মঙ্গলবার,

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,

৭ আশ্বিন ১৪৩৩

মঙ্গলবার,

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,

৭ আশ্বিন ১৪৩৩

Radio Today News

আমার সোনা মা কোথায়? ‘আমি কাকে আম্মু বলে ডাকবো’

রেডিওটুডে রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১২:১৩, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Google News
আমার সোনা মা কোথায়? ‘আমি কাকে আম্মু বলে ডাকবো’

খুলনা নগরের সিদ্দিকীয়া মহল্লার কাছেই নাহিদ হাসানদের পারিবারিক ভবন। গতকাল দুপুরে বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, পরিবারের অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলছে নাহিদ ও নুসরাত জাহান দম্পতির দুই সন্তান-বড় ছেলে রাইয়ান হাসান ও ছয় বছরের রওদা হাসান। 

রাইয়ান কিছুটা শোকাচ্ছন্ন। মায়ের চলে যাওয়ার অর্থ সে বুঝতে পারছে। কিন্তু ছয় বছরের রওদা এখনো বুঝে উঠতে পারেনি, কেন তার মা আর ঘরে ফিরছেন না। তাই মাঝেমধ্যে স্বজনদের কাছে জানতে চায়, ‘আমি কাকে আম্মু বলে ডাকব?’

এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই পরিবারের কারও কাছে।

নাহিদের বড় ভাই মাহমুদ হাসান সোহেল বলেন, ‘ওদের সুখের সংসার ছিল। নতুন সদস্যের আগমন নিয়ে আমরা সবাই উচ্ছ্বসিত ছিলাম। কীভাবে কী হয়ে গেল, এখনো বুঝতে পারছি না। ছোট মেয়েটার জন্য বেশি খারাপ লাগছে। মাঝেমধ্যে ও প্রশ্ন করছে, “আমি কাকে আম্মু বলে ডাকব?”’

নাহিদ হাসান ও নুসরাত জাহান দম্পতির তৃতীয় সন্তান আসার অপেক্ষা করছিলেন পরিবারের সবাই। চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করে ২০ সেপ্টেম্বর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের তারিখও ঠিক হয়েছিল। অনাগত সন্তানের নামও ঠিক করা ছিল। ঘরজুড়ে ছিল নতুন অতিথিকে বরণ করার প্রস্তুতি ও অপেক্ষা।

তারপর হঠাৎ সব বদলে গেল।

১৮ সেপ্টেম্বর নুসরাতের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। রক্তের প্লাটিলেট নেমে যায় ৬২ হাজারে। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন অবস্থার অবনতি হলে প্রয়োজন হয় আইসিইউর। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে চেষ্টা করেও আইসিইউ শয্যা মেলেনি। শেষ পর্যন্ত ঢাকার উদ্দেশে অ্যাম্বুলেন্সে রওনা হন নাহিদ। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই, ভাঙ্গার কাছে নুসরাত নিস্তেজ হয়ে পড়েন।

স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বাঁচানো যায়নি তার গর্ভের সন্তানকেও।

নুসরাতের পরিবারের সদস্যরা জানান, তিনি বটিয়াঘাটার ইউসুফিয়া দাখিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। গর্ভধারণের পর চাকরি ছেড়ে দেন। সন্তানদের নিয়েই ছিল তার ব্যস্ততা। বড় ছেলে রাইয়ানের ডেঙ্গু ধরা পড়েছিল ১৫ সেপ্টেম্বর। অন্য শিশুদের মশা থেকে দূরে রাখার জন্য নুসরাতই সবচেয়ে বেশি সতর্ক করতেন।

নুসরাতের স্বামী নাহিদ হাসান খুলনার গ্রামীণফোন সেন্টারের ডেপুটি ইনচার্জ হিসেবে কাজ করেন। স্ত্রী ও অনাগত সন্তানকে হারিয়ে এখন তার সামনে শুধু দুই সন্তানকে নিয়ে নতুন এক জীবন। নাহিদ বলেন, ‘কীভাবে কী হয়ে গেল, কিছুই বুঝতে পারছি না!’

মাকে খুঁজছে দেড় বছরের কেয়া

নুসরাতের মতোই আরেকটি পরিবারেও এখন শূন্যতা। তবে সেই শূন্যতার অর্থ বোঝার বয়স হয়নি দেড় বছরের কেয়া নামের শিশুটির।

খুলনা নগরের বসুপাড়ায় সাদিয়া আফরিন সুমাইয়ার বাবার বাড়ি। দ্বিতীয়বার গর্ভধারণের পর সেখানেই ছিলেন তিনি। স্বামী শেখ ইশতিয়াজ সম্রাট পেশায় আইনজীবী। তাদের দেড় বছরের মেয়ে কেয়া।

কয়েক দিন ধরে জ্বর ছিল সুমাইয়ার। বাড়িতে মা-বাবাও অসুস্থ ছিলেন। ১৬ সেপ্টেম্বর তার মায়ের ডেঙ্গু ধরা পড়ে। ১৮ সেপ্টেম্বর বাবারও ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। নিজের জ্বরকে গর্ভকালীন কোনো সমস্যা ভেবেছিলেন সুমাইয়া। তাই হাসপাতালে যাননি।

১৯ সেপ্টেম্বর রাতে হঠাৎ শরীরে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। স্বজনেরা দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু আইসিইউ না থাকায় এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে হয় স্বজনদের। কোথাও শয্যা খালি ছিল না। শেষ পর্যন্ত তাঁকে লেবার ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।

পরদিন ভোরে মারা যান সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা সুমাইয়া। তার গর্ভের সন্তানকেও বাঁচানো যায়নি।

সুমাইয়ার মৃত্যুর পরও বিষয়টি বুঝতে পারেনি ছোট্ট কেয়া। সে শুধু মাকে খোঁজে। একটু পরপর স্বজনদের কাছে জানতে চায়, ‘আমার সোনা মা কোথায়?’

সুমাইয়ার এক স্বজন জানান, শেষ সময়ে তাকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও কোথাও আইসিইউ শয্যা পাওয়া যায়নি। শারীরিক অবস্থা বেশি খারাপ থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে ডেঙ্গু পরীক্ষাও করা হয়নি। তার মৃত্যুসনদে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এখন কেয়া আছে তার খালা মারজিয়ার কাছে। ঘরের মানুষজন তাকে আগলে রাখছেন। মারজিয়া বলেন, ‘মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি এখনো বুঝতে পারছে না কেয়া। একটু পরপর বলছে, “আমার সোনা মা কোথায়?”’

রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের


Warning: Undefined variable $sAddThis in /home/radio4to0da9y/public_html/details.php on line 536