পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, শ্রমিক রপ্তানি ও রেমিট্যান্সনির্ভর সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব বাড়াতে চায় বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য বিনিয়োগ তহবিল গঠনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়টিও ইতিবাচকভাবে দেখছে বাংলাদেশ।
আজ (শনিবার, ১০ অক্টোবর) সকালে ‘কর্মশক্তি থেকে কৌশলগত অংশীদারত্ব: বাংলাদেশ-সৌদি আরব সম্পর্কের নতুন ভাবনা’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে এসব কথা বলেছেন হুমায়ুন কবির।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) এবং ফরেন সার্ভিস একাডেমি যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।
হুমায়ুন কবির বলেছেন, ধর্মীয় বিশ্বাস, ইতিহাস, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বাংলাদেশ-সৌদি আরবের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কয়েক দশকে এ সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হয়েছে। সৌদি আরবে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি দেশটির অর্থনীতি ও সমাজে অবদান রাখছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পাশাপাশি অর্জিত দক্ষতা ও জ্ঞানও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে দুই দেশের সম্পর্ক এখন গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বলে উল্লেখ করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তার ভাষ্য, সম্পর্ক আরও গভীর করা উচিত কি না, সেই প্রশ্ন এখন মুখ্য নয়। বরং এই সম্পর্ককে কত দূর এগিয়ে নেয়া যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক রপ্তানি ও রেমিট্যান্স দুই দেশের সম্পর্কের প্রধান ভিত্তি। এই ভিত্তির গুরুত্ব থাকলেও তা সম্পর্কের সর্বোচ্চ সীমা হতে পারে না। এখন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বের পরিসর বাড়াতে হবে।
সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ দেশটির অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনছে। এ পরিকল্পনায় অর্থনীতির বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশও অর্থনৈতিক রূপান্তরের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। ফলে দুই দেশের স্বার্থে মিল রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেন, ‘সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বিনিয়োগ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, বন্দর, সরবরাহব্যবস্থা, কৃষি, মৎস্য, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।’
অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোতে যৌথ বিনিয়োগ ও অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য বিনিয়োগ তহবিল গঠনের বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে বিনিয়োগ আকর্ষণে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। এজন্য স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিমালা, অপ্রয়োজনীয় বাধা কমানো, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত নেয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব বাজেট দিয়েছে। বিনিয়োগের লক্ষ্য শুধু পুঁজি আনা নয়; বরং এমন উৎপাদনশীল বিনিয়োগ নিশ্চিত করা, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, প্রযুক্তি হস্তান্তরে সহায়তা করবে এবং দেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াবে।’
সৌদি আরবের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের সুনাম রয়েছে উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘ভবিষ্যতে এ বাজারে আরও দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মীর চাহিদা বাড়বে। নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, আতিথেয়তা, প্রকৌশল, সরবরাহব্যবস্থা, ডিজিটাল সেবা ও উন্নত প্রযুক্তির মতো খাতে সনদপ্রাপ্ত পেশাজীবীদের প্রয়োজন হবে।’
তাই শুধু শ্রমিক পাঠানোর পরিবর্তে দক্ষ ও পেশাদার কর্মী তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য দুই দেশের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার সনদ যেন সৌদি আরবের শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তার মতে, এতে কর্মী ও নিয়োগকর্তা উভয় পক্ষই উপকৃত হবে। একই সঙ্গে দুই দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিনিময় দুই দেশের অংশীদারত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। সৌদি আরব প্রযুক্তি ও নতুন শিল্প খাতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের রয়েছে তরুণ ও ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল কর্মশক্তি। এই দুই সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।’
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থিত। দুই দেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বন্দর, নৌপরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা, বিমান চলাচল ও পণ্য পরিবহনে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের বন্দর ও সরবরাহব্যবস্থায় বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ এ সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। এসব ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের কল্যাণ, মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষা সরকারের অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছেন হুমায়ুন কবির। শ্রমিক নিয়োগব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মী ও নিয়োগকর্তাদের স্বার্থ রক্ষায় সৌদি আরবের সহযোগিতাকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশি কর্মীদের শুধু শ্রমের উৎস হিসেবে নয়, উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দুই দেশের বেসরকারি খাত, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও তরুণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির মতো ক্ষেত্রেও দুই দেশের স্বার্থের মিল বাড়ছে।’
হুমায়ুন কবিরের মতে, দুই দেশের সম্পর্কের অগ্রগতি শুধু কতজন কর্মী পাঠানো হচ্ছে বা কত বাণিজ্য হচ্ছে, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, পণ্যের বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তির বিস্তার এবং অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্ব জোরদারের মাধ্যমে সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে হবে।
সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নেয়া সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তার ভাষ্য, দুই দেশের মধ্যে সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শক্তিশালী অংশীদারত্ব রয়েছে। প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়েও ইতিবাচক আলোচনা চলছে।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে এবং দুই দেশের স্বার্থের মিল থাকলে বাংলাদেশ বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখবে।
মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মক্কা ও মদিনা যে অঞ্চলে অবস্থিত, সেখানে অসংখ্য মুসলমানের বসবাস। মুসলিম দেশগুলোর জন্য মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের বিশ্বব্যাপী কার্যক্রমে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।’
মক্কা চুক্তির উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখার যথেষ্ট কারণ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। চুক্তিতে যোগ দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের কথাও জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে আমন্ত্রণ বা জবাব এসেছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ প্রশ্নের উত্তর আগেই দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার—পবিত্র মক্কা ও মদিনার বিষয়ে কোনো আপস নেই।’
বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘সৌদি আরবের যুবরাজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেশটি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। শিগগিরই কোনো এক সময়ে তিনি সৌদি আরব সফরে যেতে পারেন।’
একইভাবে সৌদি যুবরাজেরও বাংলাদেশ সফরের আগ্রহ রয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। যুবরাজের সুবিধাজনক সময়ে তাকে স্বাগত জানাতে বাংলাদেশ প্রস্তুত।
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বাংলাদেশ সৌদি আরবের সঙ্গে সব ক্ষেত্রে বিস্তৃত অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চায়। একই সঙ্গে অন্যান্য দেশের সঙ্গেও সম্পর্কের ক্ষেত্রে নির্ভরশীলতার পরিবর্তে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্বকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।’
তার ভাষ্য, বাংলাদেশ আর অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না; সহায়তার ওপর নির্ভর করেও এগোতে চায় না। বরং বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে চায়। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ হতে চায়, যে দেশ বিশ্বের কাছে সাহায্য চাওয়ার পরিবর্তে বিশ্বের সঙ্গে ব্যবসা করবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে গড়ে ওঠা আস্থার সম্পর্ককে দূরদর্শী পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করতে হবে। শ্রমিকনির্ভর সম্পর্ক থেকে মানবসম্পদ, রেমিট্যান্স থেকে বিনিয়োগ এবং প্রচলিত সহযোগিতা থেকে উদ্ভাবননির্ভর অংশীদারত্বে যেতে চায় বাংলাদেশ।’ এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে দুই দেশ দ্রুতগতিতে কাজ করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

