দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের বহুল প্রত্যাশিত ঢাকা-ভাঙ্গা-যশোর রেলপথ চালুর পর যোগাযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। প্রায় ৩৮ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেগাপ্রকল্প এখন নিরাপত্তাহীনতার কারণে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বিশেষ করে মাদারীপুরের শিবচর অংশে রেলওয়ের সিগন্যালিংব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরি হয়ে যাচ্ছে। এতে কম্পিউটারনির্ভর স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে বাধ্য হয়ে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ট্রেন চালানো হচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রের কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতির পাশাপাশি বিঘ্নিত হচ্ছে ট্রেন চলাচল এবং বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।
জানা গেছে, বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-ভাঙ্গা রেলপথটি ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর চালু হয়। চালুর পর থেকে প্রতিদিন হাজারো যাত্রী এই পথে যাতায়াত করছে। তবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাবে ব্যয়বহুল এই রেলপথ এখন সংঘবদ্ধ চোরচক্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ সহজ হলেও একের পর এক সিগন্যালিংব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ও কেবল চুরির ঘটনায় বিঘ্নিত হচ্ছে ট্রেন পরিচালনা এবং বাড়ছে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।
শিবচর রেলওয়ে স্টেশনের তথ্য অনুযায়ী, এই স্টেশনের উত্তর প্রান্তে থাকা ১৩টি ট্র্যাক পটের মধ্যে ইতোমধ্যে ৯টি চুরি হয়ে গেছে। গত মধ্যরাতেও ট্র্যাক পট চুরি হয়। এর আগে গত ১৯ জুন রাতে পদ্মা রেলওয়ে স্টেশনের সিগন্যাল পয়েন্ট থেকে কয়েকটি ট্র্যাক পট খুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এরও আগে ৯ জুন একই স্টেশনের শিবচর প্রান্তের সব ট্র্যাক পট চুরি হয় এবং ১৮ মার্চও একই ধরনের ঘটনায় স্টেশনটির সিগন্যালব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে ওই অংশের স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
এখন ট্রেনগুলোকে হোম সিগন্যালের কাছে এসে ম্যানুয়াল সিগন্যালের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। এতে ট্রেন চলাচলে বিলম্বের পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ছে।
চুরি হওয়া সরঞ্জামের তালিকায় রয়েছে ট্র্যাক পট, ট্র্যাক ট্রান্সফরমার, সিগন্যাল কেবল, গার্ড রেলের স্ক্রু স্পাইক, অ্যাক্সেল কাউন্টার, পয়েন্ট মেশিন, স্টিল গ্রেটিং, হ্যান্ডরেল, বৈদ্যুতিক কেবল, ডিস্ট্রিবিউশন বোর্ড, ফিশ বোল্ট, ফিশ প্লেট, ইলাস্টিক রেল ক্লিপ, গেজ প্লেটসহ মূল্যবান বহু যন্ত্রাংশ।
রেলওয়ের কয়েকজন কর্মী জানান, ২০২৪ সালেও স্টেশন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা তুলনামূলক ভালো ছিল। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতায় গভীর রাতে আড্ডা বা সন্দেহজনক চলাচল কম ছিল। কিন্তু বর্তমানে স্টেশনের আশপাশে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আড্ডা, সন্দেহজনক ব্যক্তিদের আনাগোনা এবং মাদকসেবীদের উপস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। রেলকর্মীরা তাদের সরিয়ে দিতে বা সতর্ক করতে গেলে অনেকেই কথা শোনেন না, বরং উল্টো অসদাচরণ করেন। এখন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও এলাকাবাসী সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নিলে রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি ও নাশকতা অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
শিবচরের বন্দরখোলা এলাকার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, রেললাইনের আশপাশে গভীর রাত পর্যন্ত অনেকের অযথা আড্ডা ও সন্দেহজনক চলাফেরা দেখা যায়। এসব নিয়ন্ত্রণে না আনলে যন্ত্রাংশ চুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে না। রেলপথ এলাকায় অহেতুক ঘোরাঘুরি ও আড্ডা বন্ধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং নিয়মিত টহল নিশ্চিত করতে হবে।
সোহেল মোল্লা নামের এক যাত্রী বলেন, দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নিলে কোনো লাভ হবে না। আজ যন্ত্রাংশ চুরি হচ্ছে, কাল যদি ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে, তার দায় কে নেবে? যাত্রীদের জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে রেলপথজুড়ে স্থায়ী নিরাপত্তা, নিয়মিত টহল ও চোরচক্রের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালানো এখনই শুরু করা উচিত।
পদ্মা রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, সিগন্যালিং ব্যবস্থার ট্র্যাক পটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চুরি দিন দিন বাড়ছে। প্রতিটি চুরির ঘটনার পর ট্রেন পরিচালনায় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
ভাঙ্গা রেলওয়ে পুলিশের পরিদর্শক শাহজালাল বলেন, যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনায় আগেও মামলা হয়েছে এবং কয়েকজন চোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভাঙ্গা জংশন থেকে শিবচর ও পদ্মা স্টেশনের দূরত্ব বেশি হওয়ায় নিয়মিত টহলে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে চুরি প্রতিরোধে টহল আরো জোরদার করা হবে।
শিবচর রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার মো. কামরুল ইসলাম বলেন, সিগন্যালব্যবস্থা অচল হয়ে গেলে বাধ্য হয়ে ‘লুক স্টিক’ ব্যবহার করে পেপার লাইন ক্লিয়ার পদ্ধতিতে ট্রেন পরিচালনা করতে হয়। ট্রেনগুলোকে হোম সিগন্যালের কাছে এসে ম্যানুয়াল সিগন্যালের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। এতে সময় বেশি লাগে এবং রেলকর্মীদের রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়। সামান্য অসাবধানতাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
তিনি আরো বলেন, আগে এ ধরনের চুরির ঘটনা খুব একটা ছিল না। কিন্তু এখন ট্র্যাক পটসহ সিগন্যালিংব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ বারবার চুরি হচ্ছে। আমরা মেরামত বা নতুন যন্ত্রাংশ লাগানোর কিছুদিনের মধ্যেই আবার সেগুলো চুরি হয়ে যায়। এতে ট্রেন নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না। আগের মতো নিয়মিত পুলিশ টহলও নেই।
তিনি উল্লেখ করেন, এভাবে চলতে থাকলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা, নিয়মিত টহল এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন। সবাই সচেতন হলে রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

