বাংলাদেশি কৃষকের কল্যাণের কথা বললেন ট্রাম্প, চুক্তি কী বলছে

শুক্রবার,

২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬,

৮ ফাল্গুন ১৪৩২

শুক্রবার,

২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬,

৮ ফাল্গুন ১৪৩২

Radio Today News

বাংলাদেশি কৃষকের কল্যাণের কথা বললেন ট্রাম্প, চুক্তি কী বলছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭:৪৬, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

Google News
বাংলাদেশি কৃষকের কল্যাণের কথা বললেন ট্রাম্প, চুক্তি কী বলছে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পাঠানো অভিনন্দন বার্তায় পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চুক্তিটি স্বাক্ষর হয় অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ মুহূর্তে। 

চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকে ‘এন্ট্রি ইনটু ফোর্স’ বা ইআইএফ এর আওতায় থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ১ হাজার ৫৫৫টি পণ্য বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। পর্যায়ক্রমে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে এমন পণ্যের শ্রেণি আছে আরও তিনটি। এগুলোর বেশিরভাগই কৃষিজাত। অভিনন্দন বার্তায় ট্রাম্প বলেছেন, এই চুক্তি বাস্তবায়ন হলে বাণিজ্যিক সম্পর্কের গতিশীলতা বজায় থাকবে। উভয় দেশের শ্রমিক এবং কৃষকদের জন্যও কল্যাণকর হবে।

বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিকদের কতটুকু কল্যাণ হবে তা বুঝতে প্রধান রপ্তানি পণ্য ও সেগুলোর গন্তব্যের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, ৬৩টি মৌলিক প্রক্রিয়াজাত পণ্যসহ সাত শতাধিক কৃষিপণ্য রপ্তানি করা হয়। প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে আছে হিমায়িত মাছ, চিংড়ি ও অন্যান্য হিমায়িত খাদ্য পণ্য, চা, মসলা, শুকনো ফলসহ অন্যান্য ফল এবং কিছু প্রক্রিয়াজাত কৃষি পণ্য। এগুলোর অন্যতম রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য।

কিন্তু ওয়াশিংটনের সঙ্গে হওয়া চুক্তিতে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিপণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ঢাকা। এসব কৃষিপণ্যের মোট আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলার। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৪২ হাজার কোটি টাকার বেশি। 

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ রপ্তানি করে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য। আর আমদানি করে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের।

মাছ, মাংস, আলু, লেবু

কৃষিপণ্যের প্রতিশ্রুতির মধ্যে আছে- আগামী পাঁচ বছরের প্রতি বছর কমপক্ষে ৭ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানি। পাশাপাশি এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১২৫ কোটি বিলিয়ন ডলার বা ২৬ লাখ মেট্রিক টন (যেটি কম) মূল্যের সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য। এছাড়া তুলা আমদানির পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।  

চুক্তিটির পরপরই মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) তাদের ওয়েবসাইটে বিভিন্ন শ্রেণির পণ্যের তালিকা প্রকাশ করে। যেগুলো শুল্কমুক্ত সুবিধায় বাংলাদেশের বাজারে ঢুকবে। এতে ইআইএফ শ্রেণিতে থাকা পণ্য পাওয়া গেছে ১ হাজার ৫৫৫টি। আছে- জীবন্ত ভেড়া, ছাগল, বিভিন্ন ধরনের হাঁস-মুরগি (মুরগির বাচ্চা, হাঁস, রাজহাঁস)।

মাংস, মাছ ও ভোজ্য উপজাত পণ্যের মধ্যে আছে- ভেড়া, ছাগলের টাটকা বা হিমায়িত মাংস এবং বিভিন্ন ধরনের পোল্ট্রি (মুরগি, টার্কি, হাঁস)। এছাড়া, লবণজাত পণ্য যেমন- শুকানো মাংস ও ভোজ্য চর্বি বা নাড়িভুঁড়ি, বিভিন্ন ধরনের টাটকা বা হিমায়িত মাছ (ট্রাউট, স্যামন, হ্যালিবাট, টুনা, হেরিং, সার্ডিন, ম্যাকেরেল, কড ইত্যাদি) এবং কাঁকড়া ও চিংড়ি।

দুগ্ধ ও প্রাণিজ পণ্যের মধ্যে আছে- দই, ঘোল, বিভিন্ন ধরনের পনির, নিষিক্ত ও সাধারণ ডিম, পশুর লোম, হাড় এবং ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত নির্দিষ্ট কিছু প্রাণিজ উপাদান। শাকসবজি ও ফলমূলের মধ্যে আছে- নির্দিষ্ট জাতের আলু, টমেটো, পেঁয়াজ, রসুন, মাশরুম, মটরশুঁটি এবং অন্যান্য ডালজাতীয় শস্য। 

এছাড়া বিভিন্ন ধরনের বাদাম (চেস্টনাট, পাইন নাট) এবং ফল (শুকনো খেজুর, ডুমুর, আনারস, অ্যাভোকাডো, পেয়ারা, আম, লেবুজাতীয় ফল, তরমুজ, নাশপাতি, চেরি, পিচ ও স্ট্রবেরি) ইআইএফ শ্রেণিভুক্ত।

অর্থ্যাৎ, চুক্তি কার্যকর হলে দেশের কৃষক ও খামারিরা প্রধানত যেসব পণ্য উৎপাদন করেন সেগুলোর বেশিরভাগই আমদানি হবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) আয়োজিত ‘যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি: বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রভাব’ শীর্ষক আলোচনায় অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে ভালোর চেয়ে খারাপই বেশি হয়েছে। দেশের রপ্তানি বাড়বে না; উল্টো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নীতির লঙ্ঘন হওয়ায় অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।

চুক্তিতে আরও যা আছে

অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির নতুন এক দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

সম্প্রতি বিলুপ্ত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস উইং জানায়, চুক্তিতে তৈরি পোশাক খাতের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম সুতা আমদানি করে তা দিয়ে তৈরি পোশাক সে দেশে রপ্তানি করলে ‘শূন্য শুল্ক’ বা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক, যার ওপর ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক কার্যকর হবে না, যদি কাঁচামাল যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা হয়। 

একইভাবে চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রায় ২ হাজার ৫০০টি পণ্য শূন্য শুল্ক সুবিধা পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, কাঠ, কাঠজাত পণ্যসহ অন্যান্য সামগ্রী। এ ছাড়া বাংলাদেশ তার বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের জন্য ৭ হাজার ১৩২টি ট্যারিফ লাইন/এইচএস কোড অফার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। চুক্তির রুলস অব অরিজিনে কোনো নির্দিষ্ট ভ্যালু অ্যাডিশনের পরিমাণ উল্লেখ না থাকায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া সহজ হবে। 

অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ীরা যেভাবে দেখছেন

বিসিআইয়ের আলোচনা সভায় গত মঙ্গলবার সংগঠনটির সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা বা সুতা নিয়ে পোশাক তৈরি করে সে দেশে রপ্তানিতে পাল্টা শুল্ক শূন্য করার কথা বলা হয়েছে। তবে তা পুরো মূল্যের ওপর, নাকি কেবল সুতার দামের ওপর তা পরিষ্কার নয়। 

আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়বে বলে ধারণা দেওয়া হচ্ছে, তা ঠিক নয়। রপ্তানি বাড়লেও তা ৫ থেকে ১০ শতাংশের বেশি হবে না। অথচ এ সুবিধা নিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল সংখ্যক পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হয়েছে। যে পরিমাণ কৃষি, জ্বালানি, অস্ত্র কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তাতে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। 

বিসিআইয়ের সভাপতির মতে, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো- চীন, রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে গেলে বা তাদের বিনিয়োগ আনতে সমস্যায় পড়তে হবে। ইপিজেডে শ্রমিক ইউনিয়ন করতে বলা হয়েছে। এটি হলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না।

চুক্তিকে জনস্বার্থবিরোধী এবং অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ বলে মন্তব্য করেন গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, চুক্তিটি কেবল বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এতে ভূরাজনৈতিক উপাদান আছে। রাজনৈতিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে চুক্তিটি হয়েছে। এ চুক্তি করতে গিয়ে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করা হয়নি।

ওই আলোচনা সভায় গবেষণা সংস্থা র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এ চুক্তি বাংলাদেশের স্বার্থকে বিপন্ন করবে। রপ্তানি বাড়বে না। কৃষি, জ্বালানি, বিমান, অস্ত্রসহ যেসব পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তার প্রভাব দেশের জন্য নেতিবাচক হবে।

চুক্তিটি এখনও কার্যকর হয়নি। উভয় দেশের সংসদে তা পাস করতে হবে। এর আগে বাংলাদেশকে আইন সংশোধন করতে হবে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে পাল্টা শুল্ক আরোপ করার বৈধতা নিয়ে মামলা হয়েছে। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শেষ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক থাকে কিনা, তা বিবেচনায় নিয়ে পেশাদারত্বের সঙ্গে কৌশলে বিষয়টি সামাল দিতে হবে। অন্যথায় হিতে-বিপরীত হতে পারে।
 

রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের