মাথায় কৃত্রিম খুলি নিয়ে ছোট্ট মুসার বেঁচে থাকা

শুক্রবার,

২৪ জুলাই ২০২৬,

৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

শুক্রবার,

২৪ জুলাই ২০২৬,

৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

Radio Today News

মাথায় কৃত্রিম খুলি নিয়ে ছোট্ট মুসার বেঁচে থাকা

রেডিওটুডে রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১৫:৫৫, ২৪ জুলাই ২০২৬

Google News
মাথায় কৃত্রিম খুলি নিয়ে ছোট্ট মুসার বেঁচে থাকা

হাতে ছোট্ট একটা খেলনা পিয়ানো। একমনে সেটায় টুং টাং শব্দে সুর তুলতে ব্যস্ত সাড়ে আট বছরের শিশু বাসিত খান মুসা। তবে ভালোভাবে খেয়াল করতেই দেখা গেলো, সে আসলে পিয়ানো বাজাচ্ছে একটি হাত দিয়ে। শুধু বাম হাতে সুর তুলছে, আর ডান হাত অলস পড়ে আছে সোফায়।

শিশুটির নাকে লাগানো তরল খাবারের নল। যেটি সার্বক্ষণিক এভাবেই লাগানো থাকে। মুসার বাবা মুস্তাফিজুর রহমান জানালেন, তার শরীরের ডান অংশ অর্থাৎ ডান হাত, ডান পা'সহ 'পুরোটাই প্যারালাইজড'। ফলে সে ডান অংশ দিয়ে কোনো কিছু করতে পারে না।

"গুলিটা ওর লেগেছিলো মাথার বাম অংশে। এক পাশ দিয়ে ঢুকে সাইড দিয়ে বেরিয়ে যায়। তারপর থেকেই ওর এই অবস্থা। দীর্ঘদিনের চেষ্টায় জীবনটা বেঁচে গেছে। কিন্তু এরকম -একপাশ অবশ, কথা বলতে পারে না, চিবিয়ে খেতে পারে না, তরল খাবার দিতে হয়" বলেন মুস্তাফিজুর রহমান।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে চৌদ্দ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। মারাও গেছেন অনেকে। সেই আহতদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ শিশু।

আবার সেই সময় যারা নির্বিচারে গুলিতে নিহত হয়েছেন, তাদেরও অনেকের বয়স চার বছর থেকে সতের বছরের মধ্যে। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের হিসেবে জুলাই আন্দোলনে এরকম নিহত শিশুর সংখ্যা ১২৮ জন। জুলাইয়ের সেই গণ-অভ্যুত্থানের পরে এখন দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সেই সহিংসতার ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে অনেক শিশু-কিশোর। আর যাদের জীবন চলে গেছে, তাদের পরিবারগুলো বেঁচে আছে সন্তানের স্মৃতি নিয়ে।

একই গুলিতে আহত নাতি, মৃত্যু ঘটে দাদী'র

দিনটা ছিলো ২০২৪ সালের ১৯শে জুলাই। মুসা তার বাবার কাছে বায়না ধরে আইসক্রিম খাওয়ার। বাবা রাজি হন। একপর্যায়ে বাবার সঙ্গে ফ্লাট থেকে নিচে নেমে আসে শিশুটি। একটু পেছনেই ছিলেন তার দাদী মায়া ইসলাম। তাদের বাড়ি ছিলো ঢাকার রামপুরায়। ঠিক সেই সময় বাইরে হঠাৎ শুরু হয় পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। শুরু হয় গোলাগুলি। মুসা বাড়ির গ্যারেজে তার বাবার সঙ্গেই দাঁড়িয়ে ছিলো। হঠাৎ একটি বুলেট ছুটে আসে সেখানে।

মুস্তাফিজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "যখন গুলিটা আসলো বাইরে থেকে তখন সবাই একটা চিৎকার দিলো। আমিও চিৎকার দেই। পরে দেখি যে আমার ছেলেটা মাটিতে শুয়ে আছে। আর মাথা দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। তখনই আমি বুঝতে পারি যে, গুলিটা ওকেই লাগছে। আমি তখন ওকে বুকে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে দৌড় দেই।" তখনও মুস্তাফিজুর রহমান জানতেন না যে পেছনেই তার মা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

"আমি তো পাগলের মতো মুসাকে নিয়ে বাইরে দৌড় দিছি। ওই গুলিটাই যে আমার মায়ের পেটে ঢুকে আরেকপাশ দিয়ে বের হয়ে গেছে, আমি জানতাম না। আমি মুসাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাবার পর আম্মার নাম্বারে কল দিচ্ছিলাম। কিন্তু কেউ রিসিভ করছিলো না। পরে বাড়ির কেয়ারটেকারের নাম্বার থেকে কল আসে যে, আম্মার গুলি লাগছে!" যোগ করেন মুস্তাফিজুর রহমান।

তার মা একদিন পরেই মারা যায়। কিন্তু সেদিকে তখন ঘুরে তাকানোরও সময় ছিলো না মুস্তাফিজের। কারণ সাড়ে ছয় বছরের মুসা তখন আইসিইউতে ভর্তি, জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।

"আমি আমার মায়ের দাফন করতেও যেতে পারিনি। কারণ তখন ছেলেকে দেখার মতো কেউ ছিলো না।"

আইসিইউতে নয় মাস, মাথায় অপারেশন একুশবার

সন্তানকে বাঁচানোর চেষ্টা চালিয়ে যান মুস্তাফিজুর রহমান। ঢাকা মেডিকেল হয়ে সিএমএইচ, এরপর বিদেশে উন্নত চিকিৎসা -সবকিছুই চলতে থাকে সরকারি-বেসরকারি সহায়তায়। কোটি কোটি টাকার ব্যয়বহুল চিকিৎসা। এরমধ্যে প্রায় একটানা সাত মাস বাসিত খান মুসাকে থাকতে হয় আইসিউতে।

মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, "ওর অপারেশন হয়েছে দেশে এবং বিদেশে মিলিয়ে মোট একুশটা। সবগুলোই ওর মাথায়। এতোগুলো সার্জারি হয়েছে যে, মাথার খুলির একপাশের হাড় আর লাগানোর মতো অবশিষ্ট ছিলো না।

"পরে একপাশে কৃত্রিম খুলি লাগিয়ে দেয়া হয়। ওর মাথার ডান পাশে আরেকটা যন্ত্র লাগানো আছে। যেটা দিয়ে মাথার ভেতরে একটা পানি বের হয়, সেই পানিটা ঐ যন্ত্র দিয়ে পেটে পাঠানো হয়। নইলে ওর মাথা ফুলে যায়, প্রচণ্ড ব্যাথা হয়।" দিনের পর দিন চিকিৎসা, সার্জারি আর ওষুধ চলার পর এখন মুস্তাফিজুর রহমানের সন্তান আগের চেয়ে কিছুটা সুস্থ হয়েছে।

"ও তো কোনো নড়াচড়াই করতে পারতো না। গুলিবিদ্ধ হওয়ার সাত মাস পর আমরা ওর কাছে প্রথম বাবা, মা -এই শব্দগুলো শুনছি। এখনও ও কথা বলতে পারে না। দুয়েকটা শব্দ বলে শুধু। চলতে-ফিরতে পারে না। তবে সবকিছু বুঝে, শুনতে পায়।" মুস্তাফিজ আশায় আছেন তার সন্তান শিগগিরই হয়তো আরো সুস্থ হয়ে উঠবে, চলাফেরা করতে পারবে। কিন্তু চিকিৎসা নিয়ে তার উদ্বেগ আছে।

"আমাদের একটা ফলোআপে যাওয়ার কথা ছিলো সিঙ্গাপুরে। কিন্তু টাকার অভাবে যেতে পারছি না। ডেট মিস হয়ে গেছে। সরকার পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন নাকি সবকিছু নতুন করে আবেদন করতে হবে।

"ফলে মন্ত্রণালয় থেকে টাকার বিষয়ে কোনো খবর পাচ্ছি না। আবার ওর জন্য যে ওষুধ এবং তরল খাবার দরকার, সেটা শুধু বিদেশেই পাওয়া যায়। ইতোমধ্যেই ওর দুধ শেষ" বলেন মুস্তাফিজুর রহমান।

'ছেলে জীবিত থাকতে সময় দিতে পারি নাই' আক্ষেপ বাবা'র

জুলাই আন্দোলনে 'শহীদদের তালিকা' করেছে সরকার। সর্বশেষ যে সরকারি হিসাব, সেখানে গেজেটভুক্ত 'শহীদের সংখ্যা' আটশত তেতাল্লিশ।

তবে এরমধ্যে শুধু শিশু-কিশোরের সংখ্যা একশত আটাশ, যারা সকলেই জুলাই আন্দোলনে নিহত হয়েছেন। সেই একশত আটাশ জনেরই একজন সাভারের মাদ্রাসা ছাত্র ছায়াদ মাহমুদ খান। বয়স সাড়ে বার বছর। সাভারে আন্দোলনে গিয়ে গুলি লাগে তার ডান পায়ের উরুতে। পরে রক্তক্ষরণেই মারা যায়।

তার বাবা বাহাদুর খান জানান, সেদিন তার ছেলে মাদ্রাসায় গিয়েছিলো। একপর্যায়ে রাস্তায় শিক্ষার্থীরা মিছিল শুরু করলে সে-ও অংশ নেয়।

"আমি ওরে নিষেধ করছিলাম মিছিলে যেতে। কিন্তু মাদ্রাসা থেকে বের হয়েই যোগ দিছে মিছিলে। তারপর যখন মিছিলে গুলি হয়, একটা গুলি আইসা লাগে ওরে" বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন বাহাদুর খান।

"যখন ওর গুলি লাগে, সে মনে করেন প্রায় পঞ্চাশ ফুট পর্যন্ত রাস্তা ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে আসার চেষ্টা করছে। তারপর পইরা যায়। পরে আমি ভিডিও ফুটেজে এগুলান দেখছি। পইরা যাওনের পর সে আবার দেয়াল ধইরা দুই হাত দিয়া উঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারে নাই। দেয়ালে ওর হাতের রক্তের ছাপ লাইগা যায়।"

ছেলের কথা বলতে গিয়ে অঝোর ধারায় কাঁদছিলেন বাহাদুর খান। ছায়াদ মাহমুদের লাশ পরে তার বাবা খুঁজে পান এনাম মেডিকেলে। সেই লাশ নেয়া এবং পরে দাফন করতে গিয়ে মুখোমুখি হন আরেক সমস্যার।

"সাভার থেকে অটোরিক্সোয় করে লাশ নিয়া গেছি মানিকগঞ্জে। রাত ৯টার দিকে পৌছাই গ্রামে। সেখানে আমার গ্রামেরই আওয়ামী লীগের লোকেরা আমাকে বলতেছে, তুই জঙ্গি। তোর ছেলে মাদ্রাসায় পড়ে, আন্দোলনে গেছে -এইসব বলতেছে। তারপর চাপ দেয় রাতেই দাফন করতে।" বাহাদুর খান রাতে দাফন করতে রাজি হননি। তখন তাকে পুলিশের ভয় দেখানো হয় বলে দাবি করেন তিনি।

"আমি বলছি আমার বোন আসবে। আমি ওরে সকালে ৯টায় মাটি দিবো। ওরা আবার রাত ২টায় আইসা বলে থানা থেকে বলছে রাতেই দাফন করতে। আমি তখন বলি, ভাইরে! আমারে তোমরা জেলে নিলে নেও। আমি রাতে মাটি দিমু না।"

বাহাদুর খান একসময় প্রবাসে ছিলেন। একটানা বার বছর ছিলেন সৌদি আরব। এরপর যান দক্ষিণ আফ্রিকায়। সেখানে ছিলেন চার বছর। প্রবাসে থাকায় সন্তানকে সময় দিতে পারেননি। দেশে ফিরে সন্তানকে ঠিকমতো বুঝে ওঠার আগেই হারিয়ে ফেলেছেন। সেই যে আক্ষেপ, সেটাই এখন কাঁটা হয়ে বিধে আছে তার মনে।

তিনি বলেন, "আমার ছেলে শুধু আমার সঙ্গে থাকতে চাইতো। আমি আগেও প্রবাসে থাকায় ছেলেরে সময় দিতে পারি নাই। দেশে আসার পরেও সেইভাবে পারি নাই। এখন ওর কথা মনে উঠলে আমার ভিতরটা ফাইট্টা যায়। যখন ও জীবিত ছিলো তখনতো আমি ও-কে টাইম দিতে পারি নাই। আর এখন মরার পর ওরে টাইম দিতে পারি যখন কবর জিয়ারত করতে যাই। জীবিত থাকতে সময় দিতে পারি নাই। এখন কবরে গিয়া সময় দিয়া আসি।"

সূত্র: বিবিসি বাংলা 
 

রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের