বিশ্বকাপ বয়কট করার নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। বিপিএলে বিদেশি ক্রিকেটারের ছাড়পত্রে জটিলতা, দ্বিপক্ষীয় সিরিজে কাটছাঁট হওয়ার আশঙ্কা, প্রশাসনিক শাস্তি ও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে সেই শঙ্কামুক্ত করেছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) কূটনৈতিক চাল। বিশ্বকাপ বয়কট করায় বাংলাদেশকে কোনো শাস্তি না দেওয়ার শর্তে ভারতের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলতে রাজি হয়েছে দেশটি।
বিসিবি এক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে গতকাল সোমবার পাকিস্তানকে অনুরোধ করেছে ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের গ্রুপ ম্যাচ খেলার জন্য। আরব আমিরাত ক্রিকেট বোর্ডও বিবৃতি দিয়ে ভারতের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলার জন্য পাকিস্তানকে অনুরোধ করেছে। পাকিস্তানকে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে রাজি করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করায় বাংলাদেশকে পুরস্কৃত করছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল। বিশ্বকাপ বয়কট করায় কোনো ধরনের শাস্তি পাচ্ছে না বিসিবি।
বাংলাদেশকে সমর্থন জানিয়ে পাকিস্তান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচ খেলবে না তারা। এ ঘোষণার পর ক্রিকেট বিশ্বে আর্থিক ক্ষতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। আইসিসি উদ্যোগ নেয় পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান করার। রোববার লাহোরে পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি ও বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত আইসিসির ভাইস চেয়ারম্যান ইমরান খাজার সভায় দুই দেশের ক্রিকেটের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে দরকষাকষি হয়। পিসিবি নিজেদের সুবিধা আদায়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্রিকেটের স্বার্থ রক্ষার নিশ্চয়তার বিনিময়ে ভারতের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলতে রাজি হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিসিবি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পাকিস্তানকে ম্যাচ খেলার অনুরোধ করায় বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে। বিসিবি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ১৫ মিনিট পর আইসিসি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, বিশ্বকাপ বয়কট করা বা সাম্প্রতিক ঘটনায় বাংলাদেশের ওপর কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
আইসিসি বিজ্ঞপ্তিতে লিখেছে, ‘বর্তমান বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে (বিশ্বকাপ বয়কট) বিসিবির ওপর কোনো আর্থিক, ক্রীড়া বা প্রশাসনিক জরিমানা বা শাস্তি আরোপ করা হবে না। বিসিবি চাইলে বিরোধ নিষ্পত্তি কমিটির (ডিআরসি) সঙ্গে যোগাযোগ করার অধিকার রাখে, যদি তা করতে চায়। এই অধিকার বর্তমান আইসিসির নিয়ম অনুসারে বিদ্যমান। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয় আইসিসি নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতার নীতি দ্বারা পরিচালিত হয়, শাস্তির পরিবর্তে সহায়তার নীতিকে প্রতিফলিত করে। সংস্থাটি জানায়, ২০৩১ সালে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার সমুন্নত রাখা হবে এবং এর আগে একটি আইসিসি ইভেন্ট আয়োজনের সুযোগ দেওয়া হবে। আইসিসির সঙ্গে এ নিয়ে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে।
আইসিসির প্রধান নির্বাহী সঞ্জয় গুপ্ত বলেন, ‘আইসিসি পুরুষদের টি২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি দুঃখজনক, কিন্তু একটি মূল ক্রিকেট জাতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রতি আইসিসির স্থায়ী প্রতিশ্রুতিতে কোনো পরিবর্তন হবে না। আমাদের লক্ষ্য বিসিবিসহ গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা, যাতে দেশে খেলাধুলার টেকসই বিকাশ নিশ্চিত করা যায়। খেলোয়াড় ও ভক্তদের জন্য ভবিষ্যতের সুযোগগুলো আরও শক্তিশালী করা যায়। বাংলাদেশ একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ক্রিকেট ইকোসিস্টেম হিসেবে রয়ে গেছে।’
এদিকে বিসিবির বিজ্ঞপ্তিতে সভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘বাংলাদেশকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় আমরা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত। আমাদের ভ্রাতৃত্ব দীর্ঘজীবী হোক।’ তিনি জানান, পাকিস্তানে তাঁর সংক্ষিপ্ত সফরে যে আলোচনা হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে ক্রিকেট ইকোসিস্টেমের সুবিধার্থে ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তান ম্যাচ খেলার অনুরোধ করেন। আইসিসির কাছেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বিসিবি সভাপতি, ‘সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টায় ইতিবাচক ভূমিকা পালনের জন্য বিসিবি, পিসিবি, আইসিসি ও সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’ বিশেষ করে, পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নকভি ও পাকিস্তানের ক্রিকেটভক্তদের প্রতি গভীর ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
এই সুবিধা আদায় করতে মহসিন নাকভির আহ্বানে রোববার মধ্যরাতে পাকিস্তান রওনা দেন বিসিবি সভাপতি। লাহোর বিমানবন্দরে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছেন পিসিবির পক্ষ থেকে। গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে পিসিবির সদরদপ্তরের বৈঠকেও গুরুত্ব পেয়েছেন। পাকিস্তানি মিডিয়ার খবর, বিসিবি ও পিসিবির দুই প্রধানদের সঙ্গে প্রায় ৫ ঘণ্টা বৈঠক হয়েছে ইমরান খাজার। মূলত ১৫ ফেব্রুয়ারি টি২০ বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মাঠে গড়ানোর নিশ্চয়তা পেতেই লাহোর সফর করেছেন আইসিসির ওই প্রতিনিধি। আমিনুল ইসলামও আইসিসির নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর বার্তা নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় সফর শেষ করে দেশে ফিরেছেন সোমবার সন্ধ্যায়।
পাকিস্তানের প্রভাবশালী ক্রীড়া সাংবাদিক শাহিদ হাশমি তাঁর নিউজ পোর্টাল টেলিকম এশিয়া ডটনেটের একটি প্রতিবেদনে লিখেছেন, বৈঠকে পিসিবি চেয়ারম্যান কিছু শর্ত দিয়েছেন ভারত-পাকিস্তানের বিশ্বকাপ ম্যাচ মাঠে গড়ানো নিয়ে। তাঁর প্রথম শর্ত ছিল আইসিসির বার্ষিক রাজস্ব বণ্টনে পাকিস্তানের অনুদান বাড়াতে হবে। ১৩ বছর ধরে স্থগিত ভারত-পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় সিরিজ চালু করতে হবে এবং ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হলে ভারতীয় ক্রিকেটারদের অবশ্যই হাত মেলাতে হবে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্যও তিনটি দাবি রেখেছেন তিনি আইসিসির ভাইস চেয়ারম্যানের কাছে। যার মধ্যে প্রথম দাবি– টি২০ বিশ্বকাপ না খেলায় বাংলাদেশকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। দ্বিতীয় দাবি টি২০ বিশ্বকাপের অংশগ্রহণ ফি দিতে হবে এবং সর্বশেষ দাবি, ২০২৮ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব দিতে হবে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

