শুক্রবার,

০৯ অক্টোবর ২০২৬,

২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

শুক্রবার,

০৯ অক্টোবর ২০২৬,

২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

Radio Today News

এবার শীতের আয়ু কম, বাড়তে পারে কুয়াশার দাপট

রেডিওটুডে রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১৬:১৩, ৯ অক্টোবর ২০২৬

Google News
এবার শীতের আয়ু কম, বাড়তে পারে কুয়াশার দাপট

এবার বাংলাদেশে শীত আসতে কিছুটা দেরি হতে পারে। একই সঙ্গে শীতের স্থায়িত্ব ও তীব্রতাও গত কয়েক বছরের তুলনায় কম থাকার আভাস দিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে চলতি শীত মৌসুমে দেশের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা কম। তবে বৃষ্টিপাত কম হলে ঘন কুয়াশার প্রকোপ বাড়তে পারে।

শীতের আগমনী বার্তা ইতোমধ্যে দেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে অনুভূত হচ্ছে। মধ্যরাতের পর বাড়ছে ঠান্ডার অনুভূতি, ভোরে দেখা মিলছে কুয়াশা ও শিশিরের। তবে দেশের বেশির ভাগ এলাকায় এখনো শীতের আমেজ তেমন নেই। বরং দিনের বেলা অনেক স্থানে ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে।

আবহাওয়াবিদদের ধারণা, শুক্রবারের মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিতে পারে। এর মধ্য দিয়ে বর্ষার আনুষ্ঠানিক বিদায় ঘটবে। তবে মৌসুমি বায়ু বিদায় নিলেই শীত শুরু হবে, এমন নয়। অক্টোবরজুড়ে আবহাওয়ার পরিবর্তন ধীরে ধীরে ঘটতে পারে। নভেম্বরের শেষভাগ থেকে শীতের অনুভূতি আরও স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন নেসা বলেন, এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে এবার শীতের মেয়াদ কম হতে পারে। তবে শীতের তীব্রতা কম থাকলেও ঘন কুয়াশা বাড়তে পারে। এরই মধ্যে নদী অববাহিকা অঞ্চলে কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে।

এল নিনোর প্রভাব কতটা পড়বে

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রক্রিয়া এল নিনো সরাসরি বাংলাদেশকে প্রভাবিত না করলেও বৈশ্বিক বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ধরনে পরিবর্তনের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। এবারও এর প্রভাবে শীতের স্বাভাবিক চরিত্রে পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা করছেন আবহাওয়াবিদরা।

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বলেন, জুনের পর থেকেই এল নিনোর শক্তিশালী অবস্থা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব শুধু বাংলাদেশে নয়, পুরো ভারতীয় অঞ্চলেও পড়তে পারে। শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে গ্রীষ্মে অনিয়মিত বৃষ্টি ও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা দেখা দিতে পারে। শীতেও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের পূর্বাভাসে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। একই সময়ে বৃষ্টিপাতও কম হতে পারে। কয়েক দফায় শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিলেও সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম।

আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বাংলাদেশে শীতকালে তাপমাত্রা সাধারণত স্থানভেদে ১২ থেকে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। উত্তরাঞ্চলে তা ১২ থেকে ১৬ ডিগ্রিতে নেমে আসতে পারে। তবে এবার গড় তাপমাত্রা ১৪ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহের পরিবর্তে স্বল্পস্থায়ী ও বিচ্ছিন্ন শৈত্যপ্রবাহ বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, শৈত্যপ্রবাহের দিনসংখ্যা কম হলেও কোনো কোনো সময়ে তীব্র ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে। উত্তরাঞ্চলে রাতে আকাশ পরিষ্কার থাকা, হালকা বাতাস ও কুয়াশার পরিস্থিতিতে তাপমাত্রা দ্রুত কমে যেতে পারে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই তীব্র শীতের অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশে সাধারণত অক্টোবরের শেষ দিক থেকে তাপমাত্রা কমতে শুরু করে। নভেম্বরের শেষভাগে উত্তরের হিমেল বাতাসের প্রভাব বাড়ে। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকে শীতের মূল সময়। তবে এবার অক্টোবরজুড়ে দিনের বেলা গরম থাকার পর ধীরে ধীরে শীতের দিকে এগোতে পারে দেশ।

জলবায়ু পরিবর্তনে কমতে পারে শীতের ব্যাপ্তি

শীতের পূর্বাভাসের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রবণতারও মিল রয়েছে। নরওয়ের মেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদন ‘দ্য ফিউচার ক্লাইমেট অব বাংলাদেশ’-এ ভবিষ্যতে দেশে শীতের ব্যাপ্তি কমে যাওয়ার প্রবণতা তুলে ধরা হয়েছে।

গবেষণায় ১৯৮৫ থেকে ২০১৪ সালকে ঐতিহাসিক ভিত্তি ধরে ২০৪১-২০৭০ এবং ২০৭১-২১০০ সময়ের সম্ভাব্য জলবায়ু পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, শতাব্দীর শেষে শীতকালে দৈনিক গড় তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে।

শীত কমলে কৃষিতে কী প্রভাব পড়বে

শীতের স্থায়িত্ব ও তীব্রতা কমে গেলে কৃষিতেও প্রভাব পড়তে পারে। শীতকালীন অনেক ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ভালো ফলনের জন্য নির্দিষ্ট মাত্রার ঠান্ডা প্রয়োজন। তাপমাত্রা বেশি থাকলে কিছু ফসলের চাষের সময়সূচি ও উৎপাদনে পরিবর্তন আসতে পারে।

অন্যদিকে, বৃষ্টিপাত কমে গেলে মাটির আর্দ্রতা কমতে পারে। এতে শীতকালীন ফসল ও পরবর্তী বোরো ধানের জন্য সেচের প্রয়োজন বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়তে পারে। আবার বৃষ্টি কম হলেও ঘন কুয়াশা দীর্ঘস্থায়ী হলে শীতকালীন সবজি ও আলুসহ কিছু ফসলে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে অঞ্চল, তাপমাত্রা, মাটির আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত ও কুয়াশার স্থায়িত্বের ওপর।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মঞ্জুরুল কাদির বলেন, প্রতিটি ফসলের জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রা প্রয়োজন। আলু, গম, ভুট্টা, সরিষা ও টমেটোর মতো শীতকালীন ফসলের জন্য ১০ থেকে ১২ কিংবা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা টানা প্রায় আড়াই মাস থাকা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ সময়ে তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকলে ফসলের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন কমে যেতে পারে।

তিনি বলেন, তাপমাত্রা বেড়ে গেলে ফসল দ্রুত পরিণত হয়, ফলে ফলন কমে যায়। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে ওই ফসলের আবাদ কমিয়ে দিতে পারেন। দেশে গমের উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনেও এ ধরনের প্রভাব রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শক্তিশালী এল নিনোর পূর্বাভাস

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরে এল নিনো সর্বোচ্চ শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। সংস্থাটির আশঙ্কা, এটি ১৯৫০ সালের পর নথিভুক্ত সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো ঘটনাগুলোর একটি হতে পারে।

ডব্লিউএমওর মাসিক ‘গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্টোবর-নভেম্বর-ডিসেম্বর সময়ে মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় পরিবর্তন আসার আশঙ্কা রয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে খরা ও বন্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেন, এল নিনো ইতোমধ্যে শক্তিশালী অবস্থায় পৌঁছেছে এবং আরও শক্তিশালী হচ্ছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রায় ১০০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে যে এ পরিস্থিতি ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বজায় থাকবে।

এল নিনোর প্রধান কেন্দ্র মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগর। এ অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন আসে। সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো দেখা দেয় এবং এটি ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হতে পারে।

ডব্লিউএমওর পূর্বাভাসে অক্টোবর-নভেম্বর-ডিসেম্বর সময়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এমনটি হলে তা হবে রেকর্ড সংরক্ষণ শুরুর পর সর্বোচ্চ তাপমাত্রার অন্যতম ঘটনা।

রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের


Warning: Undefined variable $sAddThis in /home/radio4to0da9y/public_html/details.php on line 536