মঙ্গলবার,

২৬ অক্টোবর ২০২১,

১০ কার্তিক ১৪২৮

পরীক্ষামূলক প্রকাশ

মঙ্গলবার,

২৬ অক্টোবর ২০২১,

১০ কার্তিক ১৪২৮

Radio Today News

পানামে প্রাণের আর্তনাদ

মেসবাহ শিমুল,অ্যাসিসট্যান্ট নিউজ এডিটর

প্রকাশিত: ১১:১৯, ১২ অক্টোবর ২০২১

আপডেট: ১২:১৮, ১২ অক্টোবর ২০২১

পানামে প্রাণের আর্তনাদ

দিনের বেলায় বিপুল দর্শনার্থীর দেখা মেলে ঐতিহাসিক পানাম নগরে

 ক্যা লেন্ডারের পাতায় হেমন্তের আগমন ঘটেছে। তবে প্রকৃতির বাস্তবরূপ খুবই রুক্ষ। গণগণে রোদ আর ভ্যাপসা গরমে অস্থির নগর জীবন। তাই রাজধানী থেকে ক্ষণিকের ছুটি নিয়ে গিয়েছিলাম অদূরের সোনাগাঁওয়ে। যেখানে রয়েছে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সমৃদ্ধির অতীত। শতশত বছরের পুরনো পানামনগর। শুক্রবার বিকেলে সেগুনবাগিচার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি থেকে চারজনের নিয়মিত দলটি যাত্রাশুরু করে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পৌঁছে যাই সোনারাগাঁওয়ে। তারপর হোটেলে ব্যাগ রেখে ঝটপট বেরিয়ে পড়ি। উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি। অটো যোগে চলে যাই মেঘনা নদীর তীরের বৈদ্যের বাজারে।

সূর্রর তেজ তখন পড়ে গেছে। সন্ধ্যাও চলে আসছে নিকটে। পন্টুনে দাড়িয়ে দেখছি মেঘনার বিশাল বক্ষ। মনে পড়ছে কবি হুমায়ুন কবীরের লেখা ‘মেঘনার ঢল’ কবিতাটি। কবিতার প্রধান চরিত্র কিশোরী আমিনাকেই যেন দেখতে পাচ্ছি আমি। মনে হলো ওপারে দ্বীপের মতো দাড়িয়ে থাকা ছোট্টগ্রামে গেলে আমি আমিনার দেখা পাবো। তাইতো দাড়িয়া ভাইকে রেখেই আমরা উঠে বসি নৌকায়। চাটাইয়ের ছাদে পা ছড়িয়ে বসার সে এক অন্যরকম অনুভূতি। ইঞ্জিনের নৌকা হলেও তেমন শব্দ নেই। নীরব-নিস্তব্ধের মেঘনায় জীবনের অনেক হিসাব নেই। কেবল বিশাল আকাশ আর নদীর স্বচ্ছ জলের মিতালী আছে। পাখিদের উড়ে যাওয়া দৃশ্য মুগ্ধ নয়নে দেখার সৌভাগ্য হলো। দীর্ঘদিন পর শহুরে জীবনের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে এই যে, প্রাণপ্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো সে এক সৌভাগ্যই বটে। তারপর দ্বীপে নেমে কিছুটা সময় কাটলো। দেখা পেলাম বালুচরে খেলা করা আমিনাদের। বালির ভাস্কর্ তৈরি করছে ছাবিনা, জাহানার আর নীরব। এরা এই চরেরই সন্তান। মেঘনাবক্ষেই ওদের বেড়ে উঠা। এ যেন আমিনাদেরই বংশপরম্পরা।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। মেঘনার স্রোত ঠেলে আমাদের নৌকা ছুটে চলছে বৈদ্যের বাজারের দিকে। দূরে দাঁড়িয়ে আছে আলো ঝলমলে বন্দরগুলো। মেঘনার নিটোল জলে ভেসে বেড়াচ্ছে কচুরিপানা। মেঘনার বুকে অসংখ্য নৌযান ছুটে চলে। আর আমরা ছুটে যাই সেই পানামের কাছে। হেমন্তের এই রাতটা যেখানে কাটাতে চাই।

পানাম নগর পৃথিবীর ১০০টি ধ্বংসপ্রায় ঐতিহাসিক শহরের একটি। ‘ওয়াল্ড মনুমেন্ট ফান্ড’ ২০০৬ সালে এ নগরীটিকে বিশ্বের ঐতিহাসিক স্থাপণার তালিকাভুক্ত করে। এটি মোঘল সুবেদার ঈসা খাঁ’র আমলে বাংলার রাজধানী। ১৯ শতকের গোড়ার দিকে হিন্দু ধনাঢ্য বক্তিদের হাতে সোনারগাঁর ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে অবস্থিত এই অসাধারণ জাঁকজমকপূর্ণ নগরী ওঠে। পানাম বাংলাদেশের ৪০০ বছর প্রাচীন বাংলাদেশের নগর ভিত্তীক একটি প্রাচীন নগরীর মডেল হিসেবে বিবেচিত।

এর প্রাচীনত্ব আরো গভীর হতে পারে। ফার্সি শব্দ ‘পাইনাম’ থেকে এসেছে পানাম, অর্থ আশ্রয়। যদিও এসব তথ্য নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত লক্ষ্য করা যায়।

ধারনা করা হয় ঐতিহাসিক ‘সড়কে-ই-আযম’ বা ‘গ্রান্ড ট্রাংঙ্ক রোডের’ সমাপ্তি এ পানাম নগরেই হয়েছিল। সে সুবাদে পানাম নগরী  ‘সরকার-ই-সোনারগাঁওয়ের’ পরগনার হেড কোয়ার্টার হিসেবেও বিবেচিত। পানামের প্রাচীনত্ব বহন করে ট্রেজারার হাউস, সেতু, কোস্পানীর কুঠি এবং প্রাচীন বনেদি ইমারত সমূহ। সোনারগাঁয়ের নান্দনিক চারু ও কারু শিল্পের জন্যে বিখ্যাত মসলিনের আড়ং ছিল পানাম নগর।

পানামের টিকে থাকা বাড়িগুলোর মধ্যে ৫২টি বাড়ি উল্লেখযোগ্য। পানাম সড়কের উত্তর পাশে ৩১টি আর দক্ষিণ পাশে ২১টি বাড়ি রয়েছে। বাড়িগুলোর অধিকাংশই আয়তাকার, উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত, উচ্চতা একতলা থেকে তিনতলা। বাড়িগুলোর স্থাপত্যে ঔপনিবেশিকতা ছাড়াও মোঘল, গ্রিক এবং গান্ধারা স্থাপত্যশৈলীর সাথে স্থানীয় কারিগরদের শিল্পকুশলতার অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায়। প্রতিটি বাড়িই ব্যবহারোপযোগিতা, কারুকাজ, রঙের ব্যবহার, এবং নির্মাণকৌশলের দিক দিয়ে উদ্ভাবনী কুশলতায় ভরপুর। ইটের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে ঢালাই-লোহার তৈরি ব্র্যাকেট, ভেন্টিলেটর আর জানালার গ্রিল। মেঝেতে রয়েছে লাল, সাদা, কালো মোজাইকের কারুকাজ। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই খিলান ও ছাদের মধ্যবর্তি স্থানে নীল ও সাদা ছাপ দেখা যায়। এছাড়া বাড়িগুলোতে নকশা ও কাস্ট আয়রনের কাজ নিখুঁত। কাস্ট আয়রনের এই কাজগুলো ইউরোপের কাজের সমতূল্য বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। এর সাথে আছে সিরামিক টাইলসের রূপায়ণ। প্রতিটি বাড়িই অন্দরবাটি এবং বহির্বাটি -এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। বেশিরভাগ বাড়ির চারদিকের ঘেরাটোপের ভিতর আছে উন্মুক্ত উঠান।

পানাম নগরীর পরিকল্পনাও নিখুঁত। নগরীর পানি সরবাহের জন্য দুপাশে ২টি খাল ও ৫টি পুকুর আছে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই আছে কুয়া বা কূপ। নগরীকে জলাবদ্ধতামুক্ত রাখতে করা হয়েছে খালের দিকে ঢালু। প্রতিটি বাড়ি পরস্পরের থেকে সম্মানজনক দূরত্বে রয়েছে। নগরীর যাতায়াতের জন্য রয়েছে এর একমাত্র রাস্তা, যা এই নগরীর মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে এপাশ-ওপাশ।

নগরীর ভিতরে আবাসিক ভবন ছাড়াও আছে মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, মঠ, গোসলখানা, নাচঘর, পান্থশালা, চিত্রশালা, খাজাঞ্চিখানা, দরবার কক্ষ, গুপ্ত পথ, বিচারালয়, পুরনো জাদুঘর। এছাড়া আছে ৪০০ বছরের পুরোন টাকশাল বাড়ি।

পানাম নগর দিনের আলোয় লোকে ভরপুর থাকে। তবে রাতের পানাম নগরের সৌন্দর্ দেখার ইচ্ছা ছিলো আমাদের। তাই লোকালয় জনশুন্য হলে আমরা হেটে চলি মূল সড়ক ধরে পানামের পানে। হেমন্তের রাতে হালকা শীতল অনুভূতি আমাদের শরীরে পানাম দর্শণের চেয়ে তাকে উপলব্ধি করার তাড়না জাগিয়ে তোলে। আমরা প্রধান ফটকের সামনে সেতুতে বসে থাকি। তারপর আলো আধারি ভেদ করে প্রধান ফটকের সামনে চলে আসি। তবে সেখানে কোনো লোক নেই। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লোকগুলোর কোনো হদিশ নেই। দিনের বেলায় যে এলাকা সরগরম ছিলো নানা বয়সী লোকে এখন সেখানে এক ভৌতিক পরিবেশ বিরাজ করছে। পুরনো দালানগুলো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। অনেক সময় কাটালাম নি:সঙ্গ পানামের পাশে। এই আঁধারির মাঝে বসে বসে ভাবছি- ভর যৌবনে কেমন ছিলো এই নগরী। ৪শ বছর আগে যারা এই নগরের শাসনকর্তা আর বাসিন্দা ছিলেন কেমন ছিলেন তারা। চারপাশের আজকের যে লোকালয় সে সময় তা ছিলোনা। পানামের গোড়পত্তন হয় একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রান্তরে। তাহলে সে সময়ের এই বিচ্ছিন্ন নগরের লোকেদের জীবন-জীবীকার রসদ কোথা থেকে আসতো? একটি জনপদ কতোটা সমৃদ্ধ হলে এমন পরিকল্পিত আর জৌলুসপূর্ণ নগরী গড়ে তোলা সম্ভব? এসব ভাবতে ভাবতে কেমন আনমনা হয়ে পড়লাম। এখানে অনেক বসতি। এখানে অনেক প্রাণের স্পন্দন ছিলো। কিন্তু সেই প্রাণগুলো গত হয়েছে প্রকৃতির নিয়মে। কতশত বছর আগে। আজ পুরনো এ নগরে কেবলই প্রাণের আর্তনাদ। সেইসব প্রাণগুলো ফিরে আসে। ঠিক যেনো জোনাকির মতো। কবি জীবনানন্দ দাশ ‘হাজার বছর শুধু খেলা করে’ কবিতায় যেমনটি বলেছেন-

হাজার বছর শুধু খেলা করে অন্ধকারে জোনাকির মতো:/ চারিদিকে পিরামিড— কাফনের ঘ্রাণ;/বালির উপরে জ্যোৎস্না— খেজুর-ছায়ারা ইতস্তত/ বিচূর্ণ থামের মতো:/ এশিরিয় দাঁড়ায়ে রয়েছে মৃত, ম্লান।/ শরীরে মমির ঘ্রাণ আমাদের— ঘুচে গেছে জীবনের সব লেনদেন;/ ‘মনে আছে?’ সুধালো সে— সুধালাম আমি শুধু, ‘বনলতা সেন।’

এই পানাম নগরের মতো পৃথিবীর সব জনপদ পড়ে থাকে। শত শত বছরেও হয়তো নগরের রূপ বদলায় না। কিন্তু বদলে যায় এ নগরের প্রাণদায়িনীরা। হারিয়ে যান তারা। তারপর কোনোদিন হয়তো আধাঁর ঘনায়ে এলে শোনা যায় প্রাণের আর্তনাদ। ঠিক যেন সোনারগাঁওয়ের পানাম নগরীর মতো।  

রেডিওটুডে নিউজ/এমএস/এইচবি

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের