বাইরে থেকে দেখে মনে হবে জীবনটা বেশ গোছানো, চাকচিক্যময় ও দারুণ আনন্দে কাটছে। বন্ধুদের সাথে হাসিমুখে আড্ডা দিচ্ছেন, অফিসে নিজের কাজগুলোও সময়মতো শেষ করছেন কিংবা পরিবারের সাথে স্বাভাবিক সময় কাটাচ্ছেন— অথচ মনের ভেতরটা তীব্র শূন্যতা, ক্লান্তি আর দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন।
মানসিক স্বাস্থ্যের পরিভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় ‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ বা হাই-ফাংশনিং ডিপ্রেশন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক রোগনির্ণয় নির্দেশিকায় সরাসরি ‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ বা ‘হাই-ফাংশনিং ডিপ্রেশন’ নামের কোনো রোগলিপি নেই। তবে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই টার্মটি এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন, যারা ভেতরে চরম হতাশায় ভুগলেও বহির্বিশ্বে নিজেদের অত্যন্ত হাসিখুশি ও স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করেন।
কেন বোঝা যায় না এই বিষণ্ণতা?
সাধারণত বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজেদের গুটিয়ে নেন এবং দৈনন্দিন দায়িত্ব পালন করতে হিমশিম খান।
কিন্তু স্মাইলিং ডিপ্রেশনে ঠিক উল্টোটা ঘটে। আক্রান্ত ব্যক্তিরা এতটাই নিখুঁতভাবে নিজেদের কষ্ট লুকিয়ে রাখেন যে পরিবার, বন্ধুবান্ধব বা সহকর্মীরা ঘুণাক্ষরেও টের পান না তাদের কোনো সাহায্যের প্রয়োজন আছে কি না। এমনকি আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেও অনেক সময় বুঝতে পারেন না যে তার এই মানসিক সংগ্রামগুলো আসলে বিষণ্ণতারই লক্ষণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের সমস্যা সাধারণত এমন মানুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়—
যেসব সংস্কৃতিতে মানসিক অসুস্থতাকে ট্যাবু বা সামাজিক কলঙ্ক হিসেবে দেখা হয়।
যারা নিজেদের দুর্বল বা নিয়ন্ত্রণহীন হিসেবে প্রকাশ করতে চরম ভয় পান।
যারা দীর্ঘদিন ধরে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতা ব্যাধিতে ভুগে থাকেন।
এ ছাড়াও নারী, ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষণ্ণতার ইতিহাস রয়েছে এমন ব্যক্তি কিংবা বড় ধরনের কোনো মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষেরা এতে বেশি সংবেদনশীল হন।
লুকিয়ে থাকা লক্ষণসমূহ:
১। দীর্ঘস্থায়ী দুঃখ, উদ্বেগ।
২। অতীতে যে কাজগুলোতে আনন্দ পেতেন, সেগুলোর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।
৩। অতিরিক্ত ক্লান্তি, শক্তির অভাব কিংবা সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হওয়া।
৪। ঘুমের গোলমাল বা ক্ষুধায় পরিবর্তন।
৫। কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই শারীরিক ব্যথা, মাথাব্যথা বা হজমের সমস্যা।
৬। মৃত্যু বা আত্মহত্যার নেতিবাচক চিন্তা আসা।
এই লক্ষণগুলোর কোনো কোনোটি যদি একটানা অন্তত দুই সপ্তাহ ধরে কারও জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটায়, তবে তা অবহেলা না করে গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত।
চিকিৎসা ও উত্তরণের উপায়:
যেহেতু স্মাইলিং ডিপ্রেশন বাইরে থেকে সহজে বোঝা যায় না, তাই অনেক সময় চিকিৎসকের কাছে যেতে বা সহায়তা চাইতে দেরি হয়ে যায়। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে ওজন সমস্যা, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা অ্যালকোহল ও মাদকের অপব্যবহারের মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আপনার বা আপনার চেনা কারও মধ্যে যদি এমন লক্ষণ দেখা যায়, তবে প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে কোনো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা চিকিৎসক বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া। থাইরয়েডের সমস্যা বা অন্য কোনো শারীরিক কারণে এমন হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করার পর চিকিৎসকরা থেরাপি বা অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার মাধ্যমে এই জটিলতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারেন। মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটু সচেতনতা এবং সময়মতো সঠিক পদক্ষেপই পারে এই নিঃশব্দ লড়াই থেকে একজন মানুষকে নিরাপদ ও সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

