কখনো উষ্ণ আবার কখনো শীতলতার মধ্য দিয়ে যাওয়া চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে ইরান যুদ্ধ। বিশেষ করে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠককে ওয়াশিংটন যুদ্ধের হাতিয়ার বানাতে চাওয়ায় বিরক্ত চীনা কর্মকর্তারা।
হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ পাহারা দেওয়ার জন্য কয়েকদিন আগে চীনসহ বিভিন্ন দেশকে আহ্বান জানান ডোনাল্ড ট্রাম্প। বেইজিং এতে রাজি না হলে বৈঠক পিছিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যদিও সোমবার তিনি বলেছেন, ‘আমি যেতে চাই, কিন্তু যুদ্ধের কারণে এখানে (দেশে) থাকতে হচ্ছে। তাঁর (শি) সঙ্গে সাক্ষাতের অপেক্ষায় আছি। আমাদের সম্পর্ক খুব ভালো।’
তবে বৈঠক পিছিয়ে দিয়ে ট্রাম্প ‘ভালো সম্পর্কের’ দাবি করলেও বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন না চীনা কর্মকর্তারা। বাণিজ্যিক জাহাজ পাহারা দেওয়ার আহ্বানকেও বেইজিং বেশ শীতলভাবে গ্রহণ করেছে। সোমবার এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান কেবল এটুকুই বলেন, তাঁর দেশ সব পক্ষকে অবিলম্বে সামরিক তৎপরতা বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছে।
সরকারি মহলের বাইরে ট্রাম্পের এই আহ্বান চীনে সরাসরি উপহাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র গ্লোবাল টাইমস প্রশ্ন তুলেছে, এটি কি সত্যিই দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া? নাকি শেষ করতে না পারা যুদ্ধের ঝুঁকি ভাগ করতে ওয়াশিংটন ফন্দি আঁটছে?
অপরদিকে একজন প্রভাবশালী চীনা ব্লগার রসিকতা করে বলেছেন, মার্কিন জাহাজকে পাহারা দেওয়ার জন্য এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচিত ইরানি যুদ্ধজাহাজকে আমন্ত্রণ জানানো।
বেইজিংয়ের জন্য তাদের নিজস্ব কর্মী ও জাহাজকে ঝুঁকিতে ফেলা কিংবা আঞ্চলিক ঘনিষ্ঠ অংশীদার ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। ইরান ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। চীনের জন্য তেলবাহী জাহাজগুলোকে নির্বিঘ্নে প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দিচ্ছে।
সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ ইউনিভার্সিটির মিডল ইস্ট স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডিং লং বলছেন, ট্রাম্প বেইজিং সফর করুক বা না করুক, চীন কোনোভাবেই যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে না। নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠানো মানে, ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাতে যোগ দেওয়া বা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া। এ কাজ করতে চীন মোটেও আগ্রহী নয়।
শি জিনপিং দীর্ঘদিন ধরে চীনকে পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। এ অবস্থায় ট্রাম্পের আহ্বানে যুদ্ধজাহাজ পাঠালে তা হবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের কাছে নতিস্বীকার করার মতো।
চীনের বৈশ্বিক কৌশল নিয়ে কাজ করেন অলাভজনক সংস্থা মারকেটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজের বিশ্লেষক ক্লজ সুং। তিনি বলেন, বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে এটি আমেরিকান যুদ্ধ, চীনের সমস্যা নয়। সুতরাং ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দিলে মনে হবে চীন যেন আদেশ পালন করছে।
তবে একেবারে সাড়া না দেওয়াটা চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্য বিরতিকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। ট্রাম্পের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকের মাধ্যমে বেইজিং মার্কিন চাপ কমিয়ে নিজেদের ধীরগতির অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার আশায় ছিল। চীন চায় ওয়াশিংটন যেন তাইওয়ানের প্রতি সমর্থন কমায়, প্রযুক্তি রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করে এবং গত বছরের বাণিজ্য যুদ্ধের পর শুল্কের ওপর যে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছিল সেটির মেয়াদ বাড়ায়।
যুদ্ধ শুরুর আগেই চীন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করেছিল। কিন্ত তারপরও হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় তারা ক্ষতির মুখে পড়ছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কম সংখ্যক চীনা জাহাজই এই জলপথ অতিক্রম করেছে। মেরিটাইম ডেটা প্ল্যাটফর্ম মেরিন ট্রাফিকের তথ্যমতে, মঙ্গলবার পর্যন্ত অন্তত ৯টি চীনা পণ্যবাহী জাহাজ পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের চায়না প্রোগ্রামের পরিচালক ইউন সান বলেন, প্রণালিটি পুনরায় খুলে দিলে সবাই উপকৃত হবে। বেইজিং হয়তো মধ্যস্থতার চেষ্টা করতে পারে অথবা পর্দার আড়াল থেকে ইরানকে প্রণালিটি খুলে দেওয়ার চাপ দিতে পারে।
ইউন সান আরও বলেন, প্রণালিটি খুলে দেওয়ার জন্য জোরালো ভূমিকা রাখতে পারলে তা বেইজিংয়ের জন্য লাভজনক হবে। এটি শীর্ষ সম্মেলনের আগে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরিতে সাহায্য করবে। তবে চীন কেবল একতরফা চাপ দিয়ে ইরানকে বাধ্য করতে পারবে না।
উল্টোভাবে দেখলে, ট্রাম্প-শির বৈঠক পিছিয়ে যাওয়াটা চীনের জন্য লাভজনক হতে পারে। যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় তবে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়বে। চীন সে চাপকে কাজে লাগিয়ে দর কষাকষির বাড়তি সুযোগ পাবে।
মারকেটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজের বিশ্লেষক ক্লজ সুং বলছেন, বেইজিং এবং ওয়াশিংটন- উভয় পক্ষেরই এই শীর্ষ সম্মেলন নিয়ে প্রত্যাশা আছে। তবে ট্রাম্পের জন্য এই বৈঠকটি হয়তো বেশি জরুরি। কারণ তিনি দেখাতে চান যে তিনি একটি সফল চুক্তি করতে সক্ষম।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

