পহেলা জুলাই ২০১৬। ঠিক এক দশক আগে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলায় নিহত হন দু'জন পুলিশ সদস্য সহ অন্তত ২২জন।
বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এই সন্ত্রাসী হামলায় শেষ পর্যন্ত সৈন্যদের কমান্ডো অভিযানে নিহত হয়েছিলো পাঁচ হামলাকারী।
বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তৈরি করা ওই ঘটনায় জঙ্গিরা ওই রাতে ২০ জনকে হত্যা করে যাদের নয় জন ইতালি, সাত জন জাপান, তিন জন বাংলাদেশি এবং এক জন ভারতীয় নাগরিক।
হামলার দায় স্বীকার করে ওই রাতেই বিবৃতি দিয়েছিল আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএস। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আইএসের এই দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেছিল, দেশীয় জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবি এই হামলার জন্য দায়ী।
ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান হামলায় বহু বিদেশি নাগরিক নিহত হওয়ায় সেই ঘটনাটি বিশ্ব জুড়ে খবরের শিরোনাম হয়।
ওই ঘটনার পর জঙ্গি নির্মূলে একের পর এক অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হোলি আর্টিজানের ঘটনার পরের তিন বছরেই সারাদেশে অভিযানে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অনেকেই নিহত হন, অভিযানে গ্রেফতারও হন অনেকেই।
গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। এরপর গত প্রায় দুই বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি বা উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর তৎপরতার বিষয়গুলো সামনে আসছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতায় আটক অনেকেই মুক্তি পায়। যে কারণে বর্তমানে আবারো বাংলাদেশে জঙ্গি কর্মকাণ্ড কিংবা তৎপরতা বেড়েছে।
গত দুই বছরে বাংলাদেশে জঙ্গি বা উগ্রবাদী বিভিন্ন সংগঠনের তৎপরতার বিষয়গুলোও আবারও সামনে আসছে।
বিশেষ করে ঢাকার রাস্তায় কালেমা লেখা পতাকা নিয়ে মিছিল, সম্প্রতি বিভিন্ন জায়গায় উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর আদলে কলেমা লেখা পতাকা টানানো কিংবা জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় পুলিশের বিশেষ সতর্কতা ও নিরাপত্তা জারির বিষয়গুলোও নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে।
যদিও বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশে তেমন কোন জঙ্গি বা উগ্রবাদী সংগঠনের তৎপরতা নেই। যা ছিলও সেটিও কমে এসেছে অনেকাংশে।
পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট বা এটিইউ প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম বলেছেন, জঙ্গি বা জঙ্গিবাদী কোন কার্যক্রম এখন সেভাবে দেখতে পাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী।
এদিকে, হোলি আর্টিজান বেকারির ওই ঘটনার এক দশক পর ওই ঘটনায় অপরাধীদের বিচারের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিহতদের পরিবার।
হোলি আর্টিজানে নিহতদের পরিবার কী বলছে?
হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় নিহত হয় দু'জন পুলিশ সদস্য সহ অন্তত ২২জন, যাদের মধ্যে ছিলেন পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম।
পহেলা জুলাই সন্ধ্যায় দেশি-বিদেশি বেশ কয়েকজন নাগরিক জিম্মি হওয়ার পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একটি দল তাদের উদ্ধার করতে গেলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লক্ষ্য করে বিস্ফোরক নিক্ষেপ করে জঙ্গিরা। এতেই নিহত হন মি. ইসলাম।
মি. ইসলাম যেদিন নিহত হন তার ঠিক একমাস পর ওই বছর পহেলা অগাস্ট জন্ম নেন তার মেয়ে কামরুন নাহার রাইনা।
মি. ইসলামের স্ত্রী উম্মে সালমা বলছিলেন, দশ বছর পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ায় আগের মতো সেই সম্মানটুকু এখন আর তারা পাচ্ছেন না।
এর পেছনে অবশ্য একটি কারণও রয়েছে। ২০২৪ সালে পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকার পতনের খবর ছড়িয়ে পরার পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ভাস্কর্য, স্মৃতি স্তম্ভ ভাংচুরের ঘটনা ঘটে।
ঢাকার গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তার স্মরণে তৈরি হয়েছিল ভাস্কর্য 'দীপ্ত শপথ'। বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, পাঁচই অগাস্টেই গুলশান থানা সংলগ্ন এই ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল।
হোলি আর্টিজানে নিহত পুলিশ কর্মকর্তা রবিউল ইসলামের ছোট ভাই শামসুজ্জামান শামস বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "রাষ্ট্রের জন্য, পুলিশ বাহিনীর মর্যাদা জন্য জিম্মি উদ্ধার করতে গিয়ে রবিউল ইসলাম শাহাদাৎ বরণ করলো। তাদের সম্মানে স্মৃতি স্তম্ভ করা হয়েছিল সেটাও ভেঙে ফেলা হলো। গত বছর সেখানে পুলিশের পক্ষ থেকে কোন সম্মাননাও জানানো হলো না"।
অন্যদিকে, এই মামলায় প্রথমে মৃত্যুদণ্ডের রায় পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে সাজা কমানোর বিষয়গুলো নিয়েও পরিবারগুলোর মাঝে হতাশা রয়েছে।
মি. শামস বিবিসি বাংলার কাছে অভিযোগ করেন, হোলি আর্টিজানের ঘটনায় বিচার নিয়ে এক ধরনের দীর্ঘসূত্রিতাও রয়েছে।
হোলি আর্টিজানের ঘটনায় বিচার কতদূর?
২০১৬ সালে হোলি আর্টিজানের ওই ঘটনার তিন বছরেরও বেশি সময় পর ২০১৯ সালের ২৭শে নভেম্বর বিশেষ ট্রাইব্যুনালের রায়ে সাত জনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
এ মামলার বিচার শুরুর সময় আট আসামির ছয়জন কারাগারে ছিলেন৷ বিচার চলাকালে বাকি দুইজন গ্রেপ্তার হন। যখন এই মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছিল তখন মোট আটজন আসামির মধ্যে সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড ও একজনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।
ঢাকার সন্ত্রাস বিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল রায়ে যে সাত জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় তারা হলেন- জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজিব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে রাশ, সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজ, হাদিসুর রহমান সাগর, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, মামুনুর রশিদ রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালিদ।
এরপর ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর রায় দেন। রায়ে সাত আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা গত বছরের অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুন মাসে আপিল বিভাগে পৃথক লিভ টু আপিল করেন।
সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২২৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, 'ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকলেও এই সাত আপিলকারী ষড়যন্ত্র ও ঘটনায় সহায়তা করেছেন, যা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
এতে আরো বলা হয়, ষড়যন্ত্র ও ঘটনায় (জঙ্গি হামলা) সহায়তার কারণে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর ধারা ৬ এর ১ উপধারা (ক) (আ) দফায় বর্ণিত অপরাধে তারা দোষী। কিন্তু সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্ট ধারা-উপধারার সঠিক উপলব্ধি না করে আপিলকারীদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন, যা সঠিক ও গ্রহণযোগ্য নয়। যে কারণে উক্ত রায়টি হস্তক্ষেপযোগ্য।
বর্তমানে, ওই মামলাটি এখনো উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। তবে, হোলি আর্টিজানের ঘটনায় অভিযুক্তদের বিচারকাজে দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবারের সদস্যরা।
দেশে জঙ্গি আছে নাকি নাই?
২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর জঙ্গিবাদের বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত অনেকেই জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, কারা কর্তৃপক্ষের হিসেবেই এই সংখ্যা তিন শতাধিক।
শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর ওই বছরই রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় কালেমা খচিত কালো পতাকা নিয়ে মিছিল করতে দেখা গেছে।
এসব মিছিল থেকে ফিলিস্তিনে গণহত্যা বন্ধ, ইসলামের নবীকে কটূক্তির প্রতিবাদ কিংবা ইসলামি খেলাফত কায়েমেরও দাবি তুলতে দেখা গেছে।
এরপর বিভিন্ন জায়গায় জঙ্গি বা উগ্রবাদী কিছু কর্মকাণ্ডের বেশ কিছু ঘটনা সামনে আসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়।
গত বছর ঢাকায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীরের একটি মিছিল টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন করে 'জঙ্গি' ইস্যুটি শুধু সামনে আসে।
গত এপ্রিলে বাংলাদেশে 'জঙ্গি তৎপরতার' বিষয়টি সরকারের উচ্চ মহলের বক্তব্যের মাধ্যমেও সামনে আসে। সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই বলে জানালেও, তখন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছিলেন, "দেশে জঙ্গি রয়েছে", তবে সরকার তা "শূন্যের কোঠায়" নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
জঙ্গি ইস্যুতে সরকারের একজন মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার বক্তব্য এমন এক সময় সামনে এসেছিল ঠিক তার কয়েকদিন আগেই জঙ্গি তৎপরতার আশঙ্কা থেকে পুলিশ সদরদপ্তর একটি সতর্কতামূলক নির্দেশনা দিয়েছিল।
যার ফলে দেশের প্রধান বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করতে দেখা গিয়েছিল।
অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট বা এটিইউ প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম বলেন, অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ধরনের কিছু তৎপরতা দেখা গেলেও বাস্তবে আমরা এমন কোন তৎপরতা লক্ষ্য করছি না"।
মি করিম মনে করেন, আগে তাদের যে ধরনের তৎপরতা দেখা যেতো সেটি নির্বাচনের পর অনেকাংশেই কম দেখা যাচ্ছে।
'জঙ্গি শব্দের রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন'
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশে নানা ধরনের জঙ্গি তৎপরতার বিষয়গুলো সামনে এসেছিল। এর আগে বিএনপি সরকারের আমলেও সিরিজ বোমা হামলাসহ জঙ্গি সংগঠনগুলোর নানা কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করা গেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুলশানের হলি আর্টিজান ছিল অন্যতম বড় ঘটনা। ওই ঘটনার পর জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের নানা তৎপরতা ও বেশ কিছু অভিযান লক্ষ্য করা গিয়েছিল।
গবেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ কিংবা এর আগের বিএনপির সরকার সব আমলেই বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী সংগঠনগুলোর তৎপরতা ছিল। সব সরকারই এই ইস্যুটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, "সাধারণত আমাদের দেশে যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে তারা কখনো শিকার করতে চায় না, তারা জঙ্গি বিষয়টি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে থাকে"।
"কারণ যদি তারা শিকার করে তাহলে বর্হিবিশ্বের কাছে তাদের ইমেজটা নষ্ট হতে পারে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক সরকার বা দলগুলো এটাকে আবার পুঁজিও করতে চায় যে, আমরা সক্রিয়ভাবে দমন করছি", যোগ করেন তিনি।
বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, জঙ্গি সংশ্লিষ্টতায় যারা আগেও যুক্ত ছিলেন পাঁচই অগাস্টের পর তাদের অনেকেই কৌশল পরিবর্তন করেছে। কিন্তু এটি দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ততটা সক্রিয় ছিল না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ তৌহিদুল হক বলেন, "যখন কোনো হামলার সাথে উগ্র সাথে জড়িত হয় এই তখন কারণটা নির্মূল করা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলো রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করে তখন সমাধানের পরিবর্তে ব্যাপারগুলোকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে"। সূত্র: বিবিসি বাংলা
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

