ইরানে বিক্ষোভের দাবানল, আহতদের ভিড়ে দিশেহারা হাসপাতালগুলো

রোববার,

১১ জানুয়ারি ২০২৬,

২৮ পৌষ ১৪৩২

রোববার,

১১ জানুয়ারি ২০২৬,

২৮ পৌষ ১৪৩২

Radio Today News

ইরানে বিক্ষোভের দাবানল, আহতদের ভিড়ে দিশেহারা হাসপাতালগুলো

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:২৯, ১০ জানুয়ারি ২০২৬

Google News
ইরানে বিক্ষোভের দাবানল, আহতদের ভিড়ে দিশেহারা হাসপাতালগুলো

ইরানে চলমান বিক্ষোভ দমনে আরও কঠোর হলো খামেনির সরকার। দেশটির কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি জারি করেছে। খামেনি সরকার জানিয়েছে, দেশকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে দেশ-বিদেশি চক্রান্তের কঠোর হাতে দমন করা হবে। এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে দু’জন চিকিৎসা কর্মকর্তা বিবিসি’কে জানিয়েছেন, তাদের হাসপাতালগুলো আহতদের ভিড়ে উপচে পড়ছে।

একজন চিকিৎসক জানান, তেহরানের একটি চক্ষু হাসপাতাল এখন 'জরুরি সংকটকালীন' অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে, অন্য একটি হাসপাতালের একজন স্বাস্থ্যকর্মী এক বার্তায় জানিয়েছেন, রোগীর চাপ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত সার্জন তাদের কাছে নেই।

শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান বড় বিপদে আছে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আপনারা গুলি চালানো শুরু না করলেই ভালো করবেন, কারণ আপনারা শুরু করলে আমরাও শুরু করব।

অন্যদিকে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো এক চিঠিতে ইরান এই বিক্ষোভের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে। ইরান একে সহিংস রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ বলে অভিহিত করেছে। তবে বিশ্বনেতারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন।

শুক্রবারও ইরানের ডজনখানেক শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলেছে। দুটি মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত ৫০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে দেশটিতে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় তথ্য যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিবিসি-কে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মাধ্যমে এক চিকিৎসক জানিয়েছেন, তেহরানের প্রধান চক্ষু বিশেষজ্ঞ কেন্দ্র ‘ফারাবি হাসপাতাল’ এখন জরুরি সংকটে।

সাধারণ অস্ত্রোপচার বন্ধ রেখে সব কর্মীদের জরুরি বিভাগ সামলানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর সিরাজের একজন স্বাস্থ্যকর্মী দাবি করেছেন, হাসপাতালে আনা অনেক আহতেরই মাথায় ও চোখে গুলির আঘাত রয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ’র তথ্যমতে, ২৮ ডিসেম্বর বিক্ষোভ শুরু হবার পর থেকে কমপক্ষে ৫০ জন বিক্ষোভকারী ও ১৫ নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে ২,৩১১ জনেরও বেশি মানুষকে। অন্যদিকে নরওয়েভিত্তিক আইএইচআরএনজিও জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা ৫১, যার মধ্যে ৯ শিশু রয়েছে।

জাতিসংঘের মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক প্রাণহানির ঘটনায় গভীর জানিয়ে বলেছেন, বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের মানুষের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করার অধিকার রয়েছে এবং তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার ও জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মারজ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ইরানি কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব তাদের জনগণের সুরক্ষা দেওয়া এবং কোনো প্রতিশোধের ভয় ছাড়াই তাদের মতপ্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শুক্রবার এক টেলিভিশন ভাষণে কঠোর মনোভাব বজায় রেখে বলেছেন, কয়েক লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ক্ষমতায় এসেছে এবং যারা এটি অস্বীকার করে, তাদের সামনে আমরা নতিস্বীকার করব না। 

তিনি বিনাশকারী শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেন। বিপরীতে, ইরানের শেষ শাহর ছেলে রেজা পাহলভি এই বিক্ষোভকে অভূতপূর্ব বলে বর্ণনা করেছেন এবং সপ্তাহান্তে আরও সুনির্দিষ্ট আন্দোলনের আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী পাহলভি এক ভিডিও বার্তায় বলেন, আমাদের লক্ষ্য এখন শুধু রাস্তায় নামা নয়, লক্ষ্য হলো শহরের কেন্দ্রগুলো দখল ও নিয়ন্ত্রণ করা তিনি দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানান।

ইরানে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত স্যার সাইমন গ্যাস অবশ্য সতর্ক করে বলেছেন, দেশটিতে বর্তমানে কোনো সংগঠিত বিরোধী নেতৃত্ব নেই যাদের চারপাশে মানুষ একত্রিত হতে পারে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, এবারের বিক্ষোভটি আগেরগুলোর চেয়ে আলাদা এবং বিস্তৃত। মূলত ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির কারণে সাধারণ মানুষের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প বলেন, তার প্রশাসন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি বলেন, মানুষ এমন কিছু শহর দখল করে নিচ্ছে যা কয়েক সপ্তাহ আগেও কেউ ভাবতে পারেনি। তিনি আবারও হুঁশিয়ারি দেন, ইরান যেখানে আঘাত করলে সবচেয়ে বেশি ব্যথা পাবে, যুক্তরাষ্ট্র সেখানেই আঘাত করবে। তবে তিনি পরিষ্কার করেছেন, এর অর্থ মার্কিন পদাতিক বাহিনী মোতায়েন নয়।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই বিক্ষোভের জন্য ইসরাইল ও ওয়াশিংটনকে দায়ী করলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তাকে বিভ্রান্ত বলে অভিহিত করে। শনিবার ভোরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক্সে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাহসী মানুষের পাশে আছে।

তবে ইরানি রাজনৈতিক কর্মী তাকি রহমানি, যার স্ত্রী নোবেল জয়ী নার্গিস মোহাম্মদী ডিসেম্বরে পুনরায় গ্রেপ্তার হয়েছেন, তিনি মার্কিন সমর্থনের বিষয়ে সন্দিহান। তিনি বলেন, বিদেশি হস্তক্ষেপ বিরোধী শক্তিকে পরনির্ভরশীল করে তোলে, যা ইরানের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

শুক্রবার ইরানের নিরাপত্তা ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো নমনীয়তা না দেখানোর ঘোষণা দিয়েছে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ বিক্ষোভকারীদের ‘সশস্ত্র ধ্বংসকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। 

একই সুর বজায় রেখে রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) গোয়েন্দা শাখা জানিয়েছে, শত্রুর পরিকল্পনা নস্যাৎ না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের অভিযান চালিয়ে যাবে।

রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের