হরমুজ-সুয়েজের বিকল্প হতে পারবে কি আর্কটিকের ‘বরফ সিল্ক রোড’

সোমবার,

১৭ আগস্ট ২০২৬,

২ ভাদ্র ১৪৩৩

সোমবার,

১৭ আগস্ট ২০২৬,

২ ভাদ্র ১৪৩৩

Radio Today News

হরমুজ-সুয়েজের বিকল্প হতে পারবে কি আর্কটিকের ‘বরফ সিল্ক রোড’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:২৬, ১৭ আগস্ট ২০২৬

Google News
হরমুজ-সুয়েজের বিকল্প হতে পারবে কি আর্কটিকের ‘বরফ সিল্ক রোড’

হরমুজ প্রণালি ও সুয়েজ খালের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প বাণিজ্যপথের সন্ধান করছেন অনেকেই। এরই মধ্যে আর্কটিক অঞ্চলের ‘নর্দার্ন সি রুট’ (এনএসআর) দিয়ে নিয়মিত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল শুরু করেছে চীন। বরফে ঢাকা রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষা এই জলপথ চীন ও ইউরোপের মধ্যে সমুদ্রপথের দূরত্ব ও সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি এই পথে রয়েছে বড় ধরনের পরিবেশগত ও রাজনৈতিক ঝুঁকি। ফলে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, আর্কটিকের এই ‘বরফ সিল্ক রোড’ আদৌ সুয়েজ খাল বা হরমুজ প্রণালির কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে কিনা।

৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ নর্দার্ন সি রুটটি আর্কটিক সার্কেল পেরিয়ে রাশিয়ার উত্তর উপকূল বরাবর বিস্তৃত। গ্রীষ্মকালে বরফ কিছুটা গলে যাওয়ায় বছরের নির্দিষ্ট সময়ে এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল সম্ভব হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রীষ্মকালীন সমুদ্রের বরফ কমে যাওয়ায় সেই সময়সীমাও কিছুটা বাড়ছে।

জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতও এই পথে পণ্য পরিবহনে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে চীনই প্রথম নিয়মিত বাণিজ্যিক পরিষেবা চালু করেছে। শিপিং কোম্পানি সি লেজেন্ড সম্প্রতি নর্দার্ন সি রুট দিয়ে নিয়মিত কনটেইনার পরিষেবা শুরু করেছে।

ইউরোপে পৌঁছাতে সময় অর্ধেক
সি লেজেন্ডের একটি জাহাজ চীনের নিংবো-ঝৌশান বন্দর থেকে যুক্তরাজ্যের ফেলিক্সস্টো বন্দরে মাত্র ১৮ দিনে পৌঁছাতে পারে। সুয়েজ খাল দিয়ে একই যাত্রায় ৪০ দিনের বেশি সময় লাগতে পারে।

এই পথের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তাই সময় ও দূরত্ব কমানো। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রার প্রতি সংবেদনশীল পণ্য- যেমন বৈদ্যুতিক গাড়ি, লিথিয়াম ব্যাটারি ও সৌরবিদ্যুৎ-সংশ্লিষ্ট পণ্য পরিবহনে এই পথ বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। এসব পণ্যের বৈশ্বিক রপ্তানিতে চীন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।

সি লেজেন্ডের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা লি শিয়াওবিন মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকট সুয়েজ খাল ও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের ঝুঁকি স্পষ্ট করেছে। এ কারণে চীন ও ইউরোপের মধ্যে বিকল্প পথের প্রয়োজন আরও বেড়েছে।

‘পোলার সিল্ক রোড’
আর্কটিক অঞ্চলে চীনের আগ্রহ নতুন নয়। ২০১৭ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিংপিং চীন ও রাশিয়ার মধ্যে আর্কটিক নৌপথ উন্নয়ন এবং একটি ‘পোলার সিল্ক রোড’ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

নর্দার্ন সি রুটের বড় অংশ রাশিয়ার একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম এই পথে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয় এবং নৌযান পরিচালনা তদারক করে। প্রয়োজনীয় পারমাণবিক শক্তিচালিত বরফভাঙা জাহাজও তারা সরবরাহ করে।

একসময় আর্কটিকে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে রাশিয়ার উদ্বেগ থাকলেও ইউক্রেন যুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে মস্কো বেইজিংয়ের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে আর্কটিক অঞ্চলে চীনের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হয়েছে।

পরিবেশ নিয়ে বড় উদ্বেগ
সি লেজেন্ডের দাবি, সংক্ষিপ্ত সমুদ্রযাত্রার কারণে এই পথে কার্বন নিঃসরণ প্রায় অর্ধেকে নামতে পারে। তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর্কটিক অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের নিজস্ব পরিবেশগত ঝুঁকি এতটাই বেশি যে এতে সম্ভাব্য নিঃসরণ কমার সুফলও নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

বিশেষ করে ভারী জ্বালানি তেল বা হেভি ফুয়েল অয়েল (এইচএফও) ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ২০২৪ সালে আর্কটিক অঞ্চলে এই জ্বালানি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও কিছু জাহাজের কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।

বেলোনা এনভায়রনমেন্টাল ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্কটিক অঞ্চলে তেল ছড়িয়ে পড়লে তা পরিষ্কার করা অত্যন্ত কঠিন। ঠান্ডা পরিবেশে তেল ধীরে পচে এবং বরফের মধ্যে আটকে গেলে তা অপসারণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

আর্কটিকের দুর্গম অবস্থানও বড় সমস্যা। কোনো জাহাজে দুর্ঘটনা বা যান্ত্রিক ত্রুটি হলে উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

এ ছাড়া ভারী জ্বালানি তেল থেকে নির্গত কালো কার্বন আর্কটিকের বরফের ওপর জমে সূর্যের আলো শোষণের পরিমাণ বাড়াতে পারে। এতে বরফ গলার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

‘শ্যাডো ফ্লিট’ নিয়েও উদ্বেগ
নর্দার্ন সি রুটে রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’এর চলাচল নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহৃত এসব তেলবাহী জাহাজের অনেকগুলোর যথাযথ বিমা বা নিয়ন্ত্রক তদারকি নেই।

বেলোনার এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রায় ১০০টি জাহাজ এই পথে চলাচল করেছে। এটি ওই বছর নর্দার্ন সি রুটে চলাচলকারী কার্গো জাহাজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রীষ্মকালীন বরফ দ্রুত কমে যাওয়ায় এই পথে জাহাজ চলাচলের সময় আরও বাড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। চলতি বছরের মে মাসেই একটি রুশ এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ স্বাভাবিক সময়ের আগেই এই পথে যাত্রা শুরু করেছে।

সম্প্রতি রাশিয়ার কয়েকটি তেলবাহী জাহাজের একটি বড় বহরও নর্দার্ন সি রুটের অস্বাভাবিকভাবে উত্তরের পথ দিয়ে চলাচল করেছে। বলা হচ্ছে, জাহাজগুলোতে প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল তেল ছিল এবং বহরটি উত্তর মেরুর ৫০০ মাইলের মধ্যে দিয়ে গেছে।

এখনই হরমুজ-সুয়েজের বিকল্প নয়
আর্কটিকের বরফ গলে যাওয়ায় নর্দার্ন সি রুটের সম্ভাবনা বাড়লেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই এটিকে হরমুজ প্রণালি বা সুয়েজ খালের বিকল্প হিসেবে দেখা বাস্তবসম্মত নয়।

নিরাপত্তা ঝুঁকি, পরিচালন ব্যয়, সীমিত মৌসুম এবং রাশিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা- সব মিলিয়ে এই পথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে বড় বাধা রয়েছে।

আর কোনো বড় ধরনের তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটলে তা শুধু পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ভিন থাইয়ের ভাষ্য, নর্দার্ন সি রুটকে হরমুজ প্রণালি বা সুয়েজ খালের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যাবে কিনা- এর সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, এই মুহূর্তে না।

রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের