গ্লেনরিচ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের বার্ষিক টিউশন ফি ১৫ থেকে ২১ শতাংশ বর্ধিত ফি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন শীক্ষার্থীদের অভিভাবকরা। যদিও নির্ধারিত সময়ে টিউশন ফি না দিলে শিক্ষার্থীদের ভর্তি বাতিল করা হবে বলে জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৬ জুলাই টিউশন ফি বৃদ্ধির নোটিশ দেয় গ্লেনরিচ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল। সাঁতারকুল ও উত্তরা উভয় ক্যাম্পাসের এই নোটিশে ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে ফি জমা দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। এ অবস্থায় টিউশন ফি জমাদানের শেষ দিনেও অন্তত ৭০৪ জন শিক্ষার্থীর টিউশন ফি জমা দেননি।
বিদেশি কারিকুলামে পরিচালিত বেসরকারি বিদ্যালয়ে নিবন্ধন বিধিমালা, ২০১৭-এর ১৯ বিধি অনুযায়ী, প্রতিবছর সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত টিউশন ফি বৃদ্ধি অনুমোদিত। এ ছাড়া ২০১৭ সালের ২৫ মে হাইকোর্টের নির্দেশনায় ইংরেজি মাধ্যম স্কুল পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ, অভিভাবক, শিক্ষক ও স্কুল কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটি অনুমোদন, অডিট হিসাব প্রকাশ ইত্যাদি বিষয় নির্ধারিত হয়েছে। ওই আদেশে টিউশন ফি নির্ধারণের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সমন্বয়ে গঠিত ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে অভিভাবকরা বলছেন, গ্লেনরিচ ইন্টারন্যাশনাল বিধিমালার অপব্যাখ্যার পাশাপাশি আদালতের নির্দেশনাও লঙ্ঘন করেছে।
দুই সেশনের টিউশন ফি-র তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত সেশনের তুলনায় চলতি সেশনে প্লে থেকে গ্রেড ৮ পর্যন্ত একই শ্রেণিতে ১০ শতাংশ হারে টিউশন ফি বৃদ্ধি ফি পেয়েছে। গ্রেড ৯ ও গ্রেড ১০-এ এটি ৯.৮৭ ও ৯.৮৮ শতাংশ। আর গ্রেড ১১ ও গ্রেড ১২-তে এটি বৃদ্ধি পেয়েছে ১০.১০ শতাংশ হারে।
এক গ্রেড থেকে পরের গ্রেডে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে টিউশন ফি বৃদ্ধির হার অনেক বেশি। হিসাব অনুযায়ী, প্লে থেকে কেজি-১ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীকে এবার গুণতে হচ্ছে ১৪.৫৪ শতাংশ বেশি টিউশন ফি। একইভাবে কেজি থেকে গ্রেড ১-এ ১৬.৭৪, গ্রেড ২ থেকে গ্রেড ৩-এ ১৬, গ্রেড ৪ থেকে গ্রেড ৫-এ ২০.৪৪, গ্রেড ৫ থেকে গ্রেড ৬-এ ১৩.৬১, গ্রেড ৭ থেকে গ্রেড ৮-এ ২১.৭৫, গ্রেড ৮ থেকে গ্রেড ৯-এ ১১.০১, গ্রেড ১০ থেকে গ্রেড ১১-তে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীকে গুণতে হচ্ছে ২১.৪ শতাংশ বর্ধিত টিউশন ফি। গ্রেড ১ থেকে গ্রেড ২, গ্রেড ৩ থেকে গ্রেড ৪ এবং গ্রেড ৬ থেকে গ্রেড ৭-এ উত্তীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ এবং কেবলমাত্র গ্রেড ৯ থেকে গ্রেড ১০-এ উত্তীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে ফি বেড়েছে ৯.৯ শতাংশ।
তথ্য বলছে, ২০২১-২২ সেশন থেকে ২০২৬-২৭ সেশনে প্রতিষ্ঠানটির ৬ সেশনে অধিকাংশ গ্রেডে প্রায় ৫৮ থেকে ৬০ শতাংশ টিউশন ফি বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি নার্সারিতে বৃদ্ধি পেয়েছে ৭০.৭৬ শতাংশ। আর টাকার অঙ্কে দশম গ্রেডে বেড়েছে ১ লক্ষ ৪৫ হাজার ৯৪৩ টাকা। তবে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে এর হার আরও অনেক বেশি। হিসাব অনুযায়ী, ২০২১-২২ সেশনে নার্সারিতে ভর্তি হওয়া শিশুটি বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে। ভর্তি হওয়ার সময় তার টিউশন ফি ছিল ১ লক্ষ ৫৫ হাজার ৪২০ টাকা। আর এখন ৫ম শ্রেণিতে তাকে গুণতে হচ্ছে ৩ লক্ষ ৩৮ হাজার ৫৮০ টাকা, যা ভর্তি বছরের তুলনায় ১১৮ শতাংশ বেশি।
গত ৬ জুলাই নোটিশ প্রকাশের পর বর্ধিত ফি নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা ১১ জুলাই এটি পুনর্বিবেচনার জন্য পিটিশন দাখিল করেন। এই আবেদন এসটিএস গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মানাস সিংয়ের কাছে পাঠানো হয়। এতে ৭০৪ জন শিক্ষার্থীর ৫৫৬ জন অভিভাবক সই করেন।
তাদের আবেদনে বলা হয়, শিক্ষার্থী ভর্তির সময় তাদের জানানো হয়েছিল যে ২.৪ থেকে ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক টিউশন ফি বর্ধিত করা হবে। এই তথ্যের ভিত্তিতে পরিবারগুলো তাদের আর্থিক পরিকল্পনা সাজিয়েছিল। কিন্তু এখন এই সংখ্যা বার্ষিক ১৫ থেকে ২১ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে, যা আর্থিক পরিকল্পনায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। অভিভাবকরা যুক্তিসঙ্গত ন্যায্য ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে নন জানিয়ে চিঠিতে আরও বলা হয়, পরিবারের ওপর প্রভাব ফেলা যে কোনো বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ, যুক্তিসঙ্গত ও পরামর্শমূলকভাবে গ্রহণ করা উচিত।
চিঠিতে এসটিএস গ্রুপের কাছে তিনটি দাবি জানানো হয়। এগুলো হলো— প্রস্তাবিত টিউশন ফি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা ও সাময়িক স্থগিত করা, অভিভাবক প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপের আয়োজন এবং ১৫ জুলাইয়ের আগে অভিভাবকদের উদ্বেগের জবাব দেওয়া।
এই চিঠির পর গত ১৩ জুলাই একটি লিখিত জবাবে টিউশন ফি বৃদ্ধির যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেন এসটিএস গ্রুপের সিইও মানাস সিং। অভিভাবকদের পাঠানো ফিরতি মেইলটিতে টিউশন ফি বৃদ্ধির পেছনে স্কুলের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেন মানাস সিং। তিনি বলেন, প্রতিটি শ্রেণির বার্ষিক ফি ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ ছাড়া স্কুলের পরিচালন ব্যয় এখন ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্কুল নিজে বহন করছে বলেও উল্লেখ করেছেন মানাস সিং।
টিউশন ফি বৃদ্ধির যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে মানাসি সিং বলেন, শিক্ষকদের মানোন্নয়ন, শিক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তি, শিক্ষা উপকরণের খরচ এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও ইউটিলিটি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে বিদ্যালয়টির পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, রোবোটিক্স, স্টেম, রয়্যাল স্কুল অব মিউজিক (লন্ডন), ম্যাথবাডি, অ্যালায়েন্স ফ্রঁসেজ ও সিমুলেশন-ভিত্তিক শিক্ষা— এসব সংযুক্তির জন্য বার্ষিক খরচ বাড়ে। একই সঙ্গে শিক্ষক ও কর্মীদের বেতন, পেশাগত উন্নয়ন, পরিচালন ব্যয়, ক্যাম্পাস রক্ষণাবেক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও নতুন শিক্ষামূলক উদ্যোগে ব্যয় ১০ শতাংশের অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক জানান, এসটিএস গ্রুপের সিইও যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা পুরোপুরি অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর। স্কুলে জ্বালানির কী কাজ? আমরা তো ট্রান্সপোর্টের জন্য আলাদা ফি বহন করি। শিক্ষা উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধির কথাও তিনি বলেছেন, অথচ সেটাও বহন করি আমরা।
গ্লেনরিচ কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্যের পর গত ১৩ জুলাই রাতেই মানাস সিংকে পুনরায় একটি চিঠি দিয়েছেন অভিভাবকরা। এতে বলা হয়েছে, মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির হার অভিভাবকদের ওপরও পড়েছে। ফলে যথাযথ আলোচনা ও আগাম নোটিশ ছাড়া হঠাৎ করে এই টিউশন ফি বৃদ্ধি যৌক্তিক নয়।
এ ছাড়া বুধবার টিউশন ফি জমাদানের শেষ দিনেও অন্তত ৫৫৬ জন অভিভাবক তাদের ৭০৪ জন শিক্ষার্থীর টিউশন ফি জমা দেননি বলে নিশ্চিত করেছেন অভিভাবকরা। যৌথ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হওয়া পর্যন্ত টিউশন ফি প্রদানে বিরত থাকবেন বলেও জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে এসটিএস গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মানাস সিংকে ই-মেইলে বার্তা পাঠানো হলে তিনি কোনো সাড়া দেননি।
সূত্র: ডেইলি ক্যাম্পাস

