বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেছেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশের পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে ধারাবাহিক নিয়ন্ত্রক, ডিজিটাল ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়ন করছে বিএসইসি।
রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন. বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামে ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আজ বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান এসব সংস্কারের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম তিন মাসে পুঁজিবাজারকে আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও বিনিয়োগবান্ধব করতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম বড় পদক্ষেপ ছিল ২০২৩ সালে চালু করা ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার। বাজার সচল করা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এ পদক্ষেপ জরুরি ছিল।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাজারের লেনদেনে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সেপ্টেম্বরে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক বিক্রির প্রবণতাতেও পরিবর্তন এসেছে।
বেক্সিমকো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির সংকটের পর কমিশন এটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করেছে এবং লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে কোম্পানিটির তালিকাচ্যুতির ঝুঁকি এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে।
প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বাজারের দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে নতুন প্রক্রিয়া চালুর কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আগে একটি আইপিও অনুমোদনে দেড় থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগত। নতুন ব্যবস্থায় এ সময় ৯০ দিনে আনা হবে। আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরাসরি তালিকাভুক্তির (ডাইরেক্ট লিস্টিং) জন্য নতুন কাঠামো চালু করা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে যোগ্যতার শর্ত কঠোর করা হয়েছে, যাতে কেবল অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ও মানসম্পন্ন কোম্পানি এ সুবিধা নিতে পারে। বহুজাতিক ও বড় স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আকৃষ্ট করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, হাইব্রিড আইপিও ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কোম্পানিগুলো জনসাধারণের কাছ থেকে মূলধন সংগ্রহ এবং শেয়ার ছাড়ার ক্ষেত্রে আরও নমনীয়তা পাবে। তালিকাভুক্তি বিধিমালার আওতায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রক্রিয়া দ্রুত হয় এবং ডি-রেগুলেশন কার্যকর হয়।
বিনিয়োগকারী সুরক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের সহায়তায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে অতীতে যা ঘটেছে, তা আর ঘটতে দেওয়া যাবে না। এ জন্য পুঁজিবাজারে ডিজিটাইজেশন ও রিয়েল-টাইম নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।
তিনি জানান, ব্রোকারদের জন্য একটি সমন্বিত ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের সিকিউরিটিজ ও ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে রিয়েল-টাইম ভিত্তিতে যুক্ত থাকবে। অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমেও শক্তিশালী ব্যবস্থা চালু করা হবে। স্বয়ংক্রিয় কনফার্মেশন এবং লেনদেন-সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় কাগজভিত্তিক স্বাক্ষর বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে ম্যানুয়াল নথিপত্রের মাধ্যমে সংঘটিত প্রতারণা কমানো সম্ভব হবে।
ক্যাপিটাল মার্কেট ট্রাইব্যুনালকে আরও কার্যকর করতে সিকিউরিটিজ আইন ও সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ সংশোধনের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি। সংশোধন কার্যকর হলে সরাসরি ট্রাইব্যুনালে মামলা করার সুযোগ তৈরি হবে এবং মামলা নিষ্পত্তির সময় কমবে।
তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে এক্সবিআরএল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোর কার্যকারিতা ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিসিবিএল) মাধ্যমে নতুন ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ চলছে বলেও জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। এর মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজারের অবকাঠামো আরও আধুনিক হবে।
পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে শক্তিশালী বন্ড মার্কেটের বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর ইতোমধ্যে কয়েকটি বন্ড অনুমোদন করা হয়েছে।
বন্ড লেনদেনের জন্য ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানকে মূল বোর্ডে আসার শর্ত দেওয়া হয়েছে। এতে বন্ড বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি কার্যকর এক্সিট ব্যবস্থা তৈরি হবে এবং বন্ড মার্কেটের টেকসই বিকাশে সহায়তা করবে।
তিনি বলেন, অরেঞ্জ বন্ডসহ বিভিন্ন থিমেটিক বন্ড এবং গ্রিন বন্ড সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখতে পারে। করপোরেট বন্ড বাজার সম্প্রসারণে বিমা কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আরও সক্রিয় করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি ফান্ডের একটি অংশ যাতে শুধু সরকারি বিল ও বন্ডে সীমাবদ্ধ না থেকে করপোরেট বন্ড ও ইক্যুইটিতে বিনিয়োগ করতে পারে, সে জন্যও একটি কাঠামো তৈরির কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া রাইটস ইস্যুসহ পুঁজিবাজারের অন্যান্য কার্যক্রমের বিধিমালা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাজারের আকার ও লেনদেন সম্পর্কে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, দেশের বাজার মূলধনের তুলনায় দৈনিক শেয়ার লেনদেন এখনো কম এবং আঞ্চলিক বাজারগুলোর তুলনায়ও তা নিচে। বাজার মূলধন বাড়ানো গেলে স্বাভাবিকভাবেই লেনদেনের পরিমাণও বাড়বে।
তিনি বলেন, এসব সংস্কারের লক্ষ্য শুধু লেনদেনের পরিমাণ বাড়ানো নয়; বরং পুঁজিবাজারের স্থিতিস্থাপকতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহের আয়োজন শুধু এক সপ্তাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বছরজুড়ে অব্যাহত কার্যক্রমে রূপ দেওয়া প্রয়োজন।
বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থা জোরদারের লক্ষ্যেই সপ্তাহব্যাপী ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬’-এর আয়োজন করা হয়েছে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

