কার্যকর মধ্যস্থতার মাধ্যমে দেশের আদালতে বিচারাধীন প্রায় ৪৫ লাখ মামলার জট উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
আজ রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে ‘ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধির লক্ষ্যে মধ্যস্থতা এবং দেওয়ানি মামলা পরিচালনা পদ্ধতির উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘আইন পেশাজীবীদের জন্য মৌলিক মধ্যস্থতা প্রশিক্ষণ’ কর্মসূচির সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো দেশের দরিদ্র, প্রান্তিক, সুবিধাবঞ্চিত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরকার এমন মানুষের দোরগোড়ায় ন্যায়বিচার পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করছে।’
তিনি বলেন, ‘মধ্যস্থতাকারীদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে শুধু আইনগত জ্ঞানই নয়, মানবিকতা, প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও আস্থাভিত্তিক সমাধান তৈরির সক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ এ প্রসঙ্গে তিনি অংশগ্রহণকারীদের জাপানের একটি সুপরিচিত গ্রন্থ ‘জাস্টিস উইথ আ স্মাইল’ (হাসিমুখে ন্যায়বিচার) পড়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, ‘এ ধরনের সাহিত্য মধ্যস্থতাকারীদের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।’
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘অনেক সময় একটা প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে বিরোধের পক্ষগুলোর আইনজীবীরা সমঝোতায় যেতে অনাগ্রহী থাকেন। তবে বাস্তবতা হলো, দেশে ও বিদেশে অসংখ্য সফল মধ্যস্থতা ও সালিশের পেছনে আইনজীবীদেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বর্তমান সময়ে আইন পেশায় আলোচনাভিত্তিক বিরোধ নিষ্পত্তির একটি ইতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে উঠছে, যা আরো সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘মধ্যস্থতা উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক একটি পদ্ধতি। পক্ষান্তরে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় বছরের পর বছর সময়, অর্থ ও শ্রম ব্যয় হওয়ার পাশাপাশি মানুষ মানসিক উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যারও সম্মুখীন হয়। তাই হত্যা বা অন্যান্য গুরুতর অপরাধ ছাড়া অধিকাংশ বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।’
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘এ প্রকল্পের আওতায় সর্বোত্তম কর্মদক্ষতা প্রদর্শনকারী একজন নারী ও একজন পুরুষ মধ্যস্থতাকারীকে জাপানে উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হবে।’ এ উদ্যোগ মধ্যস্থতাকারীদের আরো দক্ষ, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও পেশাদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি জাপান সরকার, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) এবং জাপানের কেইও ইউনিভার্সিটি ল স্কুলের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট আইনজীবী মাসাকো মিয়াতাকেসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতা আরও জোরদার হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। তিনি ঢাকা-নারিতা রুটে সরাসরি ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং জাইকার যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. খাদেমউল কায়েসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে জাইকা বাংলাদেশের প্রধান প্রতিনিধি জুনকো তাকাহাশি, জাপানের বিচার মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিভাগের(আইসিডি) উপমহাপরিচালক কাজুনোরি নোসে এবং বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মনজুরুল হোসেন বক্তব্য রাখেন।
দুই দিনব্যাপী এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন জেলার জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার এবং জেলা জজ আদালতে কর্মরত আইনজীবীসহ মোট ৪০ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশগ্রহণ করেন প্রশিক্ষণে মধ্যস্থতা পদ্ধতির মৌলিক ধারণা, কার্যকর যোগাযোগ কৌশল, সমঝোতা পরিচালনার দক্ষতা, ব্যবহারিক অনুশীলন এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
প্রশিক্ষণের মূল প্রশিক্ষক ছিলেন জাপানের খ্যাতনামা কেইও ইউনিভার্সিটি ল স্কুলের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট আইনজীবী মাসাকো মিয়াতাকে। তিনি মধ্যস্থতা বিষয়ে জাপানের অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা এবং ব্যবহারিক কৌশল তুলে ধরেন।
উল্লেখ্য, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং জাইকার যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশে মধ্যস্থতা ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং বিচারপ্রার্থীদের জন্য সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

