‘ফুফু, কুরবানির ঈদে বাড়ি আসব। ভালো একটা ঘর করে বিয়ে করব। তোমরা মেয়ে দেখে রেখ।’ মালয়েশিয়া যাওয়ার চার বছর পর দেশে ফেরার স্বপ্ন দেখেছিলেন শরিফুল ফকির (৩৫)। বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতেও বলেছিলেন স্বজনদের। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই মাটি চাপায় প্রাণ গেল তাঁর।
সোমবার বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মালয়েশিয়ায় মাটি কাটার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে। শরিফুল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বর্ণি ইউনিয়নের বর্ণি গ্রামের নজরুল ফকিরের ছেলে। তাঁর মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছানোর পর পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
শরিফুলের ফুফু বিলকিস বেগম বলেন, ‘মারা যাওয়ার আগের রাতেও শরিফুলের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। বলেছে, ফুফু, কুরবানির ঈদে বাড়ি আসব, ভালো একটা ঘর করে বিয়ে করব। তোমরা মেয়ে দেখে রেখো। আমি বলেছি, তুই দেশে আয়, তারপর তোকে নিয়ে মেয়ে দেখতে যাব। কিন্তু কিছুই হলো না। পরদিন সকাল ১০টার দিকে শুনি, আমাদের শরিফুল আর নেই।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ছেলেটা খুব হাসিখুশি থাকত, সবাইকে সম্মান করত। ও আর আমাকে ফোন দিয়ে ফুফু বলে ডাকবে না।’
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে প্রায় চার বছর আগে শ্রমিক হিসেবে মালয়েশিয়ায় যান শরিফুল। নিজের খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে তিনি বাড়িতে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পাঠাতেন। তাঁর পাঠানো অর্থেই চলত পরিবারের সংসার।
শরিফুলের মা নাসি বেগম (৫৫) বলেন, ‘শরিফুল দেশে এসে সবার সঙ্গে কুরবানির ঈদ করতে চেয়েছিল। ভেবেছিলাম, দেশে ফিরলে ছেলেকে বিয়ে দেব। এ জন্য ঘর গোছানোর অনেক কাজও করেছি। কিন্তু ওর আর ঈদ করা হলো না, বিয়েও হলো না। মৃত্যু যে এভাবে হবে, কখনও ভাবিনি।’
প্রতিবেশীরা জানান, নজরুল ফকিরের চার সন্তানের মধ্যে শরিফুল ছিলেন তৃতীয়। তাঁর আরেক ছেলে আশরাফুল সাত বছর আগে মারা যান। বড় ছেলে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। ছোট ছেলে বাড়ির গরু-বাছুর দেখাশোনা করেন। ফলে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন শরিফুল।
নিহতের বাবা নজরুল ফকির বলেন, মালয়েশিয়ায় ড্রেন নির্মাণের জন্য মাটি কেটে দুই পাশে রাখা হয়েছিল। কাজের সময় ড্রেনের মধ্যে নামার বা মাটি ধরে দাঁড়ানোর একপর্যায়ে তাঁর ছেলের ওপর মাটি ধসে পড়ে। অন্য শ্রমিকরা উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই শরিফুল মারা যান। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে দ্রুত দেশে এনে দেন। শেষবারের মতো ছেলেটাকে দেখতে চাই।’
শরিফুলের ছোট ভাই শিপুল ফকির বলেন, ‘ভাইয়ের অনেক স্বপ্ন ছিল। পরিবারের উন্নতি করবে, ঘরবাড়ি ঠিকঠাক করবে, বিয়ে করবে। রোববারও ফোনে বলেছে, আগামী কুরবানির ঈদে বাড়ি এসে সবার সঙ্গে ঈদ করবে। এরপর বিয়ে করবে। সে জন্য আমাদের মেয়ে দেখতে বলেছিল। কিন্তু কোনো স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই সব শেষ হয়ে গেল। আমরা ভাইয়ের মুখটা শেষবার দেখতে চাই।’
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

