প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে বিদ্যমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় একাধিক তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়ে দ্রুতই এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন।
একইসঙ্গে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদক দেশে পরিণত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
আজ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এই আহ্বান জানান। এই সময়ে সংসদ অধিবেশনের কক্ষে সদস্যরা মুহুর্মুহু টেবিল চাপড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে সমর্থন জানান।
সংকট উত্তরণে সৌরবিদ্যুতের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এতদিন আমরা আমদানি নির্ভর উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের গ্রাহক ছিলাম। বর্তমান সরকার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের যে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে যাচ্ছে, তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে আমরা কেবল গ্রাহক থাকব না, বরং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদক হব।’
বর্তমান সংকট নিয়ে উসকানিমূলক আচরণের পরিবর্তে জনগণের সামনে প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরতে বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিএনপির ঐতিহাসিক রেকর্ড রয়েছে জাতিকে প্রতিটি সংকটময় পরিস্থিতি থেকে সফলভাবে বের করে আনার। বিরোধীদলীয় সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে দ্রুতই দেশ ও জাতিকে এই বিদ্যুৎ ও গ্যাস সমস্যা থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে।’
গ্যাস- বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘এই সমস্যা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শাসন আমলে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
বঙ্গোপসাগরে প্রতিবেশী দেশগুলোর গ্যাস আহরণের উদাহরণ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘অদৃশ্য কোনো ইশারায় দেশের সীমানায় বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস উত্তোলনের চেষ্টা করা হয়নি। বিশেষ কোনো দেশকে সুবিধা দিতে এবং তাদের স্বার্থ রক্ষার্থেই বঙ্গোপসাগরে খনন কাজ বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে প্রচলিত ধারণার কথা তিনি সংসদে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিগত সরকার দেশকে সম্পূর্ণরূপে আমদানি নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছিল।’
বিদ্যমান সংকটের সূচনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নতুন সরকার গঠনের মাত্র ১০ থেকে ১২ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা আমাদের জ্বালানি আমদানির প্রধান উৎস ছিল। এর ফলে গ্যাস ও তেল সরবরাহে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হয়। একই সময়ে দেশের দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) একটিতে ইলেকট্রিক শকের কারণে অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা ঘটে এবং সেটি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়ে। এই জোড়া ধাক্কায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে।’
চলমান সংকট নিয়ে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি না করে দায়িত্বশীল ভূমিকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ২০২২ সালে তৎকালীন সরকার বিদ্যুতের ঘাটতি সামাল দিতে অফিসের সময়সূচি ও ব্যাংক লেনদেনের সময় পরিবর্তন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিল। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামে কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়ে রাষ্ট্রকে ঋণগ্রস্ত করে ফেলা হলেও বিদ্যুৎ সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান তারা করতে পারেনি।’
তিনি আরো বলেন, ‘২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ১৪০০ মানুষের আত্মত্যাগ এবং ৩০ হাজার মানুষের আহত ও পঙ্গুত্ব বরণের মধ্য দিয়ে অর্জিত গণতান্ত্রিক পরিবেশে সংকটকে কেন্দ্র করে উসকানিমূলক আচরণ করা হলে পতিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী চক্রই লাভবান হবে। সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই জনগণের কাছে বাস্তব পরিস্থিতি সঠিকভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানাই।’
দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী বিএনপির অতীত ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) অতীতে যতবারই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, ততবারই দেশকে যেকোনো বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে সফলভাবে বের করে এনেছে। জিয়াউর রহমানের নীতি ও দলের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে বিরোধীদলীয় সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে অতি দ্রুত দেশকে এই বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে আমরা সক্ষম হবো।
বিকাল তিনটায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। মাগরিবের নামাজের পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদ অধিবেশন সমাপনী সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ সংসদে পড়ে শোনান।
সমাপনিতে সংসদের রেওয়াজ অনুযায়ী প্রথমে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান এবং পরে সংসদ নেতা বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রী ৭টা ৪৫ মিনিটে বক্তব্য শুরু করে সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয় গত ২৭ আগস্ট।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

