বাংলাদেশে নতুন সরকারের সামনে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে

রোববার,

০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬,

১৯ মাঘ ১৪৩২

রোববার,

০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬,

১৯ মাঘ ১৪৩২

Radio Today News

সতর্কবার্তা আইএমএফের

বাংলাদেশে নতুন সরকারের সামনে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে

রেডিওটুডে রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১০:১৭, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

Google News
বাংলাদেশে নতুন সরকারের সামনে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল মূলত বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত জনঅসন্তোষের ফল। এ অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে ও সংস্কার সূচি এগিয়ে নিতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখা গেলেও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকারের সামনে কাঠামো ও নীতিগত অনেক বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। 

আইএমএফের ২০২৫ সালের আর্টিকেল-ফোর (সদস্য দেশ পর্যালোচনা) কান্ট্রি স্টাফ রিপোর্টে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা, ঝুঁকির উৎস এবং দুর্বল খাতগুলোর সার্বিক চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, সংস্কার ত্বরান্বিত না হলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ব্যাহত হবে। মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক খাতের চাপ দীর্ঘায়িত হতে পারে। আইএমএফ বলেছে, নতুন সরকারের প্রথম ১২ থেকে ১৮ মাস হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। 

এই সময়েই রাজস্ব, ব্যাংকিং, বিনিময় হার, মুদ্রানীতি এবং শাসনব্যবস্থায় ধারাবাহিক ও দৃঢ় সংস্কার না হলে স্থায়ী পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশের সামনে এখনও প্রবৃদ্ধির বড় সুযোগ রয়েছে– এমনটাও মনে করছে আইএমএফ। তবে বলেছে, সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি ঝুঁকিগুলো আরও বড়। বৈষম্য ও বঞ্চনার যে ক্ষত ২০২৪ সালে বিস্ফোরণ হয়েছিল, তা সারাতে এবং অর্থনীতিকে টেকসই পথে ফেরাতে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নীতিগত শৃঙ্খলার বিকল্প নেই। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুসারে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে ধীরে ধীরে তা ৬ শতাংশে যেতে পারে। অবশ্য এটি সংস্কার বাস্তবায়নের গতি ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নির্ভর করবে। 

কান্ট্রি স্টাফ রিপোর্টে যেসব মূল চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম বৈষম্য ও অন্তর্ভুক্তির সংকট। আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বাধার সঙ্গে অর্থনৈতিক সুযোগের বৈষম্য দ্রুত বাড়ছিল। এসব কারণে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবার ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতি ও বাজার অস্থিরতার চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে। এ ক্ষেত্রে আইএমএফের পরামর্শ, সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় পুনর্গঠন করে সত্যিকারের দরিদ্রদের কাছে পৌঁছানো। ভর্তুকি খাতে অপচয় ও অকার্যকারিতা কমিয়ে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা সম্প্রসারণ করতে হবে। নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।

রাজস্ব আহরণে বড় দুর্বলতা 
আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের ব্যয় মেটাতে এবং উন্নয়নমূলক কাজের জন্য রাজস্ব আদায় বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। এ জন্য ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার নির্ধারণ, কর ব্যবস্থা সহজীকরণ এবং তামাক ও আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর আবগারি শুল্ক বাড়ানোর মতো সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে। 

আইএমএফ বলেছে, রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সামষ্টিক-আর্থিক স্থিতিশীলতায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এ দুর্বলতা। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বড় অঙ্কের সম্ভাব্য কর আদায় হারাচ্ছে সরকার। এ অবস্থা থেকে বের হতে কর কাঠামো সরলীকরণ এবং ভ্যাট ও আয়কর ব্যবস্থার আধুনিকায়নের কথা বলেছে। রাজস্ব বোর্ডের প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো, ভর্তুকি যুক্তিকরণ এবং অগ্রাধিকারহীন ব্যয় সংকোচন করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ খাতের লোকসান কমাতে এবং আর্থিক ঝুঁকি এড়াতে জ্বালানি ভর্তুকি যৌক্তিক পর্যায়ে আনা এবং বিদ্যুৎ শুল্ক সমন্বয়ের জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরি করা আবশ্যক।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার
আইএমএফ বলেছে, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে একটি বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রায়ত্ত ও পদ্ধতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণমান পর্যালোচনা করা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণ করা উচিত। এ ছাড়া পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধার এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতিবিরোধী ফ্রেমওয়ার্ক শক্তিশালী করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে,  ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান ঝুঁকিতে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি গভীর। বড় অঙ্কের অনাদায়ী ঋণ (খেলাপি) আর্থিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তাছাড়া ব্যাংক পুনর্গঠনের উচ্চপর্যায়ের কৌশল এখনও অনুমোদন পায়নি।

এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আইএমএফের পরামর্শ হলো– সব ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান মূল্যায়ন বাধ্যতামূলকভাবে সম্পন্ন করা। যেসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি রয়েছে, তাদের জন্য শক্তিশালী পুনর্গঠন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। ব্যাংক পরিচালনায় সংস্কার ও ব্যবস্থাপনা জবাবদিহি নিশ্চিত করা। দুর্বল ব্যাংকে নির্বিচার তারল্য সরবরাহ বন্ধ করা। 

সংস্থাটি বলেছে, দুর্নীতি ও অনিয়ম বিনিয়োগ পরিবেশকে দুর্বল করছে। আর্থিক খাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তদারকিতে স্বচ্ছতার অভাব আছে। এ ক্ষেত্রে পরামর্শ হলো– দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগ জোরদার করা।  আর্থিক খাতের নীতি-তদারকি পদ্ধতির সংস্কার এবং  মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ। 

মুদ্রানীতি সংকোচনমূলক রাখার পরামর্শ 
‘মূল্যস্ফীতি জনগণের ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয় করছে’– এমন মতামত দেওয়া হয়েছে আইএমএফের প্রতিবেদনে।  বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ পর্যায়ে আছে; যা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে নিম্ন আয়ের মানুষকে। 

এ অবস্থা থেকে উত্তরণে আগের মতো কঠোর, অর্থাৎ সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। বাজারভিত্তিক সুদের হার নির্ধারণ ও নীতিহারকে কার্যকর করা, পণ্যবাজারে প্রতিযোগিতা ও সরবরাহ-ব্যবস্থা শক্তিশালী করারও পরামর্শ দিয়েছে এ সংস্থা।
পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বিনিময় হারকে আরও নমনীয় এবং বাজার পরিচালনা স্বচ্ছ করা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনের পরিকল্পনা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা ও বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে প্রয়োজন ছাড়া হস্তক্ষেপ কমানোর পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ।

ব্যয় সংকোচনের সুপারিশ 
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে সরকারকে ব্যয় সংকোচনের পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। অন্তর্বর্তী সরকার মূলত অবকাঠামো, সামাজিক ও উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে বাজেট ঘাটতি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাখতে পেরেছে। দীর্ঘ মেয়াদে যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিতে পারে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়  নতুন সরকারকে ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানবসম্পদে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। এ ছাড়া সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার সুপারিশ এসেছে। শাসনব্যবস্থা ও স্বচ্ছতার ঘাটতি বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা বলে মনে করে আইএমএফ। 

নতুন কিস্তি নির্বাচনের পর 
আইএমএফের ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী তথা ষষ্ঠ কিস্তি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পাওয়া যাবে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ষষ্ঠ কিস্তি বাবদ আইএমএফের কাছ থেকে প্রায় ৮০ কোটি ডলার অর্থ পাওয়ার কথা। গত ডিসেম্বরের শেষে বা জানুয়ারির প্রথমার্ধে এ অর্থ ছাড় করার কথা ছিল। 

আইএমএফ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন করে। কিন্তু গত জুনে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি অনুমোদনের মাধ্যমে মূল ঋণের পরিমাণ ৮০ কোটি  ডলার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। মোট আট কিস্তিতে এ অর্থ পাওয়ার কথা রয়েছে। এ পর্যন্ত আইএমএফের এই ঋণ প্রোগ্রাম থেকে মোট ৩৬০ কোটি ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ।

গত নভেম্বরে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ঢাকা সফর করে আইএমএফের বাংলাদেশ মিশনের প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিওর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল। প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যালোচনা শেষে ১৩ নভেম্বর ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিনিধি দলের প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিও বলেন, ‘মিশনের সময় আমরা বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। তাদের সংস্কার এজেন্ডা, দৃষ্টিভঙ্গি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চেয়েছি।’

রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের