শুক্রবার,

১৬ অক্টোবর ২০২৬,

১ কার্তিক ১৪৩৩

শুক্রবার,

১৬ অক্টোবর ২০২৬,

১ কার্তিক ১৪৩৩

Radio Today News

ইরানে ‘মাদার অব অল বোম্বস’ ফেলার হুমকি, কতটা ভয়ংকর এই অস্ত্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮:৫৬, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ১৮:৫৭, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

Google News
ইরানে ‘মাদার অব অল বোম্বস’ ফেলার হুমকি, কতটা ভয়ংকর এই অস্ত্র

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অ-পারমাণবিক বোমা ‘মাদার অব অল বম্বস’ (এমওএবি) ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা সামনে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিলে এ বোমা ব্যবহার করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম সিএনএন।

তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশাল ধ্বংসক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এ বোমা দিয়ে ইরানের গভীরে সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা কঠিন। ফলে এমন হামলা সামরিক লক্ষ্য অর্জনের পরিবর্তে সংঘাতের উত্তেজনা বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট (এমওএবি) নামের এই বোমা ‘মাদার অব অল বম্বস’ বা ‘সব বোমার মা’ নামে পরিচিত। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের মধ্যে এটি ব্যবহারের সম্ভাবনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে বোমাটি ব্যবহার করলেও ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ব্রাসেলসভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক ইলাইজা মানিয়ে আল জাজিরাকে বলেন, এমওএবি দিয়ে ইরানের মাটির গভীরে অবস্থিত সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস নিশ্চিত করা যাবে না। তাঁর মতে, এ ধরনের হামলা কার্যকর সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রদর্শনীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এমওএবি একটি বিশাল আকারের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রচলিত বিস্ফোরক বোমা। এতে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কেজি বিস্ফোরক থাকে। বোমাটির মোট ওজন প্রায় ৯ হাজার ৮০০ কেজি এবং দৈর্ঘ্য ৯ মিটারের বেশি।

এর বিশাল আকারের কারণে সাধারণ যুদ্ধবিমান দিয়ে এটি বহন করা যায় না। বোমাটি নিক্ষেপের জন্য সি-১৩০ হারকিউলিসের মতো কার্গো পরিবহন বিমান ব্যবহার করা হয়। ২০০২ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে এটি তৈরি করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত বাস্তবে মাত্র একবার এ বোমা ব্যবহার করেছে। ২০১৭ সালে আফগানিস্তানে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্সের (আইএসকেপি) গুহা ও সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক লক্ষ্য করে বোমাটি নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আফগান কর্তৃপক্ষ তখন ৯৪ জন জঙ্গি নিহত হওয়ার দাবি করেছিল। তবে ওই অভিযানে বেসামরিক হতাহতের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্যও সামনে এসেছিল।

এমওএবি মাটিতে আঘাত করার আগেই ভূপৃষ্ঠের কিছুটা ওপরে বিস্ফোরিত হয়। এর ফলে তীব্র বিস্ফোরণ, প্রচণ্ড চাপ ও অভিঘাত তরঙ্গ সৃষ্টি হয়, যা খোলা জায়গায় থাকা সেনা, সামরিক সরঞ্জাম এবং ওপরের অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে।

সামরিক বিশ্লেষক কর্নেল নিদাল আবু জায়েদের মতে, এ ধরনের বোমার বিস্ফোরণে সৃষ্ট অভিঘাত তরঙ্গ আশপাশের স্থাপনায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে। তবে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে ভূপ্রকৃতি, স্থাপনার গঠন ও আশপাশের পরিবেশের ওপর।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে এমওএবি ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফোরদো পারমাণবিক কেন্দ্র এবং ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামে পরিচিত স্থাপনাগুলো পাহাড়ের গভীরে শক্তভাবে সুরক্ষিত। এসব স্থাপনা ধ্বংসের জন্য এমওএবি বিশেষভাবে তৈরি করা হয়নি।

এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে জিবিইউ-৫৭ ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর (এমওপি), যা বিশেষভাবে গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় আঘাত হানার জন্য তৈরি। প্রায় ১৩ হাজার ৬০০ কেজি ওজনের এ বোমাটি শক্ত ইস্পাতের আবরণযুক্ত এবং মাটি বা শিলাস্তরের গভীরে প্রবেশ করে বিস্ফোরিত হওয়ার উপযোগী।

এমওএবি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো এটি বহনকারী বিমানের নিরাপত্তা। বোমাটি বহনের জন্য প্রয়োজনীয় সি-১৩০ পরিবহন বিমান স্টিলথ যুদ্ধবিমানের মতো রাডার এড়ানোর সক্ষমতাসম্পন্ন নয়। ফলে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অতিক্রম করে লক্ষ্যবস্তুর কাছে পৌঁছানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এমওএবি দিয়ে স্থাপনার ওপরের অংশ বা প্রবেশপথ ক্ষতিগ্রস্ত করা সম্ভব হলেও এর মাধ্যমে গভীরে অবস্থিত পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসের নিশ্চয়তা নেই। তাই এ ধরনের হামলা ওয়াশিংটনের ঘোষিত কৌশলগত লক্ষ্য পূরণে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোপন আলোচনায় ট্রাম্প চলমান সংঘাতের একটি ‘চূড়ান্ত’ সমাপ্তি চাইছেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থানকে বিজয় হিসেবে তুলে ধরা যায়। তবে এমওএবি ব্যবহারের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে ইরানও পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এর আগে প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

কুয়েত এর আগে অভিযোগ করেছিল, গত মে মাসে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সদস্যরা দেশটির বুবিয়ান দ্বীপে প্রবেশ করেছিলেন। এ ঘটনায় দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির পর এক কুয়েতি সেনা আহত এবং চার ইরানি আটক হন। তবে ইরান দাবি করেছিল, নৌকার দিকনির্ণয় যন্ত্রে ত্রুটির কারণে তারা ভুলবশত সেখানে চলে গিয়েছিলেন।

মঙ্গলবার আইআরজিসির নিরাপত্তা উপদেষ্টা মোহাম্মদ রেজা নাগদি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র স্থল অভিযান চালালে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনাকে বন্দি করা হতে পারে। তবে ইরানের দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে দেশটিতে স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাব্যতা নিয়েও সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।

এদিকে ইরান ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত বাড়ানো এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদারের মাধ্যমে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজাই গত রোববার এক টেলিভিশন ভাষণে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে পশ্চিম এশিয়ার ডিজিটাল অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

তাঁর হুঁশিয়ারি অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলের সাবমেরিন কেবল, ডেটা সেন্টার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাকেন্দ্র হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, এমওএবি ব্যবহারের সম্ভাবনা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে। তবে বোমাটির ব্যাপক ধ্বংসক্ষমতা থাকলেও ইরানের গভীরে সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা।

রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের