ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসে দীর্ঘদিনের চলা একটি বহুল আলোচিত তদন্তের চূড়ান্ত নিস্পতি ঘটেছে। একাধিক আর্থিক অনিয়ম ও নীতিভঙ্গের দায় স্বীকার করে নিয়েও বড় ধরনের পয়েন্ট কর্তনের চরম শাস্তি থেকে রেহাই পেয়েছে লন্ডনের প্রভাবশালী ফুটবল ক্লাব চেলসি।
তবে এই অনিয়মের মাশুল হিসেবে ক্লাবটিকে ১ কোটি পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা) জরিমানা গুনতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি পর পর দুই দলবদল মৌসুমে নতুন খেলোয়াড় নিবন্ধনে নিষেধাজ্ঞার নির্দেশ দেওয়া হলেও তা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, মূলত ২০০৯ থেকে ২০২২ সালের দীর্ঘ সময়সীমার মধ্যে খেলোয়াড়দের এজেন্টদের অর্থ পরিশোধ সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ নিয়ম লঙ্ঘনের দায়েই চেলসির বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তদন্তের তথ্যানুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে একাধিক খেলোয়াড় হস্তান্তরের সময় নিবন্ধিত নন এমন এজেন্ট এবং অনিবন্ধিত তৃতীয় পক্ষকে গোপনে প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ড (প্রায় ৭৭৫ কোটি টাকা) পরিশোধ করেছিল চেলসি কর্তৃপক্ষ।
প্রকৃতপক্ষে, ২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময়কালে ক্লাবটির মালিকানায় ছিলেন রুশ ধনকুবের রোমান আব্রামোভিচ এবং আলোচিত সব অনিয়মই ঘটেছিল তাঁর আমলে। পরবর্তীতে ২০২২ সালে বর্তমান মালিক টড বোহলি ও ক্লিয়ারলেক ক্যাপিটাল ক্লাবটির মালিকানা গ্রহণ করার পর তারা নিজেরাই এফএর কাছে স্বপ্রণোদিত হয়ে ৭৪টি নিয়মভঙ্গের চাঞ্চল্যকর তথ্য ও নথি তুলে ধরেন। এফএর স্বাধীন নিয়ন্ত্রক কমিশন স্পষ্ট করেই উল্লেখ করেছে, চেলসির বর্তমান মালিকপক্ষ নিজেরা উদ্যোগী হয়ে এই বিষয়গুলো সামনে না আনলে হয়তো এসব আর্থিক অনিয়ম কখনোই জনসমক্ষে উন্মোচিত হতো না।
প্রথমে এই গুরুতর অপরাধের শাস্তিস্বরূপ চেলসির জন্য ২ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড জরিমানা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে নিজেদের উদ্যোগে অনিয়মের তথ্য প্রকাশ করা এবং পুরো তদন্ত প্রক্রিয়ায় অভূতপূর্ব ও ব্যতিক্রমধর্মী সহযোগিতা প্রদর্শনের কারণে শুরুতেই তাদের মূল জরিমানা এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে ১ কোটি ৭২ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ডে নামিয়ে আনা হয়। পরবর্তীতে এফএর কাছে অতি দ্রুত অপরাধ স্বীকার করে নেওয়ায় সেই অঙ্ক আবারও এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস পায়। সর্বশেষে, ইতিপূর্বে উয়েফা ও প্রিমিয়ার লিগের পক্ষ থেকে দেওয়া জরিমানাগুলো বিবেচনায় এনে চূড়ান্ত জরিমানা নির্ধারণ করা হয় ১ কোটি পাউন্ডে। এফএ নিশ্চিত করেছে, চেলসির কাছ থেকে প্রাপ্ত এই জরিমানার অর্থ ইংল্যান্ডের একদম তৃণমূল পর্যায়ের ফুটবলের সামগ্রিক উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।
জরিমানার পাশাপাশি চেলসিকে দুটি দলবদল মৌসুমে নতুন খেলোয়াড় নিবন্ধনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পাশাপাশি ৬ পয়েন্ট কর্তনের নির্দেশ দেওয়া হলেও, এই দুটি শাস্তিসমূহ ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর অর্থ হলো, নির্ধারিত এই সময়সীমার মধ্যে ক্লাবটি যদি পুনরায় নতুন কোনো অনিয়মে জড়িয়ে না পড়ে, তবে এই শাস্তি কার্যকর করা হবে না। কমিশন জানিয়েছে, পয়েন্ট কাটার শাস্তি স্থগিত রাখার পেছনে মূল কারণ হলো এফএ নিজেরা পয়েন্ট কর্তনের জন্য আলাদা আবেদন জানায়নি এবং প্রিমিয়ার লিগও ক্লাবটির বিরুদ্ধে এমন শাস্তির প্রস্তাব করেনি।
তদন্ত প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হওয়ার পর এক বিবৃতিতে স্বস্তি প্রকাশ করেছে চেলসি। তারা জানায়, এফএর চূড়ান্ত তদন্ত শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে ক্লাবের বিরুদ্ধে চলমান সকল নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ অবসান ঘটেছে। একই সাথে পুরো তদন্ত প্রক্রিয়াটি সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে সহায়তার জন্য তারা উয়েফা, প্রিমিয়ার লিগ ও এফএকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানায়। উল্লেখ্য, চলতি বছরের মার্চ মাসেও একাডেমির খেলোয়াড় নিবন্ধনে অনিয়ম করায় চেলসিকে নয় মাসের নিষেধাজ্ঞা ও ৭ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করা হয়েছিল। তবে অতীতের সব ভুল স্বউদ্যোগে প্রকাশ করায় এবার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় বিপর্যয় ও পয়েন্ট কর্তন থেকে বাঁচল ব্লুজরা।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

