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ বিভাগ সারাদেশে জেলা প্রশাসন মার্কেট ও দোকান-পাট বন্ধের সময় এ নিয়ে আনা সংক্রান্ত নতুন নির্দেশনাও দিয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের শিল্প এলাকায় তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে কারখানা বন্ধ রাখার খবর জানিয়েছেন উদ্যোক্তাদের অনেকে।
"গতকাল পর্যন্ত একটু একটু করে জ্বালানি পাচ্ছিলাম, আজ তাও বন্ধ হয়ে গেছে," বলছিলেন নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।
নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি কেন?
দেশের গ্রামাঞ্চলে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের একাধিক স্থাপনায় হামলা-ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
সোমবার দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে পল্লী বিদ্যুতের এরিয়া অফিসে হামলার ঘটনা ঘটে। এছাড়া পার্বতীপুর জোনাল অফিসের আওতাধীন ভবের বাজার ইনডোর উপকেন্দ্রেও হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
এসব হামলা-ভাঙচুরের একাধিক ভিডিও সামাজিক মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে।
পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে কর্মরতদের অনেকেই বলছেন, ধারাবাহিকভাবে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বাড়তে থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক ক্ষোভ জন্ম নিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে বুধবার একটি চিঠি দিয়েছে পল্লী বিদ্যুতে কর্মরতদের সংগঠন, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন।
সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক মাহবুবুর রহমান এর পাঠানো ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোতে গড়ে আট থেকে নয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও পাওয়া যাচ্ছে পাঁচ থেকে ছয় হাজার মেগাওয়াট।
"পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকায় অত্যধিক লোডশেডিং-এর কারণে জনরোষ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কিছু কিছু জায়গায় বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র অফিসগুলো হামলার শিকার হচ্ছে," বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, গোপালগঞ্জে পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দিয়েছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি বা ওজোপাডিকো কর্তৃপক্ষ।
সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে এক ধরনের নিরাপত্তা শঙ্কায় পড়েছেন এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরা। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে জনরোষ আরও বাড়তে পারে বলেও শঙ্কা অনেকের।
পল্লী বিদ্যুৎসহ বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মী, স্থাপনা এবং বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম।
তিনি বলছেন, বিদ্যুৎ অফিসে কর্মরতদের, লোডশেডিং র্যাশনালাইজেশনসহ বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
"আমাদের যতগুলো পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি আছে, পিডিবি আছে, নেসকো আছে সবাইকে বলা হয়েছে যে, সবাই যেন লোড ম্যানেজমেন্টটা ওইভাবেই করে, কোথাও বেশি লোডশেড, কোথাও কম লোডশেড এটা যেন না হয়," বলেন তিনি।
এছাড়া লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ গ্রাহকদেরকে ক্ষুব্ধ না হওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান।
"আমরা বিদ্যুৎ অফিসে কর্মরতদের বলেছি, যাতে তারা মানুষকে একটু বোঝায় যে, এটা তো আমার ব্যক্তিগত কিছু নয় যে, আমার কারণে বিদ্যুৎটা বন্ধ আছে, এভাবে কমিউনিকেটিভ ওয়েতে একটু ম্যানেজ করার কথা বলেছি," বলেন ম. করিম।
কেন এই সংকট
বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার পাঁচশ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। কিন্তু খাতা কলমে বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট।
কিন্তু তারপরও বিদ্যুৎ নিয়ে কেন এই অস্থিরতা?
বাংলাদেশে বর্তমানে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট এবং রেকর্ড পরিমাণ লোডশেডিংয়ের পেছনে তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশই গ্যাসভিত্তিক। কিন্তু সম্প্রতি মহেশখালীতে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। চাহিদার তুলনায় অনেক কম গ্যাস পাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না।
এছাড়া দেশের অন্যতম বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বড়পুকুরিয়ার মতো বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন বেসরকারি কেন্দ্র ও আমদানিকারকদের কাছে সরকারের বড় অঙ্কের বকেয়া বিল জমে যাওয়ার কারণেও এই নিয়ে জটিলতা বেড়েছে।
বাংলাদেশে কম-বেশি লোডশেডিং সব সময়ই রয়েছে। কিন্তু গত মাসের ২৮শে জুলাই থেকে লোডশেডিংয়ের মাত্রা প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে গত ১০ই জুলাই এর পরিমাণ ছাড়িয়েছে অতীতের সব রেকর্ড।
ওই দিন দুপুরে ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ১২ হাজার ৫০৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। অর্থাৎ সেদিন লোডশেডিং হয়েছিল তিন হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি এর তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ঢাকা জোনে ছয় হাজার ৪৩২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৫৮৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।
বাকি সবগুলো বিভাগেই চাহিতার তুলনায় কম বিদ্যুৎ সরবরাহের তথ্য পাওয়া গেছে।
এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের মাত্রা কমার সম্ভাবনা কম বলেই মত জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলমের।
তিনি বলছেন, "বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় যে পরিমাণ বেড়েছে, সেটি কমাতে হবে। জ্বালানি সংস্থান কীভাবে বাড়ানো যায় সেই চেষ্টা করতে হবে। এছাড়া সরকারের হাতে আর কোনো উপায় নেই।"
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় দুই হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও মঙ্গলবার সরবরাহ করা হয়েছে ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট।
ফলে জ্বালানি সংকটে অনেক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এখন বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
দেশজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং এবং জ্বালানি সংকট নিয়ে বেশ চাপের মুখে বর্তমান সরকার। সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে, বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতির জন্য দেশের সাধারণ মানুষের কাছে দুঃখও প্রকাশ করেছেন সরকারের বিদ্যুৎমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী।
অবশ্য বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, "আমরা একটা কৌশল নিয়েছি গতকাল সন্ধ্যা থেকে। আমরা আশা করছি আজ (১২ই অগাস্ট) সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিছুটা হলেও স্বাভাবিক হবে।"
তবে গ্যাস এবং বিদ্যুৎ নিয়ে চলমান সংকট পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও কতদিন সময় লাগতে পারে, এ নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেননি তিনি।
"অ্যাক্সিডেন্ট ইজ অ্যাক্সিডেন্স- যার ফলে এলএনজি টার্মিনাল থেকে আমরা এখনো ফুল ক্যাপাসিটিতে কাজ করতে পারছি না। দেশি উৎপাদন রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব না, এটা দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপার," বলেন তিনি।
শপিংমল ও দোকানপাট রাত ৮টায় বন্ধের নির্দেশ
বাংলাদেশের সব শপিংমল, মার্কেট ও দোকান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ এবং আলোকসজ্জা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার রাতে বিদ্যুৎ বিভাগ সারাদেশে জেলা প্রশাসনকে এ নির্দেশনা পাঠায়।
এর আগে গত ১১ই জুন জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী, শপিং মল, মার্কেট ও দোকান রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর ছিল।
সবশেষ নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান ও অনুষ্ঠিতব্য মেলা, বাণিজ্য মেলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এই সময়সীমা প্রযোজ্য হবে। এসব আয়োজন রাত ৮টার মধ্যেই শেষ করতে হবে।
তবে খাবারের দোকান, হাসপাতাল, ওষুধের দোকানসহ সংশ্লিষ্ট জরুরি সেবাগুলো এ নির্দেশনার আওতামুক্ত থাকবে। সূত্র: বিবিসি বাংলা
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

