আপনি যদি নিজেকে খুব চাপের মধ্যে বা উদ্বেগে আচ্ছন্ন অনুভব করেন, তাহলে সুস্থতা বা মানসিক প্রশান্তি বাড়ানোর জন্য ছোট ও সহজ কিছু 'মাইক্রোপ্র্যাকটিস' করার কথা ভাবতে পারেন।
আমি একজন গবেষকের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলছি এবং হঠাৎ করে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে হাসতে শুরু করেছি। আমার মুখ কুঁচকে যাচ্ছে, পেট ব্যথা করছে কিন্তু কোনোভাবেই হাসি থামাতে পারছি না।
আমি নেদারল্যান্ডসের ডেলফ্ট ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজির গবেষক ন্যাটালি ভ্যান ডের ওয়ালের সঙ্গে কথা বলছি। আমরা একটি ছোট লাফটার ইয়োগা সেশনে অংশ নিচ্ছি।
প্রচলিত যোগব্যায়ামের মতোই এটি শ্বাস-প্রশ্বাসের একটি অনুশীলন দিয়ে শুরু হয়। এরপর আপনাকে ইচ্ছে করে, অর্থাৎ কৃত্রিমভাবে হাসতে বলা হয়।
ভ্যান ডের ওয়াল বলেছেন, "কিছুক্ষণ পর অনেক সময় এই কৃত্রিম হাসিটাই সত্যিকারের হাসিতে পরিণত হয়"।
পাঁচ মিনিটের মেডিটেশন সেশন থেকে শুরু করে শীতের বরফঠান্ডা পানিতে সাঁতার- নিজের যত্ন নেওয়ার এমন আধুনিক অনেক পদ্ধতিই বেশ সময়সাপেক্ষ হতে পারে। কিন্তু এখন অনেক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, এর জন্য সবসময় এত বেশি সময় দেওয়ার দরকার নেই।
ছোট ও সহজ কিছু কাজও আমাদের মুড, মানসিক সুস্থতা এবং শক্তির মাত্রা উন্নত করতে পারে- এমন প্রমাণ দিন দিন বাড়ছে।
'মাইক্রোপ্রাকটিস' বইয়ের লেখক এলি সাসম্যানের মতে, কিছু অনুশীলন করতে মাত্র ৩০ সেকেন্ড সময় ব্যয় হতে পারে। এগুলোকে বলা হয় 'মাইক্রোপ্র্যাকটিস' বা ক্ষুদ্র অনুশীলন।
এখানে এমন কয়েকটি অনুশীলনের তালিকা রয়েছে, যেগুলো আপনি এখনই শুরু করতে পারেন।
লাফটার ইয়োগা
লাফটার ইয়োগার মূল বিষয় হলো কোনো কৌতুক বা মজার ঘটনা ছাড়াই ইচ্ছাকৃতভাবে হাসি শুরু করা। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো হাসিটা, কৌতুক নয়।
শুরুতে আমার কৃত্রিম হাসিগুলো একটু অস্বস্তিকর লাগছিল। কিন্তু হাসির সেশন শেষ হওয়ার পর আমি অনেক বেশি প্রফুল্ল ও আনন্দিত অনুভব করলাম। আমাদের কথাবার্তাও খুব স্বাভাবিকভাবে চলতে লাগল।
আমি যখন ভ্যান ডের ওয়ালকে এ কথা বললাম, তখন তিনিও আরও কিছুক্ষণ হাসলেন। তিনি ব্যাখ্যা করলেন, লাফটার ইয়োগার একটি সেশন করার পর অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি করা তার কাছে প্রায়ই সহজ মনে হয়।
আমিও আশ্চর্যজনকভাবে বেশ শান্ত অনুভব করছিলাম। আর এর পেছনে গবেষণারও সমর্থন রয়েছে।
ভ্যান ডের ওয়াল একটি বড় মেটা-অ্যানালাইসিস, অর্থাৎ বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল একত্র করে করা একটি গবেষণায় দেখেছেন যে কৌতুক ছাড়া হাসি বিষণ্ণতা ও উদ্বেগ কমাতে কৌতুক বা হাস্যরসের সঙ্গে সম্পর্কিত হাসির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ কার্যকর।
কীভাবে করবেন
প্রথমে তিনবার গভীর শ্বাস নিন এবং পেটের ওপর হাত রাখুন। এরপর ইচ্ছে করে হাসতে শুরু করুন। যদি সরাসরি হাসতে অস্বস্তি লাগে, তাহলে প্রথমে বলুন- "হি হি হি, হা হা হা"। ধীরে ধীরে হাসির শব্দের ভলিউম বাড়াতে থাকুন।
অনেক সময় এই কৃত্রিম হাসি সত্যিকারের হাসিতে পরিণত হয়। শেষে আবার একটি গভীর শ্বাস নিন এবং আপনি যে বিষয়গুলোর জন্য কৃতজ্ঞ, সেগুলোর কথা ভাবুন।
আপনার সঙ্গে যদি একজন সঙ্গী থাকে, তাহলে আরও ভালো। একে অপরের হাসি নকল করে দেখুন তো কী হয়, লক্ষ্য করুন।
মাইক্রো ইয়োগা
আপনি যদি একা একা কিংবা আয়নার সামনে হাসতে না পারেন, তাহলে একটু মনোযোগ দিয়ে শরীর প্রসারিত বা স্ট্রেচ করে দেখতে পারেন, যেটিকে সাসম্যান 'মাইক্রো ইয়োগা' বলে উল্লেখ করেছেন।
এই ব্যায়ামটি বিশেষ করে তাদের জন্য খুব দরকারি যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের সামনে বসে থাকেন। সাসম্যান জানান, এই সহজ যোগব্যায়ামটি দীর্ঘ সময় ধরে একই ভঙ্গিতে বসে থাকার ক্ষতিকর প্রভাব দূর করতে সাহায্য করে।
আমরা যখন দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের সামনে বসি, তখন সাধারণত আমাদের পিঠ ও কাঁধ কিছুটা কুঁকড়ে বা ঝুঁকে যায়। কথা বলার মাঝেই তিনি আমাকে একটি মৃদু স্ট্রেচিং বা ব্যায়াম দেখান, যা আমার ঘাড়ের পেশির টান দূর করে এবং আমার বসার ভঙ্গি ঠিক করতে আমাকে আরও সচেতন করে তোলে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রতি ১৫ মিনিট পর পর মাত্র ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ডের জন্য শরীর প্রসারিত বা স্ট্রেচ করলে কাজের দক্ষতা প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
যদিও এটি পুরোপুরি চিরাচরিত যোগব্যায়াম নয়, তবে অন্যান্য গবেষণা বলছে স্ট্রেচিংয়ের সাথে যখন গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস এবং পূর্ণ মনোযোগ যুক্ত হয়, তখন তা মানসিক চাপ বা যন্ত্রণা কমাতে আরও বেশি কার্যকর হয়।
এছাড়া মনোযোগ সহকারে নেওয়া এই স্ট্রেচিং ব্রেকগুলো কাজের ক্লান্তি এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে চিকিৎসকদের ভুলের হার কমাতেও সহায়ক বলে প্রমাণিত হয়েছে।
সতর্কতা: যে কোনো নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে সন্দেহ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সব ধরণের স্ট্রেচিংয়ের ক্ষেত্রেই কিছু না কিছু শারীরিক ঝুঁকির আশঙ্কা থাকে।
কীভাবে এটি করবেন:
আপনার পিঠের পেছনে দুই হাতের আঙুলগুলো একে অপরের সাথে ইন্টারলক করুন বা জড়িয়ে ধরুন)। এরপর শ্বাস নেওয়ার (ইনহেল) সাথে সাথে আপনার হাত দুটি নিচের দিকে প্রসারিত করুন এবং বুকটা আলতো করে উপরের দিকে তুলুন।
এবার শ্বাস ছাড়ার (এক্সহেল) সাথে সাথে শরীরকে শিথিল করে স্ট্রেচ বা প্রসারণের গভীরতা অনুভব করুন। এভাবে স্বাভাবিকভাবে দুই থেকে তিনটি ধীর শ্বাস নিন এবং অবস্থানটি ধরে রাখুন।
স্লো ব্রিদস বা ধীরগতির শ্বাস-প্রশ্বাস
আপনি যদি মানসিক চাপে থাকেন বা কিছুটা উদ্বেগের মধ্য দিয়ে যান তাহলে শ্বাস-প্রশ্বাসের অভ্যাস স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করতে সাহায্য করে- এমন অনেক প্রমাণ আছে।
শারীরবৃত্তীয়ভাবে দীর্ঘ এবং ধীর শ্বাস নিলে তা আমাদের শরীরের 'লড়ো নয়তো পালাও' প্রতিক্রিয়াকে কমিয়ে দেয়। কারণ এটি শরীরের প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় করে তোলে, যা আমাদের শরীরের 'বিশ্রাম এবং হজম' করার অবস্থা।
তাই শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা ও উদ্বেগ কমাতেও কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় একদল গবেষক দেখেছেন যে, মাত্র তিনটি ধীর ও দীর্ঘ শ্বাস নিলে তা মস্তিষ্কের 'আলফা তরঙ্গ' বাড়িয়ে দেয়, যা শান্ত হতে ও মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে।
একই সাথে এটি 'থিটা তরঙ্গ' বাড়ায়, যা গভীর শিথিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
ইতালির ইউনিভার্সিটি অব নেপলস ফেদেরিকো টু-এর গবেষক অমিত কুমার এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন।
তার পরামর্শ হলো, যখনই আমাদের প্রয়োজন মনে হবে- যেমন অফিসে কোনো বড় মিটিংয়ের আগে বা যখন আমাদের মন অতিরিক্ত চঞ্চল হয়ে উঠবে- তখনই আমরা এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করতে পারি।
তিনি বলেন, সারা দিন ধরে নিয়মিত এটি করলে মানসিক চাপ জমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তবে অমিত কুমার পরামর্শ দিয়েছেন যে, যারা অতিরিক্ত মানসিক চাপে ভুগছেন, তারা হয়তো ৩০ সেকেন্ডের চেয়ে কিছুটা বেশি সময় ধরে এই শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করতে চাইতে পারেন।
করার পদ্ধতি:
একটি আরামদায়ক ভঙ্গিতে বসুন এবং চোখ বন্ধ করুন। প্রায় ১০ সেকেন্ড সময় নিয়ে মোট তিনটি ধীর ও গভীর শ্বাস নিন, যেখানে শ্বাস ছাড়ার সময়টি শ্বাস নেওয়ার সময়ের চেয়ে দীর্ঘ হবে।
বাতাস আপনার ফুসফুসে প্রবেশ করার এবং বের হয়ে যাওয়ার অনুভূতির ওপর মনোযোগ দিন। সারা দিনে যতবার খুশি আপনি এটি পুনরাবৃত্তি করতে পারেন।
আত্ম-সহানুভূতিশীল স্পর্শ
স্পর্শ যে আমাদের জন্য উপকারী, তা দীর্ঘকাল ধরেই স্বীকৃত। মানুষের স্পর্শের বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন হলেও, সাসম্যান এবং তার সহকর্মীদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, মাত্র ২০ সেকেন্ডের একটি সহজ 'নিজেকে শান্ত করার স্পর্শ' অনুশীলনের মাধ্যমেও আমরা দীর্ঘস্থায়ী সুফল পেতে পারি।
গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীরা যখন নিজেদের প্রতি সদয় চিন্তাভাবনা করার পাশাপাশি তাদের হাত বুক ও পেটের ওপর রেখেছিলেন, তখন তাদের শরীরে স্ট্রেস হরমোন 'কর্টিসল'-এর মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল।
সাসম্যান নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন, যা তার মতে সমাজে অবমূল্যায়িত।
এই সপ্তাহে প্রকাশিত একটি ফলো-আপ গবেষণায় সাসম্যান দেখেছেন যে, এই অনুশীলনের ফ্রিকোয়েন্সি বা হার বাড়ালে তা পরবর্তী ছয় মাসে নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার অনুভূতি আরও বাড়িয়ে তোলে।
পদ্ধতি: এক বা উভয় হাত আলতো করে আপনার বুকের ওপর বা বাহুর ওপরের অংশে রাখুন। একটি গভীর শ্বাস নিন এবং নিজের প্রতি সদয় চিন্তাভাবনা করার সাথে সাথে আপনার হাতের উষ্ণতা ও মৃদু চাপের অনুভূতির ওপর মনোযোগ দিন।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

