অবশ্যই আমরা কথা বলবো: সজিব ওয়াজেদ জয়

শনিবার,

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬,

২ ফাল্গুন ১৪৩২

শনিবার,

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬,

২ ফাল্গুন ১৪৩২

Radio Today News

অবশ্যই আমরা কথা বলবো: সজিব ওয়াজেদ জয়

রেডিওটুডে রিপোর্ট

প্রকাশিত: ২০:৫৮, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

Google News
অবশ্যই আমরা কথা বলবো: সজিব ওয়াজেদ জয়

জুলাই বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে তার সঙ্গে আলোচনায় বসতে তার কোনো আপত্তি নেই। তবে তিনি সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ বলে মন্তব্য করেছেন এবং এ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আইটিভি’কে (ITV) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জয় বলেন, ‘আমি সবসময়ই উন্মুক্ত। আমি এমন একজন মানুষ, যে সবসময় আলোচনায় বিশ্বাস করে—তা যত কঠিনই হোক বা যার সঙ্গেই হোক।’

যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত জয় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ সাক্ষাৎকার দেন, যা বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোরে সম্প্রচারিত হয়।

বৃহস্পতিবারের নির্বাচনের ফলাফলকে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ স্বাগত জানালেও জয় এ নির্বাচনকে বলছেন ‘প্রহসন’।

জয় বলেছেন, দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলকে বাইরে রেখে এবং বিরোধী শক্তিকে নিষিদ্ধ করে যে নির্বাচন হয়েছে তাকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলা যায় না।

তার মতে, এমন নির্বাচন টেকসই হবে না এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সম্ভাব্য ইতিবাচক মূল্যায়ন সম্পর্কেও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, বিদেশি পর্যবেক্ষকদের চলাচল ও পর্যবেক্ষণ ছিল সীমিত। ফলে তারা পুরো পরিস্থিতি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পেরেছেন কি না, সে প্রশ্ন থেকে যায়।

২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কারচুপির অভিযোগের প্রসঙ্গে জয় বলেন, তিন নির্বাচনের মধ্যে দুটিতে বিরোধী দল অংশ নেয়নি। অন্যটিতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপেই আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পূর্বাভাস ছিল।

তিনি স্বীকার করেন, প্রশাসনের কিছু ব্যক্তি অনিয়ম করে থাকতে পারেন এবং সেগুলোর তদন্ত হওয়া উচিত ছিল। তবে তার দাবি, এসব অনিয়ম সামগ্রিক ফলাফল বদলে দিত না। 

জুলাই-আগস্ট আন্দোলন প্রসঙ্গে জয় বলেন, আন্দোলনটি শুরুতে শান্তিপূর্ণ ছিল এবং দাবিগুলো যৌক্তিক ছিল। তবে সরকারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ছিল।

তিনি বলেন, যথাসময়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা না হওয়াই পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুসারে ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে জয় বলেন, ওই সংখ্যার মধ্যে পুলিশ সদস্য ও সরকার-সমর্থক কর্মীরাও রয়েছেন। সব মৃত্যুর দায় একতরফাভাবে সরকারের ওপর চাপানো উচিত নয়। তবে তিনি স্বীকার করেন, কয়েকশ মানুষের মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এটি এড়ানো গেলে ভালো হতো।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় অন্তত ৩২ জন শিশু মারা গেছে। তাদের পরিবারের কাছে আওয়ামী লীগ ক্ষমা চাইবে কি না সেই প্রশ্নের উত্তরে জয় বলে দাবি করেন, শেখ হাসিনার সরকার ‘তা করেছে’।

আমাদের সরকার পতনের আগেই, আন্দোলনের সময়ই আমার মা তাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। আমরা তাদের সঙ্গে দেখা করেছি। আমার মা ব্যক্তিগতভাবে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে জয় দাবি করেন, অডিও টেপের অংশবিশেষ প্রচার করা হয়েছে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, সহিংস হামলা প্রতিরোধ ছাড়া প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়নি।

জয় আগের মতই দাবি করেন, বিবিসি ও আল জাজিরা অডিও টেপের যে অংশটি প্রচার করেছে, তা কেটে নেওয়া একটি অংশ। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কখনও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের ‘অনুমতি দেওয়া হয়নি’।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কখনও বাংলাদেশে ফেরেন, তার সামনে কী অপেক্ষা করছে? তা নিয়ে জয় উদ্বিগ্ন কি না এ প্রশ্নের উত্তরে জয় বলেন, এ বিষয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন, কারণ তার বিশ্বাস, দেশের ‘অন্তত অর্ধেক জনগণ’ এই নির্বাচনকে কখনও ‘মেনে নেবে না’। 

বাংলাদেশে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা আছে কি না জানতে চাইলে জয় বলেন, ‘অবশ্যই একসময় ফিরব। দেখুন—তারেক রহমান দণ্ডিত হয়েছিলেন অথচ তিনি এখন সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী। এসব পরিস্থিতি চিরস্থায়ী হয় না।

তাহলে কি জয় বলতে চাইছেন যে একদিন হয়ত তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লক্ষ্যে দেশে ফিরে রাজনীতিতে নামবেন?

উত্তরে শেখ হাসিনার ছেলে বলেন, ‘না, আমার কখনও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না। আমি তা বলছি না। আমি বলছি, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। অতীতে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসবাদের যেসব দণ্ড হয়েছিল সেগুলো সব বাতিল করা হয়েছে, সন্ত্রাসীদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এসব কিছুই স্থায়ী হবে না, টেকসই নয়। আর হ্যাঁ, একসময় আমি বাংলাদেশে ফিরতে পারব।’

শেখ হাসিনা কখনও বাংলাদেশে ফিরবেন কি না, সেই প্রশ্নে জয় বলেন, আমার কোনো সন্দেহ নেই, তিনি একদিন ফিরবেন। তার প্রায় পুরো জীবনই কেটেছে বাংলাদেশে, সেখানেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কোনো একসময় তিনি ফিরবেন।

তবে এই মুহূর্তে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা ‘একেবারেই নিরাপদ হবে না’ বলে মনে করেন জয়।

আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মায়ের ভারতে থাকা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন, কারণ তার বিবেচনায় ভারতই এখন শেখ হাসিনার জন্য ‘পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা’।

ভারত সরকার তাকে পূর্ণ নিরাপত্তা দিচ্ছে। ভারতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। বাংলাদেশের বিচার প্রক্রিয়া তার ধারেকাছেও যায় না। তাই তার নিরাপত্তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন নই। বরং তিনি যেখানে আছেন, সেখানে আছেন বলে আমি স্বস্তি পাই।

তবে তার জন্য খারাপ লাগে—নিজ দেশের বাইরে থাকতে হচ্ছে, যা তিনি কখনও চাননি। ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থানের পর আমরা আগেও নির্বাসনে ছিলাম যখন আমার পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়েছিল।

জয় বলেন, ১৯৭৫ সালের সেই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ আবারও ফিরে এসেছে। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল। স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ।

রাজনৈতিক দলের সংস্কারের প্রসঙ্গে জয় বলেন, সংস্কার কোনো এককালীন প্রক্রিয়া নয় বরং এটি ধারাবাহিক ও চলমান বিষয়। আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক দল। হ্যাঁ, আওয়ামী লীগ তার নিজস্ব নেতৃত্ব ঠিক করবে। কিন্তু এই মুহূর্তে সেটিও সম্ভব নয়। তারা কারও সঙ্গে কথা বলা, দলীয় বৈঠক, সংবাদ সম্মেলন করতে পারছে না।

তিনি বলেন, ‘আমাদের কার্যালয়গুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও গ্রেপ্তারের ভয়ে থাকতে হচ্ছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের করার মত কিছুই নেই। তবে পরিস্থিতি বদলাবে—সবসময়ই বদলায়।’

২০২৪ সালের আগস্টের ঘটনাবলীর জন্য যদি তার মা দায়ী না হয় তাহলে দায়ী কে এই প্রশ্নের উত্তরে জয় বলেন, ‘প্রথমত, যদি বিচার নিয়ে কথা বলি তাহলে প্রতিবাদকারীদের হাতে সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ডকে দায়মুক্তি দেওয়া—পুলিশ সদস্য ও সরকার-সমর্থক কর্মীদের হত্যার জন্য আইনগত সুরক্ষা দেওয়া—যদি সেটিকেই বৈধ বলা হয় তাহলে অতীতে যা-ই ঘটুক না কেন তার বিচারের প্রসঙ্গই অর্থহীন হয়ে যায়। তখন আর বিচার নিয়ে কথা বলারই বা মানে কী? যদি হত্যাকাণ্ডই গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় তাহলে আর বিচার নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন কী?’

তারেক রহমান বলেছেন, তিনি ‘প্রতিশোধের রাজনীতির’ পথে যেতে চান না। তাহলে জয় কি তাকে মামলা প্রত্যাহারের অনুরোধ করবেন?

এই প্রশ্নে জয় বলেন, এটা তার হাতে নেই, সে দেশে থাকেন না। এটা পুরোপুরি দলের সিদ্ধান্তের বিষয়—তারা কী করতে চায়, সেটি তারাই ঠিক করবে।

‘বিএনপি বাংলাদেশের আরেকটি বড় রাজনৈতিক দল। অবশ্যই তাদের সঙ্গে কথা বলা উচিত। আমি সবসময়ই সেটা বলে এসেছি। বিএনপির কখনোই নির্বাচন বর্জন করা উচিত হয়নি। আর তারেক রহমান…আমি বলছি, নির্বাচনটি ভুয়া, তবে যদি তিনি প্রধানমন্ত্রী হন, তাহলে অবশ্যই আমরা তার সঙ্গে কথা বলব এবং তার সঙ্গে কাজ করব।’

বাংলাদেশে মুজিব পরিবার ও জিয়া পরিবারে বংশানুক্রমিক নেতৃত্বের অবসান হওয়া উচিত কি না, সেই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা কি বংশানুক্রমিক রাজনীতি? আমরা নিজেরা রাজনীতিতে থাকতে চাই? নাকি তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ দলীয় কাউন্সিলে বারবার আমাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন? প্রশ্নটা সেখানেই। দেখুন, আমি যদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হতে চাইতাম, অনেক আগেই হতে পারতাম। আমার মা এক দশকের বেশি সময় ধরে আমাকে নির্বাচনে দাঁড়াতে, সংসদ সদস্য হতে উৎসাহ দিয়ে আসছিলেন।’

জয়ের প্রধানমন্ত্রী না হতে চাওয়ার উত্তরে বলেন, ‘কারণ জীবনে এমন মানুষও থাকে, যারা যা আছে, তাতেই সন্তুষ্ট। সবাই ক্ষমতা বা অর্থকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখে না। আমার কখনোই ক্ষমতা বা টাকার প্রতি লোভ ছিল না। আমি স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারলেই খুশি।’

রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের