ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার ধারা বাজারের সকালটা ছিল অন্য দিনের চেয়ে আলাদা। ধারা উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের সামনে তখন ভোটারদের আসা-যাওয়া। সেই ভিড়ের মধ্যেই সবার নজর কাড়লেন এক বৃদ্ধা- দুই নাতির কাঁধে ভর করে ভোট দিতে আসা ১২০ বছর বয়সী তৈয়বজান।
হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-১ আসনের ৯ নম্বর ধারা ইউনিয়নের এই কেন্দ্রটিতে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে ভোট দিয়ে ফেরার সময় দেখা যায় তাকে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর, নিজে হাঁটার ক্ষমতা নেই। তবু ভোটাধিকার প্রয়োগে ছিল না কোনো দ্বিধা।
দুই নাতির কাঁধে চড়ে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসছিলেন তৈয়বজান। মুখে তৃপ্তির হাসি। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নিজ হাতে আমার পছন্দের প্রার্থীকেই ভোট দিছি। ভোট দিতে পারছি, ভালো লাগছে।’ তার কণ্ঠে ছিল গর্ব, চোখে ছিল দায়িত্ব পালন করার তৃপ্তি।
তৈয়বজানের মতো আরও অনেক ভোটারের উপস্থিতিতে ধারা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের সকালটা ছিল প্রাণবন্ত। একই ইউনিয়নের পূর্বধারা গ্রামের বাসিন্দা আকিবুল ইসলাম জানান, তিনি দীর্ঘ ১৬-১৭ বছর পর ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। ‘নিজের মতো করে ভোট দিতে পেরেছি,’ বলেন তিনি।
এই কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের ব্যবস্থায়ও ছিল আলাদা আয়োজন। নিচতলায় নারীদের জন্য এবং দোতলায় পুরুষ ভোটারদের জন্য বুথ করা হয়েছে। দোতলা থেকে দুই হাতে ক্র্যাচে ভর দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে নামতে দেখা যায় এক শারীরিকভাবে অসুস্থ ভোটারকে। কষ্ট হলেও ভোট দেওয়ার আগ্রহে তিনি কেন্দ্রে এসেছেন।
ধারা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের মোট ভোটার সংখ্যা ৪ হাজার ৩০৫ জন। কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মুহাম্মদ মোজাহারুল হক জানান, ‘ভোট শুরুর এক ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ২০০ ভোট পড়েছে। পরিবেশ এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক রয়েছে।’
তবে প্রার্থীদের পক্ষ থেকেও ছিল কেন্দ্র পরিদর্শন। এ আসনে ঘোড়া প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেল ধারা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে আসেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠুভাবেই হচ্ছে। ভোট দেওয়ার পরও কেউ কেউ কেন্দ্রে বেশি সময় অবস্থান করছেন- এমন কথা শুনে খোঁজ নিতে এসেছিলাম।’
অবশ্য প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মুহাম্মদ মোজাহারুল হক এ অভিযোগের সত্যতা পাননি বলে জানান।
অন্যদিকে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সৈয়দ ইমরান সালেহ প্রিন্স অভিযোগ করেছেন ভোটার তালিকা নিয়ে বিভ্রান্তির। মুঠোফোনে তিনি বলেন, ‘ভোটার তালিকায় নাম আছে, অ্যাপেও দেখাচ্ছে। কিন্তু কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে গেলে বলা হচ্ছে নাম নেই। এমন কিছু অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটছে।’
এসব অভিযোগের মধ্যেও ধারা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের মূল চিত্রটা ছিল ভোটারদের অংশগ্রহণে সরব। বৃদ্ধা তৈয়বজানের মতো কেউ দায়িত্ববোধ থেকে, কেউ বহুদিন পর সুযোগ পেয়ে- নিজ নিজ কারণে কেন্দ্রে হাজির হয়েছেন।
স্থানীয়দের মতে, বয়স, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা দীর্ঘ বিরতির পরও ভোট দিতে মানুষের এই আগ্রহ নির্বাচনকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। বিশেষ করে তৈয়বজানের উপস্থিতি যেন মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্রের শক্তি শুধু রাজনীতিতে নয়, মানুষের বিশ্বাস ও অংশগ্রহণেও।
ভোটের লাইনে দাঁড়ানো এক তরুণ বলেন, নানুর বয়স ১২০ বছর, তাও ভোট দিতে এসেছেন। আমরা তো সুস্থ, ভোট দেব না কেন?
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

