রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছিনতাইয়ের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। ছিনতাইয়ের ঘটনায় আনা মামলায় জামিন ঠিকাতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরাও সচেষ্ট রয়েছেন। ছিনতাই প্রতিরোধে দণ্ডবিধির পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন, ২০০২ একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন তারা।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকি বাসসকে বলেন, ছিনতাই প্রতিরোধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিচারকরাও এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। আমরা রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আসামিদের জামিনের কঠোর বিরোধিতা করছি।
তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ছিনতাইকারীদের গ্রেফতার করছে। তাদের উচিত হবে কোনো ভাসমান সাক্ষী না রেখে স্থায়ী বাসিন্দাদের সাক্ষী হিসেবে রাখা। এতে মামলাগুলো প্রমাণ করতে রাষ্ট্রপক্ষের সুবিধা হয়। ভাসমান সাক্ষী নিলে অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষীদের খুঁজে পাওয়া যায় না।
পিপি বলেন, ছিনতাইকারীদের আটক রাখতে বিচারকরা সচেষ্ট এবং আমরা যারা রাষ্ট্রপক্ষে আছি আমরাও সচেষ্ট। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ছিনতাই ও ডাকাতি মামলাগুলোতে আমাদেরকে বিশেষ নজর দিতে।
অ্যাভোকেট সৈয়দ জয়নুল আবেদীন মেজবাহ বাসসকে বলেন, ছিনতাই জনজীবনে চরম নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ছিনতাই মামলাগুলো দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হলে এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
এ মামলায় সাক্ষীদের ফৌজদারী কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এ আইনজীবী। তার মতে, জামিনের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের কঠোর নির্দেশনা ফলপ্রসূ হতে পারে।
তিনি বলেন, কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়, সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। আইনের সঠিক প্রয়োগ ও প্রকৃত ছিনতাইকরীদের আইনের আওতায় আনাই মুক্তির পথ।
তিনি আরও বলেন, সরকারি সাক্ষীদের যাতায়াত খরচ কোর্টের মাধ্যমে সাথে সাথে দিলে সাক্ষী নিয়মিত আসবে। কারণ তাদের নিজ খরচে আসতে হয় ও টিএ ডিএ পেতে সময় লাগে। পাবলিক প্রসিকিউটরেরও মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন বাসসকে বলেন, অধিকাংশ ছিনতাইকারীই পেশাদার ও একাধিক মামলার আসামি। তারা জামিনে বেরিয়ে এসে আবার একই অপরাধ করে। আমরা এখন ছিনতাইয়ের মামলাগুলো নিয়মিত মামলার পাশাপাশি দ্রুত বিচার আইনেও দিচ্ছি। এতে জামিন পাওয়া কঠিন হয় এবং দ্রুত সাজা নিশ্চিত করা যায়। নগরবাসীকে অনুরোধ করব, ছিনতাইয়ের শিকার হলে সাথে সাথে ৯৯৯-এ কল করুন এবং থানায় মামলা করুন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খালিদ হোসাইন বাসসকে বলেন, দণ্ডবিধিতে শাস্তি বেশি হলেও বিচার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অপরাধীরা ভয় পায় না। দ্রুত বিচার আইনে ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান থাকায় এটি ছিনতাই প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর। প্রয়োজন শুধু এই আইনের যথাযথ ও কঠোর প্রয়োগ।
ছিনতাইের ঘটনায় অপরাধীদের দণ্ডবিধি আইন ও দ্রুত বিচার আইনের আওতায় দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন আইন বিশেষজ্ঞ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।
দ্রুত বিচার আইনে মামলা ৩০ থেকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। আইনটি জামিন অযোগ্য ধারা থাকায় অপরাধীরা সহজে জামিন পায় না। ছিনতাইয়ের ঘটনায় আনা মামলার রায় দ্রুত বিচারে নিশ্চিত হলে এ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সুফল আসবে বলে মনে করেন আইনজীবীরা।
ছিনতাইয়ের শাস্তি
‘ছিনতাই’ শব্দটি দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এ ‘দস্যুতা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। দস্যুতা সম্পর্কে দণ্ডবিধির ৩৯০ ধারায় বলা হয়েছে, যদি চুরি করতে গিয়ে বা চুরির উদ্দেশ্যে অপরাধী স্বেচ্ছায় কাউকে আঘাত করে, আঘাত করার চেষ্টা করে বা অবৈধভাবে আটক করে বা আটকের চেষ্টা করে, তবে তা দস্যুতা বলে গণ্য হবে।
এই ধারায় দস্যুতার জন্য সর্বোচ্চ ১৪ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ৩৯৪ ধারায় বলা হয়েছে, দস্যুতা করার সময় যদি অপরাধী কাউকে আঘাত করে, তাহলে তার জন্য ২০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং ক্ষেত্র বিশেষে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে। ছিনতাইয়ের সময় ছুরিকাঘাতের ঘটনাগুলো এই ধারায় পড়ে।
৩৯৭ ও ৩৯৮ ধারায় বলা হয়েছে, দস্যুতা বা ডাকাতির সময় যদি অপরাধী মৃত্যু বা গুরুতর জখম করার চেষ্টা করে এবং এ সময় সে মারাত্মক অস্ত্রে সজ্জিত থাকে, তবে তার জন্য ন্যূনতম ৭ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
ছিনতাই প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর আইন হিসেবে বিবেচিত হয় আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন, ২০০২। এই আইনের ২(খ)(ঈ) ধারায় বলা হয়েছে - কোনো ব্যক্তির নিকট হতে কোনো অর্থ, অলংকার, মূল্যবান জিনিসপত্র বা অন্য কোন বস্তু বা যানবাহন ছিনতাই এর চেষ্টা করা বা ছিনতাই করা বা জোরপূর্বক কাড়িয়া লওয়া’ একটি আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ।
এই আইনের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ছিনতাই করলে তিনি অন্যূন ২ বছর এবং অনধিক ৭ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন। ২০১৮ সালের সংশোধনীতে সর্বোচ্চ সাজা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৭ বছর করা হয়েছে।
ধারা ১০ অনুযায়ী বিচার: হাতেনাতে ধৃত আসামিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করতে হবে এবং অভিযোগ পাওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করতে হবে। হাতেনাতে ধৃত না হলে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ধারা ১৪ অনুযায়ী সাক্ষ্য: সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ভিডিও, স্থিরচিত্র ও টেপ রেকর্ডকৃত কথোপকথন এই আইনে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

