বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে টেকসই ও কম কার্বন-ভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তি, অর্থায়ন, গবেষণা ও দক্ষতা বিনিময় জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের আইন ও পরিবেশগত আইন ও নীতি গবেষক সহকারী অধ্যাপক প্রীতি কনা সিকদার।
সোমবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বঙ্গোপসাগরে সমুদ্র অর্থনীতি এবং টেকসই উন্নয়ন’ অধিবেশনে ‘ব্লু কার্বন-ভিত্তিক টেকসই উন্নয়ন: বঙ্গোপসাগরে নতুন অর্থনীতি নিশ্চিতকরণ—বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার সুযোগ’ শীর্ষক উপস্থাপনায় তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রীতি কনা সিকদার বলেন, ‘বঙ্গোপসাগর বিশ্বের অন্যতম উৎপাদনশীল সামুদ্রিক অঞ্চল। প্রায় ১৬ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন, জ্বালানি ও পর্যটনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। তবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে এ অঞ্চলের পরিবেশ ও অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে পড়ছে।‘
তিনি বলেন, ‘ম্যানগ্রোভ, জোয়ারভাটা-নির্ভর লবণাক্ত জলাভূমি ও সমুদ্রঘাসের মতো উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র বিপুল পরিমাণ কার্বন শোষণ ও সংরক্ষণ করতে পারে। একইসঙ্গে এসব বাস্তুতন্ত্র ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেয় এবং মাছের প্রজননক্ষেত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।‘
তার মতে, ব্লু কার্বন সংরক্ষণ শুধু জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার উপায় নয়; এটি দুর্যোগসহনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের ব্লু কার্বনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ সুন্দরবনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনটি বাংলাদেশ ও ভারতের উপকূলজুড়ে বিস্তৃত এবং বাংলাদেশের ব-দ্বীপকে প্রাকৃতিক সুরক্ষা দিয়ে আসছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ জোয়ারভাটা অঞ্চল, কাদামাটি ও নতুন জেগে ওঠা জলাভূমিও গুরুত্বপূর্ণ ব্লু কার্বন সম্পদ।‘
তবে চিংড়ি চাষের সম্প্রসারণ, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ ও ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার কারণে এসব বাস্তুতন্ত্রের ওপর চাপ বাড়ছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশে ব্লু কার্বন মজুদের পূর্ণাঙ্গ ও উচ্চ-রেজল্যুশনের জাতীয় তথ্যভান্ডারের ঘাটতি রয়েছে বলেও জানান তিনি।
ব্লু কার্বন উন্নয়নে বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে প্রীতি কনা সিকদার বলেন, কার্বন মজুদ পরিমাপ, রিপোর্টিং ও যাচাইয়ের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক কার্বন বাজার ও অর্থায়নের সঙ্গে সংযোগ জোরদারের পাশাপাশি স্যাটেলাইট রিমোট সেন্সিং, স্থানিক পরিকল্পনা ও বৃহৎ পরিসরে বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রযুক্তি ব্যবহারেও গুরুত্ব দিতে হবে। বন, মৎস্য, পানি ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়ও আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে চীনের প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ম্যানগ্রোভ ও উপকূলীয় জলাভূমি পুনরুদ্ধার, উপকূল ব্যবস্থাপনা, টেকসই মৎস্য ও জলজ চাষ এবং সামুদ্রিক স্থানিক পরিকল্পনায় চীনের অর্জিত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।‘
বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার পাঁচটি সম্ভাব্য ক্ষেত্রও তুলে ধরেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে সুন্দরবন ও অন্যান্য উপকূলীয় এলাকায় যৌথ পরীক্ষামূলক পুনরুদ্ধার প্রকল্প, স্যাটেলাইটভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ও কার্বন পরিমাপ প্রযুক্তি হস্তান্তর, সবুজ অর্থায়নের কাঠামো তৈরি, যৌথ গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারের উপযোগী প্রকল্প তৈরিতে বাংলাদেশকে সহায়তা।
তিনি প্রস্তাব দেন, ‘প্রথম তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশ ও চীন যৌথভাবে একটি বিস্তৃত জাতীয় ব্লু কার্বন মজুদের তথ্যভাণ্ডারের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। পরবর্তী দুই বছরে পরীক্ষামূলক পুনরুদ্ধার প্রকল্পের সঙ্গে কার্যকর কার্বন পরিমাপ, রিপোর্টিং ও যাচাইব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। সফল প্রকল্পগুলো পরবর্তী পর্যায়ে জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ করে কার্বন বাজারের সঙ্গে যুক্ত করারও প্রস্তাব দেন তিনি।
এ জন্য দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে একটি দ্বিপক্ষীয় ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি।
প্রীতি কনা সিকদার বলেন, ‘ব্লু কার্বন কেবল পরিবেশগত কোনো বিষয় নয়; এটি বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশ ও চীন নিজেদের প্রযুক্তি, অর্থায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা, পরিবেশগত জ্ঞান ও নীতিগত সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এ ক্ষেত্রে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারে।‘
তিনি আরও বলেন, ‘পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত বাংলাদেশ-চীন ব্লু কার্বন অংশীদারত্ব ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে বৃহত্তর সামুদ্রিক পরিকল্পনা ও টেকসই উন্নয়নে সহযোগিতার একটি মডেল হয়ে উঠতে পারে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

