মানুষ প্রতিদিন অসংখ্য বিস্ময়ের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করে। চোখ মেলে দেখে পৃথিবীর অপরূপ সৌন্দর্য, অনুভব করে বাতাসের স্পর্শ, শোনে পাখির গান, ভালোবাসে প্রিয়জনকে, স্বপ্ন দেখে ভবিষ্যতের এবং ছুটে চলে জীবন-জীবিকার সন্ধানে।
অথচ এসব ব্যস্ততার ভিড়ে মানুষ খুব কমই নিজের অস্তিত্ব নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে।তার সৃষ্টি, শারীরিক গঠন, চিন্তাশক্তি, অনুভূতি, পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক বৈচিত্র্য এবং জন্ম-মৃত্যুর ধারাবাহিকতা—সবকিছুর মধ্যেই লুকিয়ে আছে সৃষ্টিকর্তার মহিমার পরিচয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর পৃথিবীতে রয়েছে দৃঢ় বিশ্বাসীদের জন্য বহু নিদর্শন। আর তোমাদের নিজেদের মধ্যেও।
তবু কি তোমরা দেখবে না?’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ২০-২১)
পবিত্র কোরআনের আলোকে মানুষের অস্তিত্ব ও জীবনব্যবস্থার সাতটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে চিন্তা করলে আল্লাহর অসীম কুদরতের পরিচয় আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেগুলো হলো-
১. নিজের সৃষ্টির সূচনা নিয়ে চিন্তা
মানুষের অহংকার করার মতো অনেক কিছু থাকতে পারে—সম্পদ, ক্ষমতা, সৌন্দর্য, জ্ঞান কিংবা সামাজিক মর্যাদা। কিন্তু নিজের সৃষ্টির সূচনা নিয়ে চিন্তা করলে সে বুঝতে পারে, তার অস্তিত্বের শুরু কতটা ক্ষুদ্র এবং সে নিজে নিজের স্রষ্টা নয়। মানুষকে নিজের সৃষ্টির উপাদান ও উৎপত্তি নিয়ে ভাবার আহ্বান জানিয়ে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘অতএব, মানুষ যেন চিন্তা করে দেখে, কী থেকে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।
তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সবেগে স্খলিত পানি থেকে। এটা নির্গত হয় মেরুদণ্ড ও পাঁজরের হাড়ের মধ্য থেকে।’ (সুরা : তারিক, আয়াত : ৫-৭)
২. মাতৃগর্ভে জন্মপ্রক্রিয়া ও মানুষের বিকাশ নিয়ে চিন্তা
মানুষের জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায়গুলোর একটি হলো মাতৃগর্ভে তার বিকাশ। একটি নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে একটি পূর্ণাঙ্গ মানবশিশুর জন্ম—এ প্রক্রিয়া আল্লাহর অসীম ক্ষমতার এক অনন্য নিদর্শন। মাতৃগর্ভের সুরক্ষিত পরিবেশে শিশুর বিকাশ ঘটে, গঠিত হয় তার দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং নির্ধারিত সময়ের পর সে পৃথিবীর আলো-বাতাসে আসে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির উপাদান থেকে। অতঃপর আমি তাকে শুক্রবিন্দুরূপে স্থাপন করি এক নিরাপদ আধারে। পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি আলাকায়, অতঃপর আলাকাকে পরিণত করি মুদগায়, এরপর মুদগাকে পরিণত করি অস্থিতে, তারপর অস্থিকে আবৃত করি গোশত দ্বারা। অবশেষে তাকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টিরূপে। অতএব, সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত মহান!’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ১২-১৪)
৩. মানুষের ইন্দ্রিয়শক্তি ও শারীরিক গঠন নিয়ে চিন্তা
মানুষের দেহ এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। তার দুটি চোখ পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখার সুযোগ দেয়, কান শব্দ শুনতে সাহায্য করে, জিহ্বা কথা বলা ও স্বাদ গ্রহণে ভূমিকা রাখে, নাক ঘ্রাণ অনুভব করে এবং ত্বক স্পর্শ ও তাপমাত্রার পরিবর্তন বুঝতে সাহায্য করে। এসব ইন্দ্রিয়ের পাশাপাশি মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র, হৃদ্যন্ত্র ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সমন্বিত কার্যক্রম মানুষের জীবনকে সচল রাখে। এসব নিয়ামতের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি কি তার জন্য সৃষ্টি করিনি দুই চোখ? আর জিহ্বা ও দুই ঠোঁট?’ (সুরা : বালাদ, আয়াত : ৮-৯)
অন্যত্র আল্লাহ আরো বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম অবয়বে।’ (সুরা : তিন, আয়াত : ৪)
৪. মানবসমাজের বৈচিত্র্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে চিন্তা
পৃথিবীর মানুষের মধ্যে ভাষা, বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী, সংস্কৃতি, জীবনযাপন ও সামাজিক পরিবেশের নানা পার্থক্য রয়েছে। কেউ বাংলায় কথা বলে, কেউ আরবিতে; কেউ পাহাড়ে বসবাস করে, কেউ মরুভূমিতে; কারও গায়ের রং উজ্জ্বল, কারও শ্যামবর্ণ। কিন্তু এসব পার্থক্য মানুষের মৌলিক মানবিক মর্যাদাকে পরিবর্তন করে না। আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে এবং তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবিশেষ অবহিত।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)
৫. দাম্পত্য জীবন ও পারিবারিক বন্ধন নিয়ে চিন্তা
মানুষের জীবনে পরিবার এক অনন্য আশ্রয়। পৃথিবীতে জন্ম নেওয়ার পর একটি শিশু দীর্ঘদিন বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের যত্ন, ভালোবাসা ও সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে বেড়ে ওঠে। পরিবারের মধ্যেই সে প্রথম কথা বলতে শেখে, ভালোবাসার অর্থ বোঝে, শিষ্টাচার আয়ত্ত করে এবং সামাজিক জীবনের প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে। দাম্পত্য জীবন ও পারিবারিক বন্ধনকে আল্লাহর নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো; আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা : রূম, আয়াত : ২১)
৬. জীবন-জীবিকার শৃঙ্খলা নিয়ে চিন্তা
মানুষের দৈনন্দিন জীবন একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার ওপর পরিচালিত হয়। রাত আসে, মানুষ বিশ্রাম নেয়; দিন আসে, মানুষ কর্মক্ষেত্রে বের হয়। কেউ কৃষিকাজ করে, কেউ ব্যবসা পরিচালনা করে, কেউ জ্ঞানচর্চা করে, কেউ শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। আবার পৃথিবীতে খাদ্য উৎপাদন, পানি সরবরাহ, পরিবেশের ভারসাম্য এবং মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য ভূমিকা রাখে। মানুষের ঘুম, জীবিকা অন্বেষণ এবং সময়ের পরিবর্তনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে রাতে ও দিনে তোমাদের নিদ্রা এবং তাঁর অনুগ্রহ থেকে তোমাদের জীবিকা অন্বেষণ। নিশ্চয়ই এতে শ্রবণকারী সম্প্রদায়ের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা : রূম, আয়াত : ২৩)
৭. জীবনকাল, যৌবন, বার্ধক্য ও মৃত্যু নিয়ে চিন্তা
মানুষের জীবন চিরস্থায়ী নয়। জন্মের পর সে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে, শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে, কৈশোর থেকে যৌবনে এবং একসময় বার্ধক্যে উপনীত হয়। কারও জীবন দীর্ঘ হয়, কারও জীবন অল্প বয়সেই শেষ হয়ে যায়। মানুষের এই পরিবর্তনশীল জীবনপ্রবাহ তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, পৃথিবীতে তার অবস্থান সাময়িক এবং একদিন তাকে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে, পরে শুক্রবিন্দু থেকে, তারপর জমাট রক্ত থেকে; অতঃপর তিনি তোমাদের বের করেন শিশুরূপে, তারপর তোমরা উপনীত হও তোমাদের পূর্ণ যৌবনে, তারপর তোমরা হয়ে যাও বৃদ্ধ। আর তোমাদের মধ্যে কারও কারও এর আগেই মৃত্যু ঘটে। আর যাতে তোমরা নির্ধারিত কাল পর্যন্ত পৌঁছতে পারো এবং যেন তোমরা অনুধাবন করতে পারো।’ (সুরা : গাফির, আয়াত : ৬৭)
মহান আল্লাহ আমাদের তাঁর সৃষ্টির নিদর্শনগুলো নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করার, সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করার এবং তাঁর সন্তুষ্টি অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

