হাতে ছোট একটি কাটা বা হাঁটুতে সামান্য ছড়ে গেলেও মানুষের ক্ষত সারতে কয়েক দিন, কখনো কয়েক সপ্তাহ লেগে যায়। অনেক সময় সেই ক্ষতের দাগও থেকে যায়।
কিন্তু একটি ছোট স্বচ্ছ জেলিফিশ মাত্র কয়েক মিনিটেই ক্ষত সারিয়ে ফেলতে পারে। তাও আবার কোনো দাগ ছাড়াই।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই জেলিফিশের ক্ষত সারানোর কৌশল ভবিষ্যতে মানুষের ক্ষত দ্রুত ও দাগহীনভাবে সারানোর নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবনে সহায়তা করতে পারে।
জেলিফিশটির নাম ক্লাইটিয়া হেমিসফেরিকা। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের মেরিন বায়োলজিক্যাল ল্যাবরেটরির গবেষক জসলিন মালামি গত ১০ বছর ধরে এটি নিয়ে গবেষণা করছেন। জেলিফিশটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হওয়ায় এর শরীরের কোষ কীভাবে কাজ করে, তা জীবন্ত অবস্থাতেই দেখা সম্ভব।
গবেষণায় দেখা গেছে, ছোট ক্ষত কয়েক মিনিটেই সেরে যায়।
বড় ক্ষতও এক ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, ক্ষত সারলেও কোনো দাগ থাকে না। গবেষকদের মতে, এটি অনেকটা মানুষের ভ্রূণের একেবারে শুরুর দিকের ক্ষত সারানোর মতো।
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষত হওয়ার পর ক্ষতের চারপাশের কোষগুলো ছোট ছোট আঙুলের মতো অংশ বের করে সামনে এগিয়ে যায়। এগুলো ধীরে ধীরে ক্ষতস্থান ঢেকে দেয়।
এরপর দড়ির মতো কাজ করা আরেকটি কোষীয় গঠন সংকুচিত হয়ে ক্ষতটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এই দুই ধাপের কারণেই জেলিফিশের ক্ষত খুব দ্রুত সেরে যায়।
মানুষের ক্ষেত্রে এমন হয় না কেন?
ভারতের হেমচন্দ্রাচার্য নর্থ গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হেরিস প্যাটেলের মতে, মানুষের শরীরে ক্ষত হলে প্রথমেই রক্তপাত বন্ধ করা এবং সংক্রমণ ঠেকানোর কাজ শুরু হয়। এ সময় ক্ষতস্থানে প্রদাহ তৈরি হয় এবং কোলাজেন নামে একটি প্রোটিন জমে শক্ত স্তর তৈরি করে। এ কারণেই ক্ষত শুকিয়ে গেলেও অনেক সময় দাগ থেকে যায়। জেলিফিশের শরীরে এমন দাগ তৈরির প্রক্রিয়া নেই।
হেরিস প্যাটেল আরো বলেন, মানুষের শরীরেও জেলিফিশের মতো কোষীয় প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত প্রদাহের কারণে সেই প্রাকৃতিক মেরামতের কাজ পুরোপুরি করতে পারে না। তাই এই গবেষণা মানুষের ক্ষত সারানোর পদ্ধতি আরও ভালোভাবে বুঝতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করবে।
তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর অর্থ এই নয় যে খুব শিগগির বাজারে জেলিফিশ থেকে তৈরি কোনো ক্ষত সারানোর ওষুধ আসছে। বরং এই গবেষণা ভবিষ্যতে দাগ কমানোর চিকিৎসা বা টিস্যু মেরামতের নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সহায়ক হতে পারে।
এটি শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানেই নয়, বিবর্তন গবেষণার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জেলিফিশ পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন প্রাণীগুলোর একটি। তাই এর শরীরে পাওয়া ক্ষত সারানোর কৌশল মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর মধ্যেও বহু আগে থেকেই বিদ্যমান থাকতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালে নাসা ২ হাজারের বেশি শিশু জেলিফিশ মহাকাশে পাঠিয়েছিল। তখন লক্ষ্য ছিল, মাধ্যাকর্ষণহীন পরিবেশে জীবের বিকাশ কীভাবে হয়, তা জানা। কয়েক দশক পর সেই জেলিফিশই এবার দাগহীন ক্ষত সারানোর রহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞানীদের নতুন আশা দেখাচ্ছে।
সূত্র : ডিসকভার ওয়াইল্ডলাইফ
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

