‘এক বছর ধরে আমার মেয়ে নিখোঁজ। খুঁজে পাচ্ছি না। আপনারা আমার সন্তানকে খুঁজে দিন। গ্রামে আমার একটা ভিটেবাড়ি আছে। কেউ আমার মেয়েকে এনে দিতে পারলে পুরস্কার হিসেবে ওই ভিটেবাড়ি দিয়ে দেব।’ কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন নিখোঁজ শিশু রূপা আক্তারের মা স্বপ্না আক্তার। মেয়ের ছবি হাতে নিয়ে তার মতো আরও অন্তত ৩০টি পরিবারের মা-বাবা ও স্বজন আজ সন্তানের সন্ধান চেয়েছেন।
‘আমার সন্তান কোথায়?’ শিরোনামে আজ রোববার ঢাকার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। নিখোঁজ শিশুদের পরিবারের উদ্যোগে ও জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটি হয়।
অনুষ্ঠানে নিখোঁজ সন্তানদের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। কারও হাতে ছিল সন্তানের ছবি, কারও হাতে নিখোঁজ হওয়ার তারিখ উল্লেখ করা প্ল্যাকার্ড। দিন, মাস, বছর পেরিয়ে গেলেও সন্তান ফিরে আসার অপেক্ষা শেষ হয়নি তাদের। সন্তানদের খুঁজে দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা। একই সঙ্গে নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে পুলিশের বিশেষ টিম গঠনের দাবি জানান।
এক বছর ধরে মেয়ের অপেক্ষায় মা
স্বপ্না আক্তার বলেন, গত বছরের ২৯ আগস্ট বাসার কাছে একটি দোকানের সামনে থেকে তিন বছর বয়সী রূপা নিখোঁজ হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, এক তরুণ রূপাকে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। পরে পল্লবী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি। কিন্তু এক বছরের বেশি সময় পার হলেও মেয়ের সন্ধান পাননি।
স্বপ্না বলেন, ‘মেয়ে বেঁচে আছে, নাকি মরে গেছে, সেটাও জানি না। কিন্তু মেয়েকে পাওয়ার আশা একমুহূর্ত ছাড়তে পারি না। আপনারা আমাদের ভিডিওগুলো শেয়ার করুন, আমাদের সন্তানদের খুঁজে দিন। মৃত্যুর আগে একবার হলেও সন্তানকে দেখে যেতে চাই।’
২০১৮ সালের ১১ জানুয়ারি রাজধানীর লালবাগ থেকে আট বছর বয়সী শিশু সকাল নিখোঁজ হয়। এরপর লালবাগ থানায় জিডি করেও সন্তানের সন্ধান পাননি বাবা ইসমাঈল হাসান। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে প্রশাসনের কাছ থেকে সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইসমাঈল বলেন, ‘ছেলেকে খুঁজতে গিয়ে সবকিছু হারিয়েছি। মৃত্যুর আগে একবার সন্তানকে দেখতে চাই।’ নিখোঁজ সন্তানদের বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে সরকারের প্রতি আবেদন জানান তিনি।
‘আমার সন্তানকে চাই’
রাজবাড়ীর পাংশায় স্কুলে যাওয়ার পথে গত বছরের ২০ মে নিখোঁজ হয় সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মো. তামিম ওরফে আবদুল্লাহ (১৫)। তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবল মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশায় যা কিছু করার করেছি। সবার কাছে অনুরোধ, আমার যা কিছু আছে সব দিয়ে দেব। আমি আমার সন্তানকে চাই।’
ঝিনাইদহের খাজুরা থেকে ১৩ বছর বয়সী মো. আলী নিখোঁজ হয় গত ২৯ জুলাই। বাবা মোহাম্মদ হোসেন অভিযোগ করেন, জিডি করতে গিয়ে পুলিশের অসহযোগিতার মুখে পড়েছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘সিরাজগঞ্জ, নাটোর, পাবনা, ঢাকা, রংপুর, চট্টগ্রামসহ অনেক জায়গায় ছেলেকে খুঁজেছি, কিন্তু পাইনি। আজ দেড় মাস যাবত ছেলেকে আদর করতে পারি না।’
সাভারের বলিয়াপুর থেকে ৩৮ দিন আগে নিখোঁজ হয় পাঁচ বছর বয়সী যাদব কর্মকার। মা অর্চনা রানী দাস বলেন, ‘আমি আমার বাচ্চাকে চাই। এই বাচ্চা ছাড়া আমি বাঁচব না।’ সরকারের কাছে সন্তানকে খুঁজে দেওয়ার আবেদন জানান তিনি।
তহুরা ইসলাম (২২) জানান, তার ছেলে এক মাস ২০ দিন ধরে নিখোঁজ। তিনি থানায় জিডি করেছেন। নবাবগঞ্জের দোহারে শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে বাসার একটি কক্ষে দুই বছরের সন্তান মো. তোহা আদনানকে মুঠোফোন দিয়ে বসিয়ে পাশের কক্ষে যান তিনি। পাঁচ মিনিট পর ফিরে এসে দেখেন, ছেলে নেই; বিছানায় পড়ে আছে মুঠোফোনটি।
আড়াই বছর আগে বাড়ির সামনে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় শিশু সামিয়া। মা চম্পা বেগম প্রতিবেশী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করেন। তবে ওই ব্যক্তি তিন মাস পর জামিনে বেরিয়ে আসেন। ছয় মাস আগে টিকটকে একটি শিশুকে দেখে সামিয়া বলে শনাক্ত করে যশোরে গিয়ে খোঁজ নেন তিনি। তবে পুলিশের সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ তার।
চম্পা বলেন, ‘পুলিশের এক কথা, এই মেয়েটি তার নয়।’
গত বছরের মে মাসে দিনাজপুরের বাসার সামনে থেকে নিখোঁজ হয় মনিরুজ্জামান মনির মেয়ে মানতাশা (৮)। মুক্তিপণের টাকা নিয়ে গেলেও মেয়েকে উদ্ধার করতে পারেননি তিনি। মেয়ের স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে অনুষ্ঠানেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
সাত মাসে ১৫ হাজারের বেশি জিডি
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শিশু নিখোঁজ-সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৪১৪। ২০২৫ সালে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয় ২২ হাজার ৫৫০টি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে শিশু নিখোঁজের অভিযোগে ১৫ হাজার ৭১৭টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৮ শিশু এখনো নিখোঁজ। অন্যদের উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুরা সাধারণত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে গিয়ে পথ ভুলে, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারায় বা একা বাসায় ফেরার সময় অন্যত্র চলে গিয়ে নিখোঁজ হয়।
১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে অভিমান, পড়ালেখার চাপ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার পর লজ্জা, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, পরিবার থেকে অর্থ বা অন্য সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবসহ বিভিন্ন কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অ্যাম্বার অ্যালার্টের দাবি
অনুষ্ঠানে জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. সাদাত রহমান বলেন, ২০২৪ সালে সিলেটে শিশু মুনতাহা নিখোঁজ ও হত্যাকাণ্ডের পর এক লাখ মানুষের স্বাক্ষর নিয়ে বাংলাদেশে নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে অ্যাম্বার অ্যালার্ট ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডির) সহযোগিতায় এবং জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের পরিচালনায় মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন (মুন অ্যালার্ট) ও টোল হেল্পলাইন ১৩২১৯-এর পাইলট কার্যক্রম চালু করা হয়। বর্তমানে এটি দেশব্যাপী শিশু নিখোঁজ প্রতিরোধ ও উদ্ধারে সহায়ক উদ্যোগ হিসেবে কাজ করছে বলে জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান ও নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া, দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ঘটনাগুলোর পুনঃতদন্ত ও অগ্রগতি পর্যালোচনা, শিশু নিখোঁজ ও পাচার প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে পুলিশের বিশেষ টিম গঠনেরও দাবি জানান স্বজনেরা।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

