বিএনপি সরকারের এক মাস, কী বার্তা পাওয়া গেল

বুধবার,

১৮ মার্চ ২০২৬,

৪ চৈত্র ১৪৩২

বুধবার,

১৮ মার্চ ২০২৬,

৪ চৈত্র ১৪৩২

Radio Today News

বিএনপি সরকারের এক মাস, কী বার্তা পাওয়া গেল

রেডিওটুডে রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১৪:২৩, ১৮ মার্চ ২০২৬

Google News
বিএনপি সরকারের এক মাস, কী বার্তা পাওয়া গেল

বাংলাদেশে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের এক মাস পূর্ণ হয়েছে। ফলে এই এক মাসে সরকারের দিক থেকে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বা যেসব পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে তা কী বার্তা দিচ্ছে- এই আলোচনাও হচ্ছে রাজনৈতিক মহলে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ফ্যামিলি কার্ড কিংবা খাল খনন কর্মসূচি শুরুর মাধ্যমে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়গুলো যেমন আলোচনায় এসেছে, তেমনি দলের সমর্থক এক ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ নিয়ে সমালোচনাও আছে।

নির্বাচনের আগে থেকেই চাঁদাবাজির অভিযোগে প্রতিপক্ষের দিক থেকে তীব্রভাবে সমালোচনার মুখে থাকা বিএনপি সরকারের গঠনের পরেও এটিকে কতটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে সেই প্রশ্নও আছে। সমালোচনা হয়েছে লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনারকে প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া নিয়েও।

এছাড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে সিটি কর্পোরেশন ও ৪২ জেলায় দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আগের মতো দলের সমর্থক শিক্ষকদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া।

সরকারের দিক থেকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সরকারের প্রথম ২৮ দিনের ২৮ পদক্ষেপ প্রকাশ করে একে 'এক অভূতপূর্ব কর্মযজ্ঞ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার দাবি এসব পদক্ষেপ 'সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধের প্রতিটি অঙ্গনকে আলোকিত করেছে'।

প্রসঙ্গত, গত ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এরপর ১৭ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ গ্রহণ করে।

এর আগে ২০২৪ সালের অগাস্টে গণআন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

নির্বাচনের আগে গত বছরের ২৫শে ডিসেম্বর ঢাকায় ফিরেছিলেন প্রায় সতের বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা তারেক রহমান।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের সূচনা ও অর্থনীতি

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের শীতল সম্পর্কের উত্তরণ কিভাবে হবে তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল নানা মহলে।

যদিও নতুন সরকারের শুরুতেই সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা।

আবার নির্বাচনের পরদিন তারেক রহমানকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ফোনালাপের পর মি. রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের যোগদান এবং এরপর ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনারের তৎপরতায় অনেকেই মনে করছেন সরকার ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়ার সূচনা করতে পেরেছে।

এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শিগগিরই দু দেশের মধ্যে ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক হবার আশা করছেন অনেকে।

পাশাপাশি সরকারের দিক থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের 'সবার আগে বাংলাদেশ' নীতি বাস্তবায়নে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

দায়িত্ব গ্রহণের দিন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ভারতে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, 'সব দেশের সঙ্গেই আমাদের চ্যালেঞ্জ আছে, আমাদের ইস্যু রয়েছে। সেই ইস্যুগুলো সমাধানে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয়ভাবে আমাদের এগোতে হবে। আমাদের স্বার্থ বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থকে সুরক্ষিত করা।'

তিনি তখন আরও বলেছিলেন, "গণতান্ত্রিক সরকারের পররাষ্ট্রনীতি যে রকম হওয়া উচিত, বাংলাদেশের মেরুদণ্ড সোজা করে, বাংলাদেশ সকল দেশের সঙ্গে, সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে, কথা বলবে ও বন্ধুত্ব রাখবে"।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে করা চুক্তির বিষয়টি নতুন সরকার কিভাবে সামাল দিবে তা এখনো অনেকের কাছে পরিষ্কার নয়।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলছেন, সরকারের যাত্রা ইতিবাচক হয়েছে কিন্তু সামনে গঙ্গা চুক্তি নবায়ন, ভারতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ব্যবসার কি হবে, পুশ ইন ইস্যু এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ট্যারিফ চুক্তির চ্যালেঞ্জ নিয়ে সরকার কী করে সেগুলো ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের গতি প্রকৃতি নির্ধারণ করবে।

"ভারত ইস্যুতে বাংলাদেশের দিক থেকে কিছু উদ্যোগ দেখছি। বাংলাদেশ ভিসা দেওয়া শুরু করেছে। দু দেশের মধ্যে বাস যোগাযোগ শুরু হয়েছে। এগুলো সম্পর্ক শুরুর ক্ষেত্রে ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে জুলাই পরবর্তী সময়ে আত্মমর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার প্রত্যাশা আছে জনমনে। হয়তো সরকারের 'সবার আগে বাংলাদেশ' নীতিই হতে পারে সেই প্রত্যাশার ভিত্তি," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

ওদিকে তারেক রহমানের সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া চার জন রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করার বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আর সমালোচনা হয়েছে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনার আবিদা ইসলামকে প্রত্যাহার প্রক্রিয়া নিয়ে।

কমনওয়েলথের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে লন্ডনে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বিমানবন্দরে দাড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর 'সুখবর' হিসেবে আবিদা ইসলামকে প্রত্যাহারের কথা জানান। এ নিয়ে পররাষ্ট্র দফতরের পেশাদার কূটনীতিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার খবর এসেছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে।

"যেভাবে লন্ডনে হাইকমিশনারকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং তাকে হেয় করা হয়েছে তাতে পেশাদারিত্বের ছোঁয়া থাকেনি। এ ধরনের ঘটনা দেশের পেশাদার কূটনীতিকদের নিরুৎসাহিত করতে পারে," বলছিলেন মি. কবির।
, আইন শৃঙ্খলা ও অন্য ইস্যু

সরকার ১১টি সিটি কর্পোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদের দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ স্বায়ত্ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়তে ৭৩র অধ্যাদেশ না মেনে দলীয় শিক্ষকদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের উপাচার্য নিয়োগ পেয়েছে সরকারি আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়েও।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, দলীয়করণের কারণেই স্থানীয় সরকারগুলো ধ্বংস হয়েছে এবং এই সরকারও সেখানে নির্বাচন না করে প্রশাসক বসিয়েছে।

"সাময়িক সময়ের জন্য প্রশাসক দিলেও একই সঙ্গে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা উচিত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও নীতিমালা অনুসরণ না করে উপাচার্য নিয়োগ আগের সংস্কৃতিরই ধারাবাহিকতা। স্কুলের ভর্তির জন্য লটারির পরিবর্তে ভর্তি পরীক্ষা চালুর কারণে কোচিং বাণিজ্য, ঘুষ ও তদবির বাড়বে। তবে সরকার কিছু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নও শুরু করেছে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

অন্তর্বর্তী সরকারে সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে 'মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার' শুরু হয়েছিল। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওই ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও প্রশাসনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে সরকার। নতুন আইজিপি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে উভয় প্রশাসন ঢেলে সাজানোর কাজ চলছে বলে সরকার জানিয়েছে।

আবার অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংবিধান সংস্কার করার জন্য জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ জারি করা হয়েছিল। ওই আদেশ অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনের সাথে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে।

ওই আদেশ অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সাথে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা থাকলেও বিএনপি সদস্যরা সেই শপথ নেননি। যদিও জামায়াত জোটের সদস্যরা সেই শপথ নিয়েছেন।

জাতীয় সংসদের অধিবেশনও শুরু হয়েছে এবং সেই অধিবেশনের প্রথম দিন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন করা হয়েছে।

তবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার জন্য শেষ দিন ছিল গত ১৫ই মার্চ। সেদিনই সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করেছিলেন।

জবাবে সরকারের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ করতে হলে আগে সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করতে হবে ।

কিন্তু সেটি সংসদের চলতি অধিবেশন কিংবা এর পরবর্তী অধিবেশনেও করা সম্ভব হবে কি-না তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন।

ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী গণভোট হলেও সরকারি দল বিএনপির অনড় অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত সংবিধান সংস্কার পরিষদ না করে সংসদেই সংবিধান সংশোধন করার ইস্যুটির আপাতত অবসান ঘটেছে বলেই অনেকের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা কেউ কেউ মনে করছেন, সরকারের সামনে আগামী দিনে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে 'আওয়ামী লীগ'। দলটির কার্যক্রম নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার, ফলে তাদের ছাড়াই এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

তাদের মতে, এখন দেখার বিষয় হবে আওয়ামী লীগ রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে তারেক রহমানের সরকার কখন কি সিদ্ধান্ত নেন সেটি।

একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে সরিয়ে দেওয়া বা ওই পদে পরিবর্তন আনা হবে কি-না তা নিয়েও কৌতূহল রয়েছে রাজনৈতিক মহলে। দলের নেতারা আভাস দিয়েছেন যে, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি।

মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, আগের মতোই সংসদে যদি সরকারি দলের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয় তা হলে সেটি গণতন্ত্রকে হুমকিতে ফেলবে। সূত্র: বিবিসি বাংলা

রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের