বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচার ও অবৈধ অর্থ স্থানান্তর ঠেকাতে বড় অঙ্কের আমদানির ক্ষেত্রে নতুন নজরদারি ব্যবস্থা চালু করেছে সরকার। এখন থেকে ৩০ লাখ মার্কিন ডলার বা তার বেশি মূল্যের কোনো আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে বাংলাদেশ ব্যাংককে তথ্য দিতে হবে।
একই সঙ্গে আমদানিকারক ও বিদেশি রপ্তানিকারকের পরিচয়, পণ্যের বিবরণ, মূল্য এবং বাণিজ্যিক নথিপত্র আরো কঠোরভাবে যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নতুন আমদানিনীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের সাম্প্রতিক নির্দেশনার মাধ্যমে এসব বিধান কার্যকর করা হয়েছে। নিয়ম লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, ৩০ লাখ ডলার বা তার বেশি মূল্যের আমদানির ক্ষেত্রে অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংককে এলসি খোলার কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা আগে অনলাইন আমদানি তদারকি ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিতে হবে।
সরকারি আমদানি এই বাধ্যবাধকতার বাইরে থাকবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বড় অঙ্কের আমদানির ক্ষেত্রে অতিমূল্যায়ন, ভুয়া চালান, ভুল পণ্যের বিবরণ এবং বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচারের ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগের বিষয়। নতুন ব্যবস্থার ফলে আমদানি কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনা করা সম্ভব হবে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, শুধু পণ্যের তথ্য নয়, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার ধরন, লেনদেনের যৌক্তিকতা এবং আর্থিক সক্ষমতাও যাচাই করতে হবে।
একই সঙ্গে বিদেশি রপ্তানিকারকের পরিচয়, ব্যাবসায়িক কার্যক্রম এবং লেনদেনের গ্রহণযোগ্যতাও পরীক্ষা করতে হবে। পণ্যের ঘোষিত মূল্য, বাণিজ্যিক চালান, শিপিং ডকুমেন্ট এবং অন্যান্য কাগজপত্রের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও ব্যাংকগুলোর ওপর দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, আগে আমদানি লেনদেনের বিভিন্ন ধাপে তথ্য সংগ্রহ করা হলেও বড় অঙ্কের আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খোলার আগেই বাংলাদেশ ব্যাংককে তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল না। নতুন ব্যবস্থার ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগাম তথ্য পাবে এবং প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন সম্পর্কে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৩ আগস্ট জারি করা বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের ১ নম্বর সার্কুলারের ৩০ নম্বর নির্দেশনায় বড় অঙ্কের আমদানি লেনদেন, এলসি খোলা, তথ্য সংরক্ষণ এবং রিপোর্টিংয়ের বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এতে আমদানিসংক্রান্ত বৈদেশিক মুদ্রা বিধি-বিধানও একীভূত করা হয়েছে।
এলসিভিত্তিক আমদানির পাশাপাশি এলসি ছাড়া অনুমোদিত শিল্প আমদানি এবং নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে অনুমোদিত বাণিজ্যিক আমদানির তথ্যও অনলাইন ব্যবস্থায় রিপোর্ট করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে লেনদেনের ধরন এবং প্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক নথিপত্রের তথ্যও জমা দিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচারের অন্যতম কৌশল হলো পণ্যের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্য দেখিয়ে বিদেশে অর্থ পাঠানো। আবার অনেক ক্ষেত্রে ঘোষিত পণ্য ও প্রকৃত আমদানীকৃত পণ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্যও দেখা যায়। নতুন নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব অনিয়ম শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়বে।
এ ছাড়া বড় অঙ্কের আমদানির তথ্য আগাম পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর সম্ভাব্য চাপ সম্পর্কেও বাংলাদেশ ব্যাংক আগে থেকেই ধারণা পাবে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা আরো কার্যকর করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, অর্থপাচার রোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন হলেও বৈধ আমদানিতে যেন অযথা বিলম্ব না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও উৎপাদনসংশ্লিষ্ট জরুরি পণ্যের ক্ষেত্রে দ্রুত যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা জরুরি।
এ বিষয়ে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেকোনো অঙ্কের আমদানির ক্ষেত্রেই যথাযথ যাচাই-বাছাই থাকা উচিত। আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকের পরিচয়, পণ্যের প্রকৃত মূল্য এবং বাণিজ্যিক নথিপত্রের সঠিকতা নিশ্চিত করা গেলে বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।’
তার মতে, নতুন ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়ন হলে আমদানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

