ঢাকায় চলতি সেপ্টেম্বরের ২৪ দিনে কারাগারে বন্দি অবস্থায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তারা কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও কাশিমপুর কারাগারের বন্দি। তাদের বেশির ভাগই ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বা হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান। এর মধ্যে তিনজনের বয়স ৪৫ বছরের নিচে।
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, অনেকেই নানা ধরনের অসুস্থতা নিয়ে কারাগারে আসেন। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে বেশির ভাগই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট ও প্রশিক্ষিত জনবল না থাকায় কারা হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কারা হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জাম, চিকিৎসকসহ জনবল ঘাটতিতে বন্দিদের চিকিৎসাসেবায় কিছুটা ব্যাঘাত ঘটছে।
কারা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে কারাগারে বন্দির সংখ্যা এক লাখের বেশি। সারাদেশের কারাগারে ২০২১ সালে ৩০৩, ২০২২ সালে ২২৩, ২০২৩ সালে ৩৭৫, ২০২৪ সালে ৩১৮, ২০২৫ সালে ১৮৭ এবং চলতি বছরের ১৬ আগস্ট পর্যন্ত ১২২ বন্দির মৃত্যু হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, বর্তমানে কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ বন্দি। এসব কারাগারে চিকিৎসা সুবিধা তেমন নেই। খাবারের মানে এখনও ঘাটতি রয়েছে। পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স নেই। কেউ অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া যায় না। ফলে বন্দিদের অধিকার পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে না। কারাবন্দিদের মৃত্যু কমাতে চিকিৎসায় গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সর্বশেষ গত বুধবার রাতে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকা মেডিকেলে মারা যান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দুই বন্দি– মোহাম্মদ ইফতেখার মাহমুদ (৩৬) ও মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসাইন পলাশ (৩৮)।
কারা সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ সেপ্টেম্বর কারাগারের ভেতরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন ইফতেখার। ওই দিনই তাঁকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। বুধবার রাত ৯টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। ইফতেখারের বাড়ি রাজধানীর মিরপুরের পীরেরবাগে।
একই রাতে কারাগারে হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়েন হাজতি তোফাজ্জল হোসাইন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাঁকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তোফাজ্জলের বাড়ি রাজধানীর দারুস সালাম থানার বাগবাড়ী এলাকায়।
ঢামেক পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক হাবিবুর রহমান বলেন, মরদেহ দুটি ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এ মাসের শুরুতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দি বাবুল হোসেন (৪৫) ঢাকা মেডিকেলে মারা যান। ৩ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে কারাগার থেকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
কারা সূত্র জানায়, বাবুল যাত্রাবাড়ী থানার একটি মাদক মামলার আসামি ছিলেন। তাঁর বাড়ি যশোরের কোতোয়ালি থানার মনোহরপুর এলাকায়।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পর মারা যান বন্দি মো. রফিকুল ইসলাম (৫৪)। তাঁর বাড়ি কুড়িগ্রামে। ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের হাজতি আব্দুল বারেক (৭০) ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি মাদক মামলার আসামি ছিলেন। তিনি কেন্দ্রীয় কারাগারে ভর্তি ছিলেন। নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।
পরদিন আব্দুল মাবুদ (৫৮) নামে আরেক বন্দি ঢাকা মেডিকেলে মারা যান। মাবুদের বাড়ি চট্টগ্রামে। তিনি মারামারি ও হত্যাচেষ্টার মামলায় কাশিমপুর কারাগারে বন্দি ছিলেন। অসুস্থ থাকায় গত ২৯ এপ্রিল তাঁকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। এর পর তিনি ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফারুক আহমেদ বলেন, দুই হাজতি অসুস্থ ছিলেন। হাসপাতালে তাদের মৃত্যু হয়।
৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে মারা যান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দি আলী আকবর মণ্ডল (৬৭)। ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকা মেডিকেলে মারা যান তিন কারাবন্দি। তারা হলেন– আবুল বাশার (৫৮), আবদুল কাইয়ুম (৬২) ও শাহাদাত হোসেন লিটন (৫২)।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন কারাগারের বন্দিরা প্রতি মাসেই নানা কারণে মারা যান। ২২ সেপ্টেম্বর দুপুরে ফরিদপুর জেলা কারাগারে বন্দি মাদক মামলার এজাহারভুক্ত হাজতি আসাদুজ্জামান শেখ (৪২) ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন ওয়ার্ডে মারা যান। তাঁর বাড়ি ফরিদপুর জেলার মধুখালীর বাগাট মুন্সিপাড়া গ্রামে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

