দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির গতি ফেরাতে আবাসন বা রিয়েল এস্টেট খাতের সংকট দূর করা জরুরি হয়ে পড়েছে। রড, সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রীর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং চড়া নিবন্ধন ব্যয়ের কারণে বর্তমানে এ খাতে মারাত্মক স্থবিরতা বিরাজ করছে। আবাসন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে আবাসন খাতের সঙ্গে দেশের ২৬৯টির বেশি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা সহযোগী শিল্প সরাসরি জড়িত। ফলে এ খাতের মন্দা পুরো দেশের শিল্পোৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অর্থনীতিতে আবাসন খাতের ইতিবাচক অবদান নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে অবিলম্বে বিশেষ কিছু নীতিগত ও আর্থিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি আবাসন খাতকে কেবল রাজস্ব আদায়ের যন্ত্র না বানিয়ে একে ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি’ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে বলেও মত দেন তাঁরা।
নগর বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী এবং আবাসন খাতের শীর্ষ সংগঠনগুলোর মতে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে চড়া নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন ব্যয়। বর্তমানে ফ্ল্যাট ও প্লট কেনাবেচার ক্ষেত্রে গেইন ট্যাক্স, স্ট্যাম্প ডিউটি, রেজিস্ট্রেশন ফি ও ভ্যাট মিলিয়ে ক্রেতাদের বিপুল অঙ্কের টাকা বাড়তি গুনতে হচ্ছে। এ উচ্চ নিবন্ধন ফি সাধারণ মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। নিবন্ধন ব্যয় কমিয়ে একটি যৌক্তিক ও সহনীয় পর্যায়ে আনা হলে বাজারে ফ্ল্যাট বিক্রি বাড়বে। এতে সাময়িকভাবে করের হার কমলেও বেচাকেনা বৃদ্ধির কারণে দীর্ঘমেয়াদে সরকারের মোট রাজস্ব আদায় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি যৌথ বিনিয়োগ বা জয়েন্ট ডেভেলপমেন্ট চুক্তির ওপর আরোপিত অতিরিক্ত মূলধনি কর পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। জমির মালিক ও ডেভেলপারদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানোর ফলে নতুন নতুন আবাসন প্রকল্প গ্রহণ থমকে গেছে। এটি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহ করছে, যার প্রভাব পড়ছে রড, সিমেন্ট, ইট ও বালুর বাজারে।
আবাসন খাত চাঙা করার আরেকটি অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো সহজ শর্তে ও সাশ্রয়ী মূল্যে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করা। মধ্যম ও স্বল্প আয়ের মানুষের গৃহায়নের স্বপ্ন পূরণ করতে একক ডিজিট বা সিঙ্গেল ডিজিট সুদে দীর্ঘমেয়াদি আবাসন ঋণ চালু করা আবশ্যক। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে একটি বিশেষ ‘পুনঃ অর্থায়ন তহবিল’ বা রি-ফাইন্যান্সিং ফান্ড গঠন করা যেতে পারে। এ তহবিল থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সাধারণ ক্রেতাদের কম সুদে ঋণ দিলে মধ্যবিত্তরা ফ্ল্যাট কিনতে উৎসাহিত হবে। আবাসন ঋণের কিস্তি সাধারণ মানুষের মাসিক আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে বাজারে তারল্যসংকট কাটবে এবং আবাসন খাত দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। একই সঙ্গে লাগামহীন নির্মাণসামগ্রীর বাজার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। সিন্ডিকেট দমনের পাশাপাশি রড ও সিমেন্ট উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কছাড় দিলে উৎপাদন ব্যয় ৩০% থেকে ৪০% পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। কাঁচামালের দাম কমলে ফ্ল্যাটের দামও সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে চলে আসবে।
সেই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্সের টাকা আবাসন খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ বন্ডসুবিধা বা করছাড় দিলে দেশে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসবে। আবাসন খাতকে কেবল রাজস্ব আদায়ের উৎস না ভেবে একে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করে একটি সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। এ বিষয়ে রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল বলেন, ‘আবাসন খাত অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু সরকার কিছু ভুল পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে আবাসন খাত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। আবাসন খাত ঘুরে দাঁড়াতে এবং অর্থনীতির বিরাট ভূমিকা রাখতে এখন সরকারের উচিত রেজিস্ট্রেশন ফি কমানো। সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে রেজিস্ট্রেশন ফি ৪-৫ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশে ১৫ শতাংশ। এ দেশে ৫-৭ শতাংশ নেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া সিঙ্গেল ডিজিটে লোনের ব্যবস্থা করা এবং দুই বছর মেয়াদি লোন দেওয়া।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডেভেলপাররা ১৫% সাইনিং মানি দিয়ে কাজ শুরু করে। সরকার আবার ফ্ল্যাটের দামের ওপর ১৫% কর বসিয়েছে। যেটার প্রভাব আল্টিমেটলি গ্রাহকের ওপর পড়বে। এ ছাড়া লিংকেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর পণ্য ইতোমধ্যে ৩১ শতাংশ বেড়েছে। বাজেটের কারণে ৪১ শতাংশ দাম বাড়বে। সুতরাং একজন ডেভেলপারের খরচ ৪৬ শতাংশ বাড়বে। একই সঙ্গে অর্ধকোটি মানুষ আবাসনের সঙ্গে জড়িত। জিডিপিতে ১৬% ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকারের কর এবং বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স কমে যাবে; যার প্রভাব পড়বে সরকারের ওপর। পাশাপাশি অর্থনীতির ওপর।’ জানতে চাইলে বাংলাদেশ ল্যান্ড ডেভেলপারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলডিএ) মহাসচিব মোস্তফা কামাল মহিউদ্দিন বলেন, ‘আবাসন খাতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। কারণ আবাসন খাত জিডিপিতে প্রায় ২০ শতাংশ অবদান রাখছে। একই সঙ্গে ৫০ লাখ মানুষ এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে এবং দেড় কোটি মানুষ পরোক্ষভাবে জড়িত। এ খাতে ৪ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। একই সঙ্গে ১২ হাজার শিল্পকারখানার এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বলা যায়, এ সেক্টর অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখছে। আবাসন ক্ষতিগ্রস্ত হলে অর্থনীতি বিরাট ধাক্কা খাবে। এজন্য আবাসন খাতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, ‘নতুন করে ফ্ল্যাটের ওপর ১৫% কর আরোপ করা হয়েছে। ফলে ফ্ল্যাটের দাম অনেক বেড়ে যাবে। এতে ফ্ল্যাট মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে না। সরকারের কর সহনশীল পর্যায়ে না এলে এ খাতের বিনিয়োগ অন্য দেশে চলে যাবে। সরকারের ভুল নীতির কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিনিয়োগ ও বৈদাশিক রেমিট্যান্স কমে যাবে। সরকার যদি আবাসন খাত ঠিক না করে তাহলে অর্থনীতির জন্য এটা সুইসাইডাল কেস হবে।’
জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘আবাসন মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। কিন্তু সরকার আবাসন খাত নিয়ে কোনো পলিসি নির্ধারণ করেনি। সরকার নিজেও নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য আবাসন করছে না। আবার প্রাইভেট সেক্টরে যারা আবাসন করছে তাদেরও ট্যাক্সসহ বিভিন্ন আইনের মধ্যে আটকে দিচ্ছে। সরকারের উচিত আবাসন খাতসংশ্লিষ্ট সব পণ্যের ওপর কর কমানো; যাতে সব মানুষই আবাসনের আওতায় আসতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার এবার নতুন করে রেজিস্ট্রেশন ফি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ফ্লাটের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপ করেছে। এটা আবাসন খাতকে বিপর্যস্ত করবে। এটা সরকারের প্রয়োজন ছিল না। সরকারের উচিত ছিল নতুন কর না বসিয়ে রেজিস্ট্রেশন ফি কমানো। তাহলে আবাসন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসত। কিন্তু সরকার তা না করে উল্টো বাধা তৈরি করছে। সুতরাং সরকারের উচিত আবাসন খাতে মনোযোগ দেওয়া।’ জানতে চাইলে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. মো. আইনুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে আবাসন খাতের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু কাঁচামাল বা র-মেটেরিয়ালসের ওপর উচ্চ কর, মাত্রাতিরিক্ত নিবন্ধন ফি ও গেইন ট্যাক্সের কারণে এই সম্ভাবনাময় খাতটি এখন কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে। এবারের বাজেটেও আবাসন খাতের জন্য তেমন কোনো ব্যবসাবান্ধব সিদ্ধান্ত দেখা যায়নি। এ খাত পুনরুজ্জীবিত করতে হলে মূলত তিনটি বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি। এজন্য র-মেটেরিয়ালসের ওপর কর সহনীয় পর্যায়ে আনা। ক্রেতাদের জন্য সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি লোনের ব্যবস্থা করা এবং ফ্ল্যাট বা প্লট নিবন্ধনের জটিল প্রক্রিয়া এবং অতিরিক্ত পেপারওয়ার্ক সহজ করা। সাধারণ ক্রেতাদের জন্য আবাসন প্রক্রিয়া যত সহজ ও সাশ্রয়ী হবে, এ শিল্প তত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে।’
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

