ব্যস্ত নগরজীবনে যানজট যেন নিত্যদিনের সঙ্গী। অফিস, কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা কোনো জরুরি কাজে বের হলে কখনো কখনো দীর্ঘ সময় রাস্তায় আটকে থাকতে হয়।
সামনে গাড়ির সারি, চারপাশে হর্নের শব্দ—আর আমাদের মূল্যবান সময় ধীরে ধীরে চলে যায়। কিন্তু একজন মুমিনের দৃষ্টিতে সময় কখনোই অর্থহীন নয়। যে সময় অন্যের কাছে শুধু অপেক্ষার সময়, একজন মুমিনের কাছে সেটিই হতে পারে জিকির, ইস্তিগফার, দরুদ, দোয়া ও আত্মশুদ্ধির মূল্যবান সুযোগ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো।
’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৪১)
অর্থাৎ আল্লাহর জিকিরের জন্য কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় বসে থাকার প্রয়োজন নেই। গাড়িতে বসে, যাত্রাপথে, অপেক্ষার সময়—সুযোগমতো আল্লাহকে স্মরণ করা যায়। তাই জ্যামে আটকে গেলে বিরক্ত না হয়ে ভাবুন—আল্লাহ আমাকে কয়েক মিনিটের এমন একটি অবসর দিয়েছেন, যা হয়তো অন্য সময় আমি বের করতে পারতাম না।
১. বেশি বেশি জিকির করুন
জ্যামে বসে থাকার সময়ের সবচেয়ে সহজ ও উত্তম আমল হলো জিকির।
মুখে উচ্চারণ করে কিংবা মনোযোগের সঙ্গে আল্লাহকে স্মরণ করা যায়। পড়তে পারেন—
سُبْحَانَ اللَّهِ
সুবহানাল্লাহ—আল্লাহ পবিত্র।
الْحَمْدُ لِلَّهِ
আলহামদুলিল্লাহ—সব প্রশংসা আল্লাহর।
اللَّهُ أَكْبَرُ
আল্লাহু আকবার—আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ।
لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ—আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ—আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।
২. বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন
জ্যামে বসে নিজের ভুল-ত্রুটির কথা স্মরণ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া যায়। বলুন—
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ
উচ্চারণ : আসতাগফিরুল্লাহ।
অর্থ : ‘আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’ মানুষ প্রতিদিন অসংখ্য ভুল করে—কথায়, কাজে, দৃষ্টিতে, চিন্তায়। অনেক গুনাহ আমরা জানিও না। তাই যানজটের সময়টি হতে পারে নিজের আমলনামা পরিষ্কার করার একটি সুন্দর সুযোগ।
৩. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরুদ পড়ুন
জ্যামে বসে দরুদ পড়াও অত্যন্ত সুন্দর একটি আমল। বলতে পারেন,
اللَّهُمَّ صَلِّ وَسَلِّمْ وَبَارِكْ عَلَىٰ نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ ﷺ
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত নাজিল করেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪০৮)
তাহলে যানজটের কয়েক মিনিটও কত বড় সুযোগ হতে পারে! অন্যরা হয়তো অস্থির হয়ে হর্ন দিচ্ছে, আর আপনি একই সময়ে নিজের জন্য আল্লাহর রহমত অর্জন করছেন।
৪. মনে মনে দোয়া করুন
জ্যামে বসে থাকা সময়টি দোয়ার জন্যও কাজে লাগানো যায়। নিজের জন্য, বাবা-মায়ের জন্য, স্ত্রী-সন্তানের জন্য, আত্মীয়স্বজনের জন্য এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করুন। বলুন-‘হে আল্লাহ! আমার গুনাহ ক্ষমা করুন, আমার ঈমানকে মজবুত করুন, আমাকে হালাল রিজিক দান করুন, আমার পরিবারকে হেফাজত করুন এবং আমাকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করুন।’
দোয়ার জন্য সবসময় নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় থাকা জরুরি নয়। বান্দা তার রবের কাছে যেকোনো বৈধ সময়ে নিজের প্রয়োজন তুলে ধরতে পারে।
৬. কোরআনের তিলাওয়াত শুনুন
আপনি যদি নিজে গাড়ি চালাচ্ছেন, তাহলে ফোন হাতে নিয়ে পড়া বা স্ক্রিনের দিকে তাকানো থেকে অবশ্যই বিরত থাকুন। কিন্তু নিরাপদভাবে অডিও কোরআন তিলাওয়াত শুনতে পারেন। আর আপনি যদি যাত্রী হন, তাহলে সময় ও পরিস্থিতি উপযোগী হলে কোরআন পড়তে পারেন বা তিলাওয়াত শুনতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে—গাড়ি চালানোর সময় ইবাদত করতে গিয়ে নিজের বা অন্যের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না। নিরাপদভাবে গাড়ি চালানোও দায়িত্বের অংশ।
৭. উপকারী জ্ঞান অর্জন করা
জ্যামে দীর্ঘ সময় আটকে থাকলে কোরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা, ইসলামি আলোচনা বা উপকারী শিক্ষামূলক অডিও শোনা যেতে পারে। এতে একই সঙ্গে দুটি লাভ—সময়ও নষ্ট হলো না, জ্ঞানও অর্জিত হলো। তবে কী শুনছি, তা বাছাই করা জরুরি। নির্ভরযোগ্য আলেম ও গ্রহণযোগ্য সূত্রের উপকারী জ্ঞান শোনা উচিত।
৮. নিজের জীবনের হিসাব নিন
জ্যামের সময়টি আত্মসমালোচনারও একটি সুযোগ। নিজেকে প্রশ্ন করুন—
১. আমি কি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছি?
২. আমার উপার্জন কি হালাল?
৩. বাবা-মায়ের সঙ্গে আমার আচরণ কেমন?
৪. কারও হক নষ্ট করেছি কি?
৫. কারও মনে কষ্ট দিয়েছি কি?
৬. আমি কি কোনো গুনাহকে ছোট মনে করছি?
৭. আমার জীবনে কোরআনের প্রভাব কতটুকু?
৮. মৃত্যুর জন্য আমি কতটা প্রস্তুত?
এভাবে কয়েক মিনিটের নীরব চিন্তাও একজন মানুষের জীবন পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।
৯. নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করুন
জ্যামে বসে আমরা সাধারণত যে বিষয়টি ভাবি তা হলো—‘কতক্ষণ লাগবে?’ কিন্তু একটু ভিন্নভাবে ভাবুন—‘আল্লাহ আমাকে কত কিছু দিয়েছেন!’ চোখ আছে, কান আছে, সুস্থ শরীর আছে, পরিবার আছে, খাবার আছে, নিরাপদে চলাফেরার সুযোগ আছে—কত নিয়ামত আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে! তখন মুখ থেকে বেরিয়ে আসবে— আলহামদুলিল্লাহ। এভাবে বিরক্তির মুহূর্তটি কৃতজ্ঞতার মুহূর্তে পরিণত হতে পারে।
১০. রাগ নিয়ন্ত্রণ করুন—এটিও একটি আমল
যানজটে আটকে গেলে অনেকের রাগ বেড়ে যায়। কেউ অযথা হর্ন দেন, কেউ অন্য চালককে গালাগাল করেন, কেউ উত্তেজিত হয়ে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু একজন মুমিনের উচিত নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী সে নয় যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি)
তাই যানজট আপনার ধৈর্যের পরীক্ষা হতে পারে। রাস্তা আটকে গেছে—আপনার চরিত্র যেন আটকে না যায়। কারণ হয়তো রাস্তা খুলতে ২০ মিনিট লাগবে; কিন্তু সেই ২০ মিনিটেই আপনার আমলনামায় এমন কিছু লেখা হয়ে যাবে, যা কিয়ামতের দিন আপনার জন্য রাস্তার চেয়েও বড় একটি দরজা খুলে দিতে পারে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

