আগামী বছরের হজের নিবন্ধনের সময় আরও এগিয়ে এনেছে সৌদি আরব। ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০২৭ সালের হজের জন্য বাংলাদেশি হজযাত্রীদের নিবন্ধন শেষ করতে হবে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। চলতি বছরের তুলনায় যা শেষ হবে ১৬ দিন আগে। একই সঙ্গে আবাসন, তাঁবু বুকিং, সেবা প্যাকেজ চূড়ান্ত করা ও অর্থ স্থানান্তরসহ অধিকাংশ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে হজের কয়েক মাস আগেই।
এ অবস্থায় নতুন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তাল মেলাতে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত, নিবন্ধনের লক্ষ্য পূরণ হবে কি না এবং হজের খরচ কমানোর সরকারি প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন হবে— তা নিয়েই শুরু হয়েছে আলোচনা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময়মতো সিদ্ধান্ত ও আগাম নিবন্ধন নিশ্চিত করতে না পারলে আগামী হজ মৌসুমে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ।
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী বছরের ১৫ মে সৌদি আরবে হজ অনুষ্ঠিত হবে। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় হিজরি ১৪৪৮/২০২৭ খ্রিষ্টাব্দের হজ উপলক্ষে বিস্তারিত সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে। গত ৭ জুন জারি করা রোডম্যাপে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী দেশের সব সরকারি-বেসরকারি অংশীজনকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।
রোডম্যাপ অনুযায়ী, আগামী ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে হজযাত্রী নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। যদিও চলতি বছর হজযাত্রী নিবন্ধনের শেষ সময় ছিল ১২ অক্টোবর।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী হজ মৌসুমে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত সংখ্যক হজযাত্রী নিবন্ধন নিশ্চিত করা।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হজ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আয়াতুল ইসলাম বলেন, পুরো প্রক্রিয়ায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং সৌদি আরবের নতুন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতেই আগেভাগে নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
সৌদি আরব এখন পুরো হজ ব্যবস্থাপনা অনলাইন ও কম্পিউটারাইজড সিস্টেমের আওতায় নিয়ে এসেছে। তারা আগে থেকেই সবকিছু গুছিয়ে নিতে চায়। সময়মতো প্রস্তুতি না হলে তাদের যেমন সমস্যা হয়, আমাদেরও হয়। তাই আগেভাগে নিবন্ধন সম্পন্ন করা সবার জন্যই সুবিধাজনক।— ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আয়াতুল ইসলাম
তিনি বলেন, সৌদি আরব এখন পুরো হজ ব্যবস্থাপনা অনলাইন ও কম্পিউটারাইজড সিস্টেমের আওতায় নিয়ে এসেছে। তারা আগে থেকেই সবকিছু গুছিয়ে নিতে চায়। সময়মতো প্রস্তুতি না হলে তাদের যেমন সমস্যা হয়, আমাদেরও হয়। তাই আগেভাগে নিবন্ধন সম্পন্ন করা সবার জন্যই সুবিধাজনক।
আয়াতুল ইসলাম আরও বলেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত ও বেশি সংখ্যক নিবন্ধন নিশ্চিত করা। নিবন্ধনই আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। আগামী কয়েক মাসে যত বেশি নিবন্ধন নিশ্চিত করা যাবে, তত সহজ হবে পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করা।
হজযাত্রীদের মধ্যে আগাম নিবন্ধনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে জানিয়ে আয়াতুল ইসলাম বলেন, মানুষকে আরও বেশি করে সচেতন করতে হবে। বাড়াতে হবে প্রচার-প্রচারণা। গণমাধ্যম এবং হজ এজেন্সিগুলো একসঙ্গে কাজ করলে মানুষ আগেভাগেই নিবন্ধন সম্পন্ন করবে বলে আশা করছি।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ৮৭ হাজারের বেশি হজযাত্রী হজ পালন করেন। তবে সময়সূচি এগিয়ে আনা এবং নানান কারণে ২০২৬ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে ৭৮ হাজার ৫০০ জনে। চলতি বছর সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ পালন করেছেন ৪ হাজার ৫৬৫ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭৩ হাজার ৯৩৫ জন।
অতিরিক্ত সচিব আয়াতুল ইসলাম বলেন, আগামী বছর হজযাত্রীর সংখ্যা কিছুটা কমতেও পারে, আবার বাড়তেও পারে। এটি পুরোপুরি নিবন্ধনের ওপর নির্ভর করবে। কাউকে জোর করে হজে পাঠানো যায় না। যারা নিবন্ধন করবেন, তারাই যেতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, গত বছরও যদি আরও কয়েক হাজার মানুষ নিবন্ধন করতেন, তাদের পাঠানোর সুযোগ ছিল।
কোটা নিয়ে কী ভাবছে সরকার?
হজ কোটা নিয়ে নানান আলোচনা থাকলেও এ মুহূর্তে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আয়াতুল ইসলাম বলেন, ২০২৭ সালের হজের জন্য কোটা নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক নতুন কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। আপাতত আগের ব্যবস্থাই বহাল রয়েছে। কোটা কমানো বা বাড়ানো নিয়ে এ মুহূর্তে কোনো সিদ্ধান্ত নেই।
এ বিষয়ে হাবের মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদার বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় এক লাখ ২৭ হাজার হজযাত্রীর কোটা পেয়ে থাকে। তবে চূড়ান্ত দ্বিপাক্ষিক হজ চুক্তির সময়ই বিষয়টি আনুষ্ঠানিক নির্ধারিত হবে।
সৌদির নতুন নীতিমালায় বদলাতে হবে ব্যবস্থাপনা
হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদার মনে করেন, সৌদি আরবের নতুন নীতিমালার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অভ্যস্ত। অনেকেই মনে করেন পরে করলেও হজে যাওয়া যাবে। তবে নতুন ব্যবস্থায় সেই সুযোগ থাকবে না। তাই সময়মতো নিবন্ধন ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।
হজের খরচ কেমন হবে এবার?
আগামী বছরের হজ নিয়ে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় আগ্রহের জায়গা খরচ। তবে সৌদি প্রান্তের খরচ অপরিবর্তিত থাকলে ও সরকারের প্রতিশ্রুতি বিবেচনায় নিলে এবার হজের খরচ কমছে এটা মোটামুটি নিশ্চিত বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ১৭ এপ্রিল চলতি বছরের হজ ফ্লাইট উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, চলতি বছর হজ ব্যয় কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে এবং আগামী বছর আরও কম খরচে মানুষকে হজে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নির্ধারিত সময়ে যেসব কাজ শেষ করতে হবে
সৌদি আরবের রোডম্যাপ অনুযায়ী, আগামী ৩০ জুন থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত মক্কা ও মদিনার আবাসনের তথ্য নুসুক মাসার সিস্টেমে এন্ট্রি করতে হবে। একই সময়ের মধ্যে ২০২৭ সালের হজ মৌসুমের কর্মপরিকল্পনাও জমা দিতে হবে। ১৫ জুলাই থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত নুসুক মাসারের ই-ওয়ালেটে অর্থ স্থানান্তর, এয়ারলাইন্স নির্বাচন, কোটা বণ্টনসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।
লাব্বাইক অ্যাপে প্রাক-নিবন্ধন সেবা চালু
সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য ‘লাব্বাইক’ মোবাইল অ্যাপে প্রাক-নিবন্ধন সেবা চালু করেছে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। ফলে এখন থেকে হজযাত্রীরা ঘরে বসেই অনলাইনে সরকারি মাধ্যমে হজের প্রাক-নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পারবেন।
এক বিজ্ঞপ্তিতে ধর্ম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হজযাত্রীদের নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হজযাত্রা সহজ, মসৃণ ও নিরাপদ করতে এবং বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘লাব্বাইক’ মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়।
মন্ত্রণালয় জানায়, অ্যাপটিতে বিভিন্ন সেবার পাশাপাশি সরকারি মাধ্যমের হজযাত্রীদের জন্য প্রাক-নিবন্ধন সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। এটি ই-হজ ব্যবস্থাপনা সিস্টেমের একটি সমন্বিত (ইন্টিগ্রেটেড) প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।
ধর্ম মন্ত্রণালয় সম্প্রতি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রাক-নিবন্ধন ও নিবন্ধন সংশ্লিষ্ট নির্ধারিত ব্যাংক হিসাব রিকনসিলেশনের লক্ষ্যে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত হজের প্রাক-নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। গত ১৪ জুন থেকে প্রাক নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

