দিন যায়, রাত যায় শাকিলের খোঁজ মিলে না। বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে আশপাশের পথঘাটের কোথাও মিলছিলো না ১৪ বছর বয়সি মানসিক ও শারিরিক প্রতিবন্ধী শিশু শাকিলের সন্ধান। গ্রামের মসজিদের মাইকেও এ নিয়ে প্রচারণা চালানো হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকেও শাকিল নিখোঁজ খবরটি ছড়ায়।
অবশেষে সীমান্তের ওপারে মিলল শাকিলের নিথর দেহ, ঠিক ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) মাচার পাশে। নিয়ম অনুযায়ি বিজিবি’র সহযোগিতায় ভারতীয় পুলিশ বাংলাদেশি শাকিলের লাশ নিয়ে যায়। আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার লাশ বাংলাদেশে পাঠানো হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী আব্দুল্লাহপুর গ্রামে আবুল বাশার ভূঁইয়া মালুর ছেলে মো. শাকিল।
মানসিকভাবে অসুস্থ ও শারিরিক প্রতিবন্ধী শাকিল বুধবার রাতে নিখোঁজ হয়। বোনের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শেষে মায়ের সঙ্গে শুয়ে থাকা অবস্থাতে সবার অলক্ষ্যে সে চলে যায় বলে দাবি পরিবারের।
তবে কে বা কারা এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না পরিবারের সদস্যরা। নিজেদের শত্রু নেই বলে তারা উল্লেখ করেছেন। আবার গায়ে আঘাতের চিহ্ন আছে বরাত নিয়ে সন্দেহ পোষণ করছেন।
‘জিন-ভ‚তের ’ কোনো আছড় আছে কি-না এটা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। বিয়ে উপলক্ষে হওয়া গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানে উচ্চস্বরে গান বাজানোর জন্য ‘জিন-ভূত’ আক্রমন করে থাকতে পারে বলেও পরিবারের সদস্যরা ধারণা পোষণ করেন।
বিএসএফের পক্ষ থেকে বিজিবিকে জানানো হয়েছে যে, শিশু শাকিলের শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন নেই। তবে শাকিলের পরিবারের লোকজন শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত থাকার অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও তুলেছেন তারা।
রবিবার সকালে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শাকিলদের বাড়ি একেবারে ভারত সীমান্ত ঘেঁষা। একটি বাড়ি পেরিয়ে ক্ষেতের আইল দিয়ে মিনিট খানেক হাঁটার পরই ভারত সীমান্ত। এখানে একপাশে বিজিবি’র একটি অস্থায়ী ‘মাচা’ ও অপরপ্রান্তে বিএসএফ’র ‘মাচা’ রয়েছে। শাকিলের লাশ যেখানে পাওয়া গেছে সেটি এপ্রান্ত থেকে দেখিয়ে দিলেন স্থানীয় লোকজন।
এদিকে মানুষের ভিড়ের মাঝেও শাকিলদের বাড়িতে যেন নিস্তবদ্ধতা। প্রিয় সন্তানকে ফিরে পেলেও তাকে বুকে জড়িয়ে নেওয়ার সুযোগটুকু তখনো পায়নি পরিবার। নিয়মের বেড়াজালে আটকে যাওয়ার তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় ভারতে। সেখানে লাশের ময়না তদন্ত শেষে পাঠানো হবে- এমন অপেক্ষায় স্বজনরা। সুযোগ পেলেই সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি’র কাছে গিয়ে শাকিলের লাশ আসার সময়টা স্বজনরা জানতে চাইছেন। বিজিবি ও স্থানীয় লোকজন সীমান্ত এলাকায় দাঁড়িয়ে কোন এলাকায় শাকিলের লাশ পাওয়া যায় সেটির ধারণা দিলেন। বিকেল পাঁচটার দিকে শাকিলের লাশ আখাউড়া থানা পুলিশের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
স্থানীয় সাতজনসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাঁটাতারের বেড়ার পাশে ভারতীয় অংশের লঙ্কামোড়া এলাকায় একটি শিশুর লাশ পড়ে আছে বলে শনিবার রাত নয়টার দিকে খবর আসে। তবে তখনো জানা হয়নি লাশটি কার। লাশের পরিচয় সনাক্তে বিজিবি ও বিএসএফ’র তরফ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়। শাকিলের পরিবারের চার সদস্য গিয়ে তাকে সনাক্ত করে। রাতে আলোচনার মাধ্যমে লাশ নিয়ে যায় বিএসএফ।
বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শাকিলের মা হরুফা বেগম মাটিতে বসে বিলাপ করছেন। অনেকে তাকে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, ‘কখন আমার ছেলে চলে গেলো আমি জানি না। কিভাবে কি হয়েছে সেটাও বুঝে উঠতে পারছি না।’
শাকিলের বাবা আবুল বাশার মালু বলেন, ‘কখন কিভাবে আমার ছেলে গভীর রাতে বের হয়েছে সেটা আমরা বলতে পারছি না। শাকিল তার মায়ের সঙ্গেই ঘুমিয়ে ছিলো। গভীর রাতে কখন সে বেরিয়ে যায় সেটা তার মাও বলতে পারছে না। বিএসএফ’র মাধ্যমে খবর পেয়ে সীমান্তে লাশ পড়ে থাকার বিষয়টি জানায় বিজিবি। গভীর রাতে ভারত সীমান্ত এলাকায় গিয়ে শাকিলকে সনাক্ত করা হয়।’
শাকিলের চাচা আবুল কালাম ভূঁইয়া বলেন, ‘আমার ভাতিজার শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তবে আমাদের কোনো শত্রু নেই। শাকিলকে মানুষে মারলো নাকি আলগা কিছু (জ্বিন-ভূত) মারলো সেটা বুঝতে পারছি না। এক পীর বলেছিলেন আমাদের বাড়িতে যেন গানবাজনা না হয়। তবে শাকিলের বোনের বিয়েতে গান বাজানো হয়। ওই রাতেই ঘটনা ঘটে।’
দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. ইদ্রিস মিয়া বলেন, ‘দু’দিন ধরে শিশুটিকে পাওয়া যাচ্ছিলো না। বিজিবির মাধ্যমে খবর পেয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় যে তার লাশ ভারত সীমান্তে আছে। সেদেশের পুলিশ ময়না তদন্তের জন্য লাশ নিয়ে যায়। তবে কিভাবে কি ঘটেছে পরিবারের লোকজনও বলতে পারছে না।’
লাশটি ভারতীয় অংশে পাওয়া গেছে বিধায় বিজিবি-বিএসএফ এবং দুই দেশের পুলিশের আলোচনার মাধ্যমে সেটি ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে বলে জানান বিজিবি ২৫ ব্যাটালিয়নের লে. কর্নেল জাব্বার আহমেদ। ময়নাতদন্ত শেষে রবিবার বিকেলে লাশ ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে জানান বিজিবি’র ওই কর্মকর্তা।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

